বিসর্জন

কিশোর ঘোষাল

দুগ্‌গা

‘ওফ আর পারা যাচ্ছে না। এই অষ্টমীর দিনেই বড্ড ধকল যায়। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুজো নাও, অঞ্জলি নাও। তারপর সন্ধিপুজোর যোগাড় সারা হলে, সন্ধি পুজো নাও। একটানা এতক্ষণ, পা দুটো ভেরিয়ে যায়। আআআআহ (মস্ত হাই), মণ্ডপের কাঠের মেঝেয় বসে পাদুটো ছড়িয়ে বসে কী আরাম! লক্ষ্মী ওদিকটা লক্ষ রাখিস তো, হুট করে এদিকে কেউ যেন চলে না আসে।’
‘দেখেছি, মা। সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। ওরা তো আমাদের থেকেও ক্লান্ত। পারে নাকি আর?’
‘যাক আর তো দুটো দিন, নবমী পুজো আর দশমীর বরণ। ব্যস, তারপরেই ফিরে যাওয়া।’
‘আমার ফিরে যাওয়াই সার। আবার তো ফিরে আসতে হবে, পাঁচদিন পরেই পূর্ণিমাতে।’
‘সে আর কী করবি, বাছা? দুটো পয়সার জন্যে আকুলিবিকুলি করছে মানুষগুলো। তোকে পুজো দিয়ে তারা একটু সুখে সম্পদে থাকতে চায়, এইটুকু বৈ তো না।’
‘সে ঠিক আছে। কিন্তু আমার জার্নিটা দেখছ না? কাতু আসে কার্তিকের শেষে, প্রায় মাসদেড়েক পরে। আমাদের মধ্যে সরুটা খুব সেয়ানা, সে আসে সাড়ে তিন-চারমাস পড়ে, বেশ ঠান্ডার সময়। যত ঝক্কি আমার আর গণুদার। গণুদা এই ক-দিন আগে আগে একা এসেছিল, আবার আমাদের সঙ্গে এল। আর আমাকে গিয়েই আবার ফিরে আসতে হবে!’ সরু হাসতে হাসতে বলল, ‘অ্যাই দিদি, তোর হিংসে হচ্ছে, বুঝি? দাঁড়া একটু গান শোন, তাহলেই দেখবি মনটা ভালো হয়ে যাবে! মন থেকে রাগ-টাগ সব পরিষ্কার হয়ে যাবে!’
‘অ সরু, তুই আবার এই রাত দুপুরে বীণা নিয়ে বসলি? তোরা হাঁসটাও তো এবার হাসবে, মা।’
‘একটু শোনো না, মা। নতুন একটা সুর সেধেছি। শুনে, বলো না, কেমন হয়েছে।’
‘না শুনিয়ে তুই কী আর ছাড়বি, বোন। শোনা, তাড়াতাড়ি শোনা।’ গণুদা বললেন।
খুশি হয়ে সরু বললেন, ‘থ্যাংকিউ, গণুদা।’
বীণায় সুন্দর সুর বেজে উঠল। সকলে চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। সরুর হাতে সত্যি জাদু আছে। পিড়িং পিড়িং শব্দে কী যে আশ্চর্য সুর বের করে ফেলে, মনটা হালকা হয়ে যায়। শরীরের ক্লান্তিও দূর হয়ে যায়। হঠাৎ অচেনা গলার আওয়াজ পেয়ে সকলেই একটু চমকে উঠলেন।

‘তুমি বীণা বাজাতে পারো, আমাকে শিখিয়ে দেবে?’ সরুর হাঁটুতে ছোট্ট ছোট্ট হাত রেখে একটি মেয়ে জিগ্যেস করল। সকলেই একটু সতর্ক হয়ে উঠলেও, মা তেমন উতলা হলেন না, বললেন, ‘থাক থাক, বাছা। তোরা সব ব্যস্ত হোস না। ও‌ ছোট্ট পুঁচকে মেয়ে। বড়দের মতো এখনও কুচুটেপনা শেখেনি। ও আমাদের দেখে ফেললে কোনও ক্ষতি নেই। তোর নাম কী রে মা?’
‘আমার নাম? আমার নাম দুগ্‌গা।’
দুগ্‌গা নাম শুনে সরু হেসে ফেললেন, বললেন, ‘ওয়াও, হোয়াট আ সারপ্রাইজ!’
লক্ষ্মী বললেন, ‘এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে? আমার নামের মেয়েরা কাজের মাসি বা কাজের দিদি হয়। “অ লক্ষ্মী, এঁটো থালাবাসন ক-টা চট করে ধুয়ে দাও না গো।”’ লক্ষ্মী অবিকল বাড়ির গিন্নিদের বললেন। “আর তোর নাম রাখে না, তোর নামের বানানের জন্যে। এমন খটোমটো বানান, ইংরিজিতে তাও একটু সহজ, কিন্তু বাংলায়? বাপরে!”
গণুদা বললেন, ‘বোঝো কাণ্ড। তোরা আবার নাম নিয়ে পড়লি কেন?’ ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার নাম দুগ্‌গা শুনে মা দুগ্‌গা খুব খুশি হয়েছেন, কিন্তু মেয়েরা দুঃখ পাবে বলে, গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ও লক্ষ্মী, ওসব ভাবিস কেন, মা? নামে কী আসে যায়। হ্যাঁরে, সরু কোন এক সায়েব যেন বলেছিল?’
‘সেক্সপিয়ার।’ সরু বললেন।
মা বললেন, ‘ওই ওই। গোলাপকে ঘেঁটু বললে, গোলাপ ঘেঁটু হয়ে যায় বুঝি?’ সরু হিহি করে হেসে বললেন, ‘মা, তুমি না যা-তা। ঠিক ওভাবে বলেনি, তবে অনেকটা ওরকমই।’

দুগ্‌গা দূর থেকে দাঁড়িয়ে গত মাসখানেক ধরেই এঁদের প্রতিমা গড়ে উঠতে দেখেছে। আর এ ক-দিন ধরে দেখেছে কত কত লোক, ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি সুন্দর সুন্দর নতুন জামাকাপড়, শাড়ি-টাড়ি পরে রোজ এসে পুজো দেয়। আরতি দেখে। চারদিকে আলোর সাজ। সকাল-সন্ধে অজস্র ফুল, ধুপ, ধুনোর গন্ধ। গোটা পাড়াটাই সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এই পুজোর সময় সবকিছুই ভালো, শুধু ঢাক বাজে, কাঁসর ঘণ্টা বাজে, শাঁখ বাজে। আর মাসিমা, কাকিমারা জিভ নাড়িয়ে উলু দেয়। মা সামনে আসতে পারে না, একটু দূর থেকে দেখে চলে যায়। যাঁর পুজো হচ্ছে, তাঁর নাম দুর্গা, সেই দুর্গা যে দুগ্‌গাও, সে কথাটি সেই মেয়েটি তো আর জানে না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তাই নির্জন মণ্ডপে উঠে এসে, বড় দিদির মতো দেখতে মেয়েটির হাঁটুতে ছোট্ট হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল।
বীণা বাজাচ্ছিল যে মেয়েটি, সে তার দিদির মতোই দেখতে, তবে তার দিদি এত ফর্সা নয়। পরনের শাড়িটাও এত সুন্দর, ঝলমলে, ভালো নয়। এই দিদিটা গলায়, হাতে, পায়ে যে এত গয়না পরেছে, তার দিদির তাও নেই। তার ওপর সকলের কথাবার্তা শুনে দুগ্‌গা একটু ঘাবড়ে গেল। ভয় পাওয়া বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল সরুর মুখের দিকে। সরু মুখ নামিয়ে তাকালেন দুগ্‌গার দিকে, মিষ্টি হেসে বললেন, ‘বীণা শিখবি? কিন্তু একদিনে তো হবে না, সোনা! অনেক দিন ধরে শিখতে হবে। তোর বাড়ি কোথায়?’ দুগ্‌গা সরুদিদির কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হল। অনেক দূরের দিকে হাত বাড়িয়ে সে দেখাল, বলল, ‘ওই হোথা।’
দুগ্‌গার কথায় সরু হেসে ফেললেন, মজাও পেলেন, ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘কোথা?’
‘দুলে পাড়া। আমার বাবা, বলরাম দুলে। ঢাক বাজায়। আমার ছোড়দা ঘনশ্যাম ঘণ্টা বাজায়।’ তারপর হাত তুলে দেখাল, মণ্ডপের এককোণে ঢাকের পিছনে গুটিসুটি শুয়ে আছে একজন লোক আর একটা ছেলে, সেদিকে। সরু দুগ্‌গার থুতনিতে হাত দিয়ে হালকা আদর করে বললেন, ‘তুই বাবার সঙ্গে এসেছিস, ঠাকুর দেখতে?’ দুগ্‌গা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। এতক্ষণ সরু আর দুগ্‌গার কথা শুনছিলেন, এখন একটু উদ্বিগ্ন সুরে মা বললেন, ‘ও সরু। ওকে ছুঁয়ে ফেললি যে, লোকে দেখে ফেললে কুরুক্ষেত্র বাধাবে।’
‘ছুঁয়ে ফেললে কী হয়েছে, মা? আমাদের কি জাত যাবে? দেবতার কি জাত আছে মা?’
‘আমাদের জাতের কথা কে ভাবছে, বাছা? তা নয়। কিন্তু ভোর হতে দেরি নেই। লোকেদের কেউ দেখে ফেললে এক কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। আমাদের কিছুই হবে না। ওদের তাড়িয়ে দেবে, মারধোর করবে। হয়তো…’ ভয়ংকর কথাটা মা বলতে পারলেন না।
লক্ষ্মীও বললেন, ‘সত্যি, তোরই বা অত আদিখ্যেতা দেখানোর দরকারটা কী শুনি? দু-চারটে কথা বলে সরিয়ে দে। কী থেকে কী হয় বলা যায়?’
সরু কিছুটা বিরক্ত হলেন এবার, বললেন, ‘তোমরা একটু বেশিই ভাবছ মা। ওসব আগেকার দিনে হত। আজকাল ছেলেমেয়েরা কত লেখাপড়া শিখেছে। বুঝতে শিখেছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট সারাবিশ্বের পড়াশুনো এখন হাতের মুঠোয়। এ মেয়েটি ভারী মিষ্টি, আমি একে বীণা শেখাব। ওর মনের যত সুর, আমি ওর হাতে বসিয়ে দেব। দেখো, বড় হয়ে ও কেমন বীণা বাজায়।’
‘কী জানি বাপু, আমার মন কিন্তু কু গাইছে, সরু। ওকে দূরে সরে যেতে বল।’

মানদাসুন্দরী রাত থাকতেই উঠে পড়েন। কোমর বেঁকে গেছে, হাঁটুতে জোর পান না, তবুও এ সময় তাঁর মন্দিরতলায় রোজ আসা চাই। এখন তো আবার দুর্গাপুজো হচ্ছে, জগজ্জননী মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন, বাপের ঘরে। তাঁর না এলে চলে? বিড়বিড় করে দুর্গাস্তোত্র বলতে বলতে তিনি এসে দাঁড়ালেন মণ্ডপের সামনে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর বুক জুড়িয়ে গেল। একটিমাত্র শিশুপুত্র নিয়ে তিনি বিধবা হয়েছিলেন। বহু দুঃখকষ্ট সহ্য করে তাকে বড় করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। একটি নাতি আর একটি নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার হবার কথা ছিল। হল না, আঁটকুড়ির বেটি ছেলের বউটার জন্যে। তাঁর শিবের তুল্য ছেলের কানে কুমন্ত্রণা দিয়ে, ফুসলে আলাদা হয়ে গেল। বেশ ক-বছর হল, মানদাসুন্দরী আবার অসহায় বেধবা।
স্তোত্র আওড়াতে আওড়াতে চোখ বন্ধ করে জোড়হাত করলেন মানদাসুন্দরী, মা দুর্গার কাছে আকুতি জানালেন, ‘ও মা, শেষ বয়সে একটু সুখ আর শান্তি দাও, মা। আমার ভোলাকে, আমার বুকে ফিরিয়ে দাও মা।’ আবেগের বশে তাঁর দু-চোখে জল চলে এল। চোখ মেলে, সকল প্রতিমার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ল, সরস্বতী মায়ের হাঁটু ধরে, ওই ছুঁড়িটা কে? ঝাপসা চোখে ঠিক দেখছেন তো? নাহ, ঠিকই তো দেখছেন, একটা হতভাগী মেয়ে। যেমন তার শাঁকচুন্নীর মতো চেহারা, তেমনই তার জামাকাপড়ের ছিরি। নিশ্চয়ই কোনও ছোটনোকের মেয়ে। ঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার, আকাচা কাপড়ে ঠাকুরের গায়ে কেমন লেপটে ছুঁয়ে আছে দেখো। তাঁর কর্কশ খনখন স্বরে নবমীর স্নিগ্ধ ভোর চমকে উঠল, ‘ওরে ও আবাগীর বেটি, তুই ওখানে কেন রে, হতচ্ছাড়ি? দেব্‌তার পিতিমে কি তোর খেলার পুতুল? নেমে আয় নেমে আয়, শিগ্‌গিরি। কী আস্পদ্দা রে তোর? কার মেয়ে তুই, কোন পাড়ায় বাড়ি।’ ছোট্ট দুগ্‌গা ভয়ে আতঙ্কে দৌড়ে নামতে গিয়ে মণ্ডপের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। কাঠের সিঁড়ির কোনায় লেগে তার হাঁটু ছড়ে গেল। মণ্ডপে তিন দেবী শিউরে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘ইস্‌, আহা রে।’
মানদাসুন্দরী দেবী ছুঁতে পারবেন না, তা নাহলে তিনি চুলের মুঠি ধরে মেয়ের ঝিঁকুটি নাড়িয়ে দিতেন। তিনি আগুন ঝরানো চোখে এগিয়ে চললেন, হাঁটু চেপে বসে থাকা দুগ্‌গার দিকে, দুগ্‌গার ক্ষতে রক্ত জমছে। মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচিতে বলরাম দুলের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘুমভাঙা চোখে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেও শিউরে উঠল আতঙ্কে। সে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, মানদাসুন্দরীর পায়ের কাছে, ‘মা ঠাকরেন, আমার মেয়েরে ছেড়ে দ্যান, মা ঠাকরেন, ছোট মেয়ে বুঝতে পারে নাই, করে ফ্যালেচে। আমি ওকে খুব মারব, খুব বকব, পুজোর থানে আর কোনদিন আনবুনি।’ আগুনে যেন ঘি পড়ল, মানদাসুন্দরী বিকৃত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোর মেয়ে, হারামজাদা? দুলে, ছোটলোক? তোদের এতদূর আস্পদ্দা? ঠাকুরের গায়ে হাত দিস? ওরে অ সিধু, অ স্বপ্না, অ দেবু, কোতায় গেলি সব, এদিকে যে অনাছিস্টির কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে… এখনও ঘুমিয়ে থাকবি? বলি দেশে কী জাতধর্ম, সৈরণ অসৈরণ কিছুই থাকবে নি কো? কিছু করবি? নাকি আমি অনত্থ বাধাব?’
মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই।
‘কী হয়েছ, ঠাকুমা?’
‘হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবে কী?’
দেবাশীষ গেল মেয়েটির কাছে। সিদ্ধার্থ মাটিতে মাথা নিচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল।
‘কী হয়েছে, বলরামদা? কী করেছ?’
‘আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনোদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানে না, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাও। আজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনোদিন আর পুজোয় আনবুনি।’ হাঁটুর ব্যথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবাশিষ সামনে আনল।
সিদ্ধার্থ বলল, ‘আরে, এ তো রক্ত পড়ছে। দেবু তুই ওকে তোর বাড়ি নিয়ে যা, ব্যান্ডএড-টেড কিছু আছে? ফার্স্ট এড করে দে। কী নাম রে তোর?’ মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রয়েছে, তার চোখ থেকে জল ঝরছে। বলরাম বলল, ‘আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা।’
‘সে কী! আজকের দিনে দুগ্‌গামায়ের চোখে জল? ছি ছি ছি।’ মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোরা কি পাগল হলি নাকি? এ কী অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল।’
সিদ্ধার্থ দুগ্‌গাকে কোলে তুলে নিল, বলল, ‘আর কাঁদিস না, চল, আমার সঙ্গে। আমার বোন ঊর্মি তোকে পেলে আর ছাড়বে না, কী রে যাবি না ঊর্মিদিদির কাছে?’
অশ্রুভেজা চোখেও দুগ্‌গা ফিক করে হাসল, সিদ্ধার্থদাদার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে রইল মণ্ডপের দিকে। সরুদিদি হাসছেন।

* * *

গল্পটা শেষ করে, আলপনা মোবাইলে একটা নম্বর খুঁজে ডায়াল করল। আলপনা একটা বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। রিং হচ্ছে, তিনবার রিং হবার পর উত্তর এল, ‘হ্যালো।’
‘হ্যালো, বিষ্ণুদা। আলপনা বলছি। আপনার পাঠানো গল্পটা, পড়লাম। থ্যাংকুউ, দারুণ মিষ্টি একটা গল্প। খুব সুন্দর মেসেজও রয়েছে একটা।’
‘ওয়েলকাম, ভাই। কিন্তু কোন গল্পটার কথা বলছো বলো তো?’
‘বা রে, যেটা আমাদের পত্রিকার জন্যে পাঠালেন— দুগ্‌গা। ভুলে গেলেন?’
‘ওহ দুগ্‌গা? ভালো লেগেছে তোমার? অনেক ধন্যবাদ ভাই।’
‘ওটা আমরা পরের সংখ্যায় ছাপছি। ভুলে অন্য কোথাও আবার দিয়ে দেবেন না যেন। আপনার যা ভুলো মন।’
‘হা হা হা হা। যা বলেছ। তবে গল্পটা সাজানো, মিথ্যে— তাই ভুলে গেছিলাম। সত্যিটা ভুলতে পারি না যে!’
‘তার মানে? গল্পের আবার সত্যি মিথ্যে কী? কী যে বলেন, দাদা?’
‘জীবনের সত্যি নিয়ে গল্প ক-টা হয় বলো তো? অধিকাংশই তো সাজানো গল্প।’
‘হুঁ, তাই? এই গল্পের সত্যি কিছু আছে নাকি, দাদা। বলুন না শুনি।’ সুচেতনা হালকা গলায় বলল।
‘সিরিয়াসলি শুনবে? মিষ্টি নয় কিন্তু।’
‘আচ্ছা, সে আমি বুঝব। আমি একজন সম্পাদক, ভুলে যাবেন না। হা হা হা হা।’
‘তা ঠিক। সম্পাদককে অনেক যন্ত্রণা পুষে রাখতে হয়। শুনবে, তাহলে?’
‘শিয়োর, বলুন।’
‘বলছি। গল্প প্রায় সবটাই থাকবে, ওই শেষের দিকে কিছুটা…
মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই। তাদের নিঃশ্বাসে তীব্র মদের গন্ধ। গতকাল রাত থেকে শুরু হয়েছে নেশার আয়োজন, এখনও চলছে।
‘কী হয়েচে অ্যাই বুড়ি? ভোররাতে পাড়া মাতায় তুলেচিস কেন?’
‘হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবে-টা কী?’
দেবু গেল মেয়েটির কাছে। সিধু মাটিতে মাথা নিচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল। তারা দুজনেই টলছে।
‘কী হয়েছে বে, অ্যাই বলরাম? কী করেছিস?’
‘আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনোদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানে না, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাও। আজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনোদিন আর পুজোয় আনবুনি।’ হাঁটুর ব্যাথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবু সামনে আনল। ঘোলাটে চোখে সিধু তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে। তার মুখে চিকচিকে হাসি, বলল।
‘আবে, এর তো রক্ত পড়ছে। কী নাম রে তোর?’ মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রইল, তার দু চোখ ভরা জল। বলরাম বলল, ‘আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা।’
‘দুগ্‌গা? দুগ্‌গা দুগ্‌গা।’ সিধু মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল, বলল, ‘আজকের দিনে দুগ্‌গার চোখে জল কেন বাওয়া?’ মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোরা কি পাগল হলি নাকি? এ কী অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল।’
সিধুর ডান হাতটা ঢাকা পড়ে গেল দুগ্‌গার ফুলফুল ছাপ ফ্রকের তলায়, ধমকে উঠল জোর গলায়, ‘অ্যাই বুড়ি, চোপ। আর একটা কথা বললে, গলা টিপে খালে ভাসিয়ে দেব।’ তারপর অদ্ভুত একটা বিকৃত হাসি মুখে নিয়ে, দুগ্‌গাকে বলল, ‘আর কাঁদিসনি, চল আমার সঙ্গে।’ দুগ্‌গার চোখের জল শুকিয়ে এসেছে, অদ্ভুত আতঙ্কে সে তাকিয়ে আছে সিধুর দিকে। তার ছোট্ট জীবনে এমন ভয় সে কোনদিন পায়নি। সে ছোট্ট ছোট্ট হাতে সিধুর ফ্রকের আড়ালে থাকা হাতটা টেনে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করতে লাগল। পারল না। তাকে কোলে নিয়ে সিধু হাঁটতে লাগল ভোরের মাঠের দিকে। আকাশে এখনও আলো ফোটেনি। পাখিদের ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। দুগ্‌গা ছোট্ট পাখির মতো ছটফট করে ছাড়া পেতে চাইছিল, পারছিল না। ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অন্যহাতে সিধু তার মুখটা চেপে ধরল। হতভম্ব বলরাম চিৎকার করে উঠল, ‘ও বাবু, দুগ্‌গাকে কোথায় নে যাচ্ছেন, বাবু? দুগ্‌গা, ও দুগ্‌গা।’ দেবু সিধুর একটু পিছনে ছিল। ফিরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আর একটা কথা বললে না, তুইও যাবি। মেয়েটাও যাবে…’
‘বিষ্ণুদা, প্লিজ এ গল্পটা মোটেই সত্যি নয়। আপনি মিথ্যে বলছেন। প্লিজ চুপ করুন।’
‘তাই? তোমার মিথ্যে মনে হচ্ছে? থাক তাহলে আর বলব না। তবে শেষটা শুনবে না? সেদিন দুপুরের দিকে দুগ্‌গাকে পাওয়া গিয়েছিল, কিছুটা দূরের খালের ধারে। মৃতা, সে কথা বলাই বাহুল্য। তোমার যখন ভালো লাগছে না, আর কিছু বলব না। না বললেও বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই!’
সুচেতনা অস্ফুট গলায় বলল, ‘রাখছি, বিষ্ণুদা।’
‘এক মিনিট, গল্পটা ছাপছ কি? ছাপলে কোনটা? আগেরটা? তাহলে কোনও সমস্যা নেই। আর যদি পরেরটা ছাপতে চাও, গল্পের নাম দিও বিসর্জন। দশমীর দিন ওই খালেই মা দুর্গারও বিসর্জন হয়েছিল। বিসর্জনের পর জলে ভেজা, রঙ ওঠা, খড় বেরিয়ে আসা, সে কী বীভৎস সব প্রতিমা! রাখি? ভালো থেকো।’

ঘুনসি

সুতপা বসু

বাসস্টপের সঙ্গে সম্পর্ক সেই ছোট্ট থেকে। তখনকার দিনে মধ্যবিত্ত মানে তাদের সীমিত বিত্তই সম্বল ছিল। পাড়ায় পাড়ায় মুদি দোকানের মতো ব্যাঙ্কও ছিল না, আর ঠিক দুক্কুরবেলা মুঠোফোনে ঠেলা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে, “ধার নেবে গো, ধার নেবে গো” বলে সাধাসাধিও ছিল না। তাই মধ্যবিত্তের নিজস্ব গাড়ি ছিল না। এমনকী বাপ-ঠাকুরদায় না রেখে গেলে, রিটায়ারমেন্টের আগে নিজের বাড়িও ছিল না। সে ছিল মাস মাইনেয় ভরসা রাখার যুগ। যেহেতু গাড়ি ছিল না, তাই বাসস্টপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিবিড়। ইস্কুল যাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাওয়া, সদর বাজারে হালখাতা করতে যাওয়া, দূরে সার্কাস দেখতে যাওয়া, রাবণপোড়া দেখতে যাওয়া, রথের মেলায় যাওয়া, কলেজ যাওয়া, আপিস যাওয়া, মামাবাড়ি যাওয়া, দেশের বাড়ি যাওয়া, পাশের গাঁয়ে যাত্রা দেখতে যাওয়া, ট্রেন ধরতে ইস্টিশনে যাওয়া, সবেধন নীলমণি একখানা হেলথ সেন্টার আর একখানা সদর হাসপাতালে যাওয়া, যে কোনও জায়গায় যেতে গেলেই বাস ধরতে ওই বাসস্টপ ভরসা।

ঘুনসির তাই ছেলেবেলা থেকেই বাসস্টপ বড় প্রিয়। দেশের বাড়িতেই থাকা হয়েছে সারাজীবন। লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রী হয়ে সরকারি আপিসে কলম পিষে মাসমাইনে। ঘুনসির ভালো নামে আমাদের কাজ নেই। সে নাম ইস্কুল কলেজের খাতায়, কিছু সংশাপত্রে, আপিসের খাতায়, সহকর্মীদের কাছে, পার্টির খাতায়, রেশন কার্ডে, বাপ-ঠাকুরদার রেখে যাওয়া জমি বাড়ির দলিলেই থাক৷ আমাদের গেঁয়ো ঘুনসিকে নিয়েই মাথাব্যথা। ছেলেবেলায় ঠাকমা কোমরে পরিয়ে দিয়েছিল ঘুনসি। তারপর সেই নাদাপেটা বালক আদুল গায়ে কোমরে ঘুনসি জড়িয়ে বালি-কাদা-জলে খেলেধুলে বড় হয়ে গেল একসময়। নাম কেন ঘুনসি তা জানা নেই। যেখানকার বাসস্টপের কথা হচ্ছে, তা নামেই মফস্বল, আদপে সে এক গঞ্জ। ঘুনসির জন্মভিটে সেই গঞ্জেরই এক বাঁশবাগানের ধারে। ঘন বিস্তৃত বাঁশবাগান। না, ফর্মুলা মেনে কোনও ভূতের আড্ডা নেই সেখানে। অন্তত গঞ্জের কেউ কখনও দেখেনি। গোছা গোছা বাঁশঝাড়ের ফাঁকে সূর্যের আলো গলে গলে সোজা ঢুকে পড়ে ঘুনসিদের বাড়ির উঠোনে। প্রেমিকের ছবির ওপর প্রেমিকার ভালোবাসার ছোঁয়ার মতো সে রোদ ধানের গোলার চারিধারে হাত বোলায়। পুঁইমাচা, চালকুমড়োর সঙ্গে খুনসুটি করে শেষ বিকেলে বাসস্টপের গায়ে হেলান দিয়ে খানিক জিরোয়। তারপর সেদিনের মতো গঞ্জ ছেড়ে পাড়ি দেয়, আবার পরদিন ভোরে ফেরার জন্য।

ঘুনসির ভিটে থেকে বাসস্টপ কয়েক গজের দূরত্বে। আর তার পাশ দিয়েই পাকা বাসরাস্তা। বাসস্টপের একপাশে একটা প্রকাণ্ড অশথ্ব গাছ, অন্য পাশে পান, সিগ্রেট, বিড়ি, চানাচুর, লেড়ো বিস্কুট ইত্যাদির দোকান বা গুমটি বলাই ভালো। আর তার পেছনেই একটা মাঝারি মাপের পানা পুকুর। তবে মজা নয়। খানিকটা তখনও বেশ টলটলে। পানার মাঝে মাঝে দু-একটা শাপলা শালুক ফুটে পুষ্করিণীর মান রেখেছে। বাসস্টপে কত যাত্রী দিনভর আসে, যায়। ছোট জায়গা, অল্প লোকের বাস, সবাই প্রায় সবাইকে চেনে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই প্রথম বাস যায় শহরের দিকে। শেষ ফিরতির বাস প্রায় রাত এগারোটা পেরিয়ে আসে। যাত্রী নামিয়ে পাকা রাস্তা ধরে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। অত রাতেও পাশের গুমটি খোলা থাকে। কেউ কেউ দু-পাঁচ মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে, একটু সুখটান দিয়ে, এর-ওর সঙ্গে বা দোকানির সঙ্গে দু-চারখানা কথা কয়ে বাড়ির দিকে পা চালায়। এ গঞ্জে ছিঁচকে চোর থাকলেও, ডাকাত বা ভূতপ্রেতের উপদ্রব নেই। ঠ্যাঙাড়েরাও ততদিনে বিলুপ্ত। তাই সম্বৎসর রাতবিরেতে পায়ে হেঁটে ঘুনসিদের বাড়ির পাশ দিয়ে, বাঁশবাগান পেরিয়ে লোকজন বাড়ি ফেরে। ঘুনসির রাতে ঘুম না হওয়ার ব্যারাম। ও সারারাত জেগে থাকে। বাড়ির পাশ দিয়ে লোকজন কে গেল, কে এল দেখে। শুক্লপক্ষে চাঁদ দেখে৷ জোছনায় ভিজে যাওয়া ফুল দেখে৷ রাতপাখিদের শিকার করা দেখে। তাদের ঠোঁটের ডগায় ঝুলে থাকা মরা ইঁদুর বা সাপ দেখে। জ্যান্ত সাপের শঙ্খ লাগা দেখে। নিভারানির জন্য মনটা হু হু করে। সেই কবে তার বিয়ে হয়ে, সে চলে গেল শহরে। গরিব বামুনের সুন্দরী মেয়ে। রূপ আর জাতের জোরে কোনও এক শহুরে বর্ধিষ্ণু বামুন ঘরেই বিয়ে হল। নিভারানির বিয়ের দিন গাঁয়ে ছিল না ঘুনসি। কার সঙ্গে বিয়ে হল খোঁজও করেনি তখন। ছোট জাত ঘুনসির বরাতে জুটল না নিভারানি। কিন্ত আবার সেই জাত বরাতেই ঘুনসির জুটে গেল সরকারি চাকরি।

সকাল সকাল দুটি ভাত খেয়ে বাসে করে ইস্টিশন, তারপর লোকাল ট্রেনে শহরে গিয়ে চাকরি। একই পন্থায় সন্ধ্যা করে বাড়ি ফেরা। চাকরির প্রথম দিনেই একপাল লোক এক খাতায় নাম লেখাতে বলেছিল। তাদের হাতে টুকটুকে রঙিন ঝান্ডা। ঘুনসি খুশি মনে তার ভালো নাম লিখল সে খাতায়। ওদের পঞ্চায়েতও এই দলের। ঘুনসির সেখানেও নাম লেখানো আছে। পার্টির কর্মী সে। মিটিং মিছিলে যায়। ভোটের আগে পোস্টারে আঠা লাগায়, দেওয়াল লেখে। বানান ভুল হয়, তবু লেখে। ভুল ধরার লোক বিশেষ নেই। সে বছর পঞ্চায়েত ভোটের আগে আগেই বাসস্টপটা প্রাণ পেল। তার আগে কেউ একখানা বিস্কুটের টিন পিটিয়ে সোজা করে তার ওপর সাদা রঙ দিয়ে লিখেছিল, ‘এখানে বাস থামিবে’। একখানা লম্বা বাঁশ পুঁতে, তার আগায় টাঙানো ছিল এই সাইনবোর্ড বহুদিন। তারপর মধ্যবিত্তের বোনাস, ওভারটাইম বা ছুটি বিক্রির টাকা পাওয়ার মতোই এক ঝলক খুশির হাওয়া নিয়ে এল এই চকচকে বাসস্টপ। ইঁট বালি সিমেন্টের পাকা বাসস্টপ। একদিকে দেওয়াল তোলা, তিনদিক খোলা, আবার ক-খানা লোহার বেঞ্চিও আছে।

এই বাসস্টপই এখন ঘর হয়েছে আন্নি বুড়ির। বর্ধিষ্ণু বাড়ির সুন্দরী সুগৃহিণী নিভারানি বাসস্টপের এককোণে গুছিয়ে পাতল ‘আন্নি বুড়ি’র সংসার। সংসারের জিনিস বলতে কয়েকটি ছেঁড়া কাঁথাকানি, তোবড়ানো ডালডার টিন, একখানা ঢাউস বস্তা। সে যেন এক গুপ্তধনের পেটি। সবার থেকে আড়াল করে বাসস্টপের দেওয়ালের দিকে মুখ করে সেই বস্তার ভেতর থেকে নানা মহার্ঘ বস্তু সারাদিন ধরে বের করে আর আবার গুছিয়ে তার ভেতর রাখে আন্নি বুড়ি। ঘুনসি যতটা পারে নজরে নজরে রাখে, কিন্তু নিভারানি ওকে চিনতে পারে না। ঘুনসি প্রায় পড়ে থাকে বাসস্টপে, নিভারানিকে পাহারা দিতে। গাঁয়ের লোকের চোখের আড়ালে। মাসখানেক আগেই গ্রামের দুই বখাটে ছেলে বিরক্ত করছিল আন্নি বুড়িকে। আসলে সে তো নামেই বুড়ি। মদ্যপ দুটো বাইক নিয়ে রাতবিরেতে এসেছিল বাসস্টপে। অবশ্য নেশার ঘোরে পাশের পুকুরে গিয়ে পড়ে, আর ওঠেনি। নিভারানির ইজ্জত বেঁচে গিয়েছিল সেদিন। ঠিক কোনদিন থেকে নিভারানি ‘আন্নি বুড়ি’ হল কেউ জানে না। একদিন একমাথা জট, উকুন নিয়ে, ছেঁড়া কাঁপড়ে গা জড়িয়ে কোনও এক ফিরতি বাসের মাথায় চেপে চলে এল। নামল বাসস্টপে। গাঁয়ে ঘুরে ঘুরে কী যেন খুঁজল। তারপর অনেক রাতে ফিরে এল বাসস্টপে। ততক্ষণে গুমটি বন্ধ হয়ে গেছে, শেষ বাস চলে গেছে, শুনশান চারিদিক। সে রাতে সেই বাসস্টপে দুটো নেড়ি কুকুর আর নিভারানি শুয়ে রইল। ভোর হল, একে একে লোক চলাচল শুরু হল। নিভারানিকে ক্রমে চিনতে পারলো অনেকেই। তাকে নানা জনে নানা কথা জিজ্ঞাসা করে। সে কোনও উত্তর দেয় না। শুধু মাঝে মাঝে বলে, “আন্নি, আন্নি।” সেই থেকেই গাঁয়ের ছোট ছেলেপিলের দল ডাকে ‘আন্নি বুড়ি’। এ গাঁয়ে তার বাপের ঘরের আর কেউ নেই। ছোট ভাই জামাইবাবুর দাক্ষিণ্যে বিদেশে কাজ জুটিয়ে নিয়ে চিরতরে গাঁ ছেড়েছে বহুকাল। বাপ-মাও মারা গেছে বেশ কিছুকাল। বাপের ঘরখানা এখন পঞ্চায়েত আপিস। এককালে খুচরো রাজনীতি করা শহুরে বর্ধিষ্ণু পরিবারের বামুন বর, বউ নীভারানির পয়ে পরবর্তীকালে হল মস্ত ব্যবসায়ী, মস্ত রাজনৈতিক নেতা। গঞ্জে গঞ্জে তার সুদের ব্যবসা ক্রমে হয়ে উঠল ব্যাঙের ছাতা ব্যাঙ্ক। কত লোক টাকা রাখল তাতে চড়া সুদ পাবার আশায়, পলক ফেলতেই টাকা দ্বিগুণ হবার আশায়। কারও কারও আশা পূর্ণও হল। তারা ধরে আনল আরও লোক। ভরা বর্ষার পুকুরের মতো ভরে উঠল ব্যাঙ্ক। তারপর একদিন ভরা পুকুরে ছোঁড়া ঢিলের মতো শব্দ তুলে জল উছলে ডুবে গেল টুপুৎ করে। রাতারাতি নেতা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। তাকে না পেয়ে অত্যাচার চলল নিভারানির ওপর। শারীরিক, মানসিক ক্ষয় শুরু হল। সুযোগ বুঝে যেদিন বাড়ির কাজের লোকেরা অত্যাচার করে সব ছিনিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিল, ওরা ভাবছিল নিশ্চয় আরও কোথাও টাকাকড়ি গয়নাগাটি নিভারানি লুকিয়ে রেখেছে। ভয়ানক মার মারছিল আর বার বার জিজ্ঞেস করছিল, “বল আর কোথায় কী আছে?” নিভারানি কাকুতি মিনতি করছিল, “আর নেই… আর নেই…”

নিভারানি কোথায় চলে গিয়েছিল তার পর। ব্যাঙ্ক ডুবে যাওয়ার খবর, মন্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার খবর জানাজানি হল চারিদিকে। মন্ত্রীর নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরোল। ঘুনসির আবার নিভারানির জন্য বড় মন কাঁদল। খুঁজে খুঁজে গেল নিভারানির শহুরে বর্ধিষ্ণু শ্বশুরবাড়িতে। কেমন করে জানি আমগাছে চড়ার অভ্যেস কাজে লাগিয়ে পাঁচিল টপকে, পাহারাদারের চোখ এড়িয়ে ঘুনসি ঢুকে পড়েছিল বাড়ির বাগানে। মন্ত্রীমশাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লুকিয়ে সেদিন বাড়ি এসেছিলেন কিছু লুকোনো দরকারি জিনিস নিতে। ঘুনসিকে দেখতে পায় একটা চাকর। ঘুনসিও দেখতে পায় মন্ত্রীকে। পাঁচিল টপকাবার আগে দেখেছিল মন্ত্রীর বাড়ির গেটের কাছে পুলিশ পাহারা। মন্ত্রী ঘুনসিকে দেখেই চাকরকে বলল, “ধর ওকে।” ঘুনসিরও মাথা ঘুরে গেল, পরিত্রাহি চেঁচাতে লাগল, গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশদের উদ্দেশ্যে, যে মন্ত্রীমশাই বাড়ির ভেতরে আছেন। ওর কেন মনে হয়েছিল যে বাইরের পুলিশ মন্ত্রীর ঘরে আসার খবর জানে না। মন্ত্রী আর সহ্য করল না। নিতে আসা দরকারি জিনিসের মধ্যে থেকে রিভলভার তুলে নিল। ঘুনসি পড়ে রইল মেঝেতে।

ঘুনসির পোড়ো বাড়ির মাথায় আজ বড় সুন্দর চাঁদ উঠেছে। পার্টির কিছু ছেলে মিলে বাড়িটা বাগানোর তালে আছে। আন্নি বুড়ির গত মাসখানেক কী হয়েছে কে জানে। সে আর এখন খুব বেশি ‘আন্নি আন্নি’ বলে না। ঘুনসি বুঝতে পারে আসলে সে বলে, “আর নেই, আর নেই।” জিভ জড়িয়ে যায়, তাই অমন শোনায়। বাসস্টপের পাশের পানাপুকুরে আন্নিবুড়ি স্নান করেছে কয়েকদিন। বস্তা খুঁজে খুঁজে একটা গোটা কাপড় পরেছে দিন পনেরো হল। আজই সকালে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আন্নি বুড়িকে কেমন বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে এসেছে ঘুনসির এই পরিত্যক্ত বাড়িতে। এখানেই থাকার ব্যবস্থা করেছে। কাল নাকি এক ডাক্তারবাবু আসবেন নিভারানিকে দেখতে। কে যেন চিনতে পেরে খবর দিয়েছে মন্ত্রীর বৌয়ের এই অবস্থার কথা। তার পরেই এত তোড়জোড়। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লোকজন ওকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল শহরে। কিন্তু কেন কে জানে কিছুতেই ওকে নিয়ে যেতে পারল না। শেষে অনেক চেষ্টায় বাসস্টপ থেকে এই কয়েক গজ দূরে ঘুনসির বাড়িতে আনতে পারল। আজ জোছনা বড় মিঠে। নিভারানি ঘরের মেঝেতে কাঁথা পেতে ঘুমোচ্ছে। খোলা জানলা বেয়ে ওর শরীরের ওপর জোৎস্নার আলোয়ান। ঘুনসি রাত জেগে বাঁশঝাড় দেখে, রুপোলি আলোমাখা উঠোন দেখে। আজ বামুনের মেয়ে ওর ঘরে ঘুমোচ্ছে। বাড়ি বাগানোর তাল করা পার্টির ছেলেদুটো সন্ধেবেলাতেও একবার বাইক নিয়ে ঘুরে গেছে।

পরদিন সকাল সকাল বড্ড তোলপাড় হচ্ছে গঞ্জ। কয়েক মাসের তফাতে দু-জোড়া প্রাণ গেল। একজোড়া আগে পুকুরে ডুবেছিল। এ দুটোও গেল। কী করে কে জানে। পুলিশ তদন্ত করবে। নিভারানিকে দেখতে ডাক্তার এসেছে। ঘুনসির পোড়োবাড়ির ঘর ভরে গাঁয়ের লোক, কাগজের লোক। গুমটির মালিক রতন খুড়ো বিড়িতে টান দিতে দিতে এক সাংবাদিককে বলছেন, “এ শান্তির গ্রামে যে কী দুর্ভোগ লাগল। পর পর এমন মৃত্যু। ছেলেগুলো বদ ছিল, তবু তরতাজা প্রাণ তো। এতকাল তো এই গঞ্জে আছি, ছিঁচকে চুরি ছাড়া, ডাকাত, ভূতপ্রেত কোনোকিছুর উপদ্রব দেখিনি।”

মণিহারা

ফাল্গুনী ঘোষ

“উই জি আলে গত্ত গুল্যান দেখছেন বাবু…”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওগুলো তো সাপের বাসা। ওখানেই…”
“না না বাবু, উ ল্যয়! মা মুনসা বুল্যেন।”
হাঁ হাঁ করে সন্দীপকে থামায়। পরম ভক্তিভরে মা মনসার উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেকায় জটা।
“ক্যামেরাবাবু, ইসব বুনে বাদাড়্যে, আলে-খালে ঘুরতে জেল্যের মা মুনসাকে তুষ্টু রাখত্যে হয়। আমরা লতা বুলিঙয়ে। মা মুনসার ও নামট্যো লিয়ে নাখো।”
এই ক্যামেরা বাবুট্যো জি কী কর‍্যে। খালে-ঝোপে পোকামাকড় ধর‍্যি ছবি তুলত্যে লেগেছ্যে। মনে মনে ভাবে জটা। ই বাবুট্যোকে বুলতেই হবে আজ, মা মুনসার মহিমার কথাট্যো। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে বলে চলে জটা—
শুন্যেন বাবু, তেনার কত লীলা, রঙ্গ। কি বিচিত্র রূপ— খরিস, চিতি, ইনি, ঢ্যামনা কত্ত নাম। পায়ে পায়ে চলে। কথায় বলে, সাপের ল্যাখা/ বাঘের দ্যাখা। তা তেনাদেরকে ত্যাল, সিন্দুর, ধূপ-দীপ দিঙয়ে মানত করে না তোষালে কি এই আলে-খালে, বুনে বাদাড়্যে, মাঠে-ঘাটে রাখাল বাগালের কাজ করত্যি পার‍্যি? না কি এই দুপুর রোদে দাড়িঙে ডেলি রোদট্যো খেত্যে পার‍্যি!”
সন্দীপের ভ্রু কুঁচকে যায়। মুখ ঠেলে বেরিয়ে আসে অবিশ্বাসী স্বর— “কিন্তু গোরুগুলোকে কামড়ে দেয় যদি!”
“আমাদের যে মিতে পাতানো আছ্যে। ওদেরক্যে মের‍্যো না। তুমি ওদের শান্তি দাও, অরাও তোমার পায়ে পায়ে পথ ছেড়্যি দিবে। অরা মানুষ বুঝে। মানুষের ছোয়া ল্যায়। গভভধারিনী মেয়্যা লোকের বুকের দুদ খায়। সুদু কি মেয়্যা! গাই বিয়ান জেল্যের বাঁটে মুখ লাগায়। কুনো লাজ নাই। তখুন বড়ো ঢ্যামনা উটো। আমার বাপ দাদুদের নিজ্যের চোখে দিখ্যা বাবু।”
দামি ডিএসএলার-টা হাতে নিয়ে জটাধারীর সঙ্গে পথ চলে সন্দীপ। এই অসভ্য, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অশিক্ষিত প্রাণগুলির দৈনন্দিন যাপন শুনতে শুনতে কেমন ঘোর লাগে। পেশায় স্কুলশিক্ষক সন্দীপ আপাদমস্তক শহুরে। নেহাত কৌতূহলের বশে ক্যামেরায় হাতেখড়ি। সে কৌতূহল আজ নেশা। তার জন্য জলে-জঙ্গলে, ঠা ঠা রোদে, ছমছমে সন্ধেয়, কাকভিজে হয়ে মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াতে তার আপত্তি নেই। এখন ফণা তুলে উদ্যত সাপের ছবি তোলার জেদ এসেছে মনে। দেশ-বিদেশ অনেক জায়গায় তার ছবি নাম পেয়েছে। কত মেডেল, পুরস্কার। চোখে স্বপ্ন ঝিকিয়ে ওঠে সন্দীপের। মনের গোপনে সে পুষে রাখে বড় ফোটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন। আরও নিখুঁত আরও অন্য ধরনের ছবি তুলতে চায় সে। এভাবেই পথে পথে চলতে ফিরতে এই মাঝদুপুরে রাখাল বাগালগুলোর সাথে প্রাণের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার। সাথে সাথেই শুনতে পায়, জানতে পারে পরম্পরায় চলে আসা সাপকেন্দ্রিক এদের বিচিত্র সংস্কার ও ভাবনার কথা।

* * *

কামিনী। খালপারের বাগাল পাড়ার বিশু বাগালের কন্যা। কালো, মসৃণ চকচকে চামড়ার মেয়ের চলার ছন্দ যেন হিসহিসে নাগিনী। তার চোখের মাদকতার বিষে যে জড়িয়েছে তার আর নিস্তার নেই। রাখাল বাগাল বাড়ির গাবদা-গোবদা, গালফুলো আঁটি করে টেনে খোঁপা বাঁধা মেয়েগুলোর পাশে কামিনী বড়ই বেমানান। কী করে যে বাগাল বাপের ঘরে তার জন্ম হল। এ নিয়ে অবশ্য কানাঘুষো আছে এলাকায়। বিশু নাকি কুড়িয়ে পেয়েছিল কামিনীকে। কে জানে কোন অজাত-কুজাত বংশের মেয়ে— বলে ঠোঁট উলটায় গাঁ ঘরের মেয়ে বৌ-রা। নাহলে কি সাপ পোষে! এত দুঃসাহস!
কামিনীর নিজেরও মনে হয় সে এখানে পরগাছা। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, বোঝা না-বোঝার আলো-আঁধারিতে দুলতে দুলতে তার মন চলে সেই পদ্মবিলে। যেন ফেলে আসা জন্মের নাগিনী কন্যার দেশে। যেখানে নাগে-নরে মেলামিলি। সাপ তাড়া করে হাতের মুঠোয় ধরতে সে ওস্তাদ। এ খেলাতে সে প্রাণ পায়। প্রকৃতির আদিম রহস্য আর প্রবৃত্তি দুইই এঁকেবেঁকে নৃত্যের তালে চলে। সেখানেই বাঁধা পড়ে থাকে কামিনীর মন আষ্টেপৃষ্ঠে। তার আকৃতি, প্রকৃতির রহস্যময়তা সে আরও বেশি উপলব্ধি করে চারপাশে পুরুষদের সরীসৃপ দৃষ্টি থেকে।
সম্বৎসরের হাজার একটা নিয়ম, আচার-বিচারের মধ্যে মনসা পুজোর সময় এলে বুকে পদ্মের সুবাস ছাড়ে কামিনীর। বিশুর স্ত্রীর দুলে দুলে পড়তে থাকা দশহরা ও নাগপঞ্চমীর ব্রতকথা কামিনীকে বিভোর করে। পুজোর উপাচার সামান্যই দুধ আর কলা। পুজো সেরে পান্তাভাত প্রসাদ নিয়ে তেল সিদুঁরের তিলক কেটে বাগালির কাজে বেরোয় পুরুষেরা। পুকুর ঘাটে মনসার মূর্তি ভাসান দিয়ে কামিনী বিষণ্ণ মনে পা ছড়িয়ে বসে থাকে। দ্যাখে জলের মধ্যে খেলা করা কুচো মাছ। গামছা ছেঁকে ধরে নিয়ে এসে বাড়িতে হাঁড়ির মধ্যে জিইয়ে রাখে। কিন্তু কয়েকদিন পর সে বোঝে ওই মাছগুলোর মধ্যে একটা মা মনসার বাচ্চা।
কাউকে কিছু না জানিয়ে দুধ কলা খাইয়ে বহু যত্নে লুকিয়ে বড় করতে থাকে সে তার মণিকে। যেন নিজের সন্তান। মনে মনে নাম রাখে মণি। ঠিক তার মতোই কালো উজ্জ্বল হিসহিসে গা। পেটের দিকটা ছাই ছাই ডোরা। এখন থেকেই ফণা তোলার চেষ্টা! কী তেজ! মনে মনে পুলকিত হয় কামিনী। কিন্তু এসব সুখ কপালে বেশিদিন সইল না। বিশুর স্ত্রী ও বিশু দূর দূর করে বাড়ির বাইরে করে দিল মণিকে। মনে মনে গাল পাড়ে বিশুর স্ত্রী— “পেটে ধরিন্যি বলেই এই শত্তুতা; নিজের মেয়্যা হল্যি এই করত্যে পারত্যি?” গায়ের জ্বালা মেটাতে ঘরে শিকলবন্দি রাখে কামিনীকে— “সোমত্তু মেয়্যা! এবার তুর বিহ্যা দিছি দ্যাখ।” বিশু মাঠ থেকে ফিরতে না ফিরতেই গোপন পরামর্শে ঠিক হয় পাত্রের নাম। পাড়ারই জটাধারী ক্ষ্যাপা। তাছাড়া “উ মুনসার ভকত্যো বট্যে”— মাথা নাড়ে বিশু।
ওদিকে অন্ধকার মাটির ছোটো খুপরিতে গুমরে গুমরে ক্লান্ত দৃষ্টি জানলায় মেলে কামিনী দেখে তার মণি জানলার ফাটল দিয়ে তার সাথে দেখা করতে এসেছে। এরপর চলতে থাকে সবার চোখ এড়িয়ে মা-ছেলের দেখা সাক্ষাৎ।
কালা বাবার থানে মানত করা জটাধারী, এখন বাপ-মা মরা ছেলে। মনিবের চোখের আড়ালে ফাঁকি মারতে জটা জানে না। একটেরে, একবগ্‌গা জটা নিজের স্বভাব চরিত্রের গুণে তাই হয়ে ওঠে জটা ক্ষ্যাপা। মা মনসার একনিষ্ঠ ভক্ত জটার কোনও নেশা নাই। মদ, গাঁজা, বিড়ি, মেয়েমানুষ সব নেশা সে জয় করেছে মা মনসার কৃপায়। মনসা যে কাঁচা দেবতা। রাত বিরেতে মনসা নিজে তার পথ ছেড়ে দেয়। শুধু এ কারণেই সে মনসার ভক্ত হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যেদিন ভরা দুপুরে ভিজে কাপড় জড়ানো স্নানসিক্ত কামিনীর ছিপছিপে কোমরের তরঙ্গ আর ভারী স্তনের ছন্দ শ্যাওড়া ঝোপের আড়াল থেকে দেখেছে সেদিন থেকে জটা বড় আনমনা। কামিনীর অগ্নিদৃষ্টি তা এড়ায়নি।
এসব কথা জটা নিজের মনেই চেপে রাখে। তাছাড়া কামিনীর নামেও নাকি কী সব বদনাম আছে। দুধ-কলা দিয়ে সাপ পোষে। সে সাপ দেখা করতেও আসে সাঁঝের আঁধারে। তাই সেদিন রাতের বেলায় সস্ত্রীক বিশু বাগালকে তার বাড়িতে আসতে দেখে চমকেই যায় জটা। এ যে অভাবিত প্রস্তাব। ধুমধাম সহ জটাধারী একদিন জটা ক্ষ্যাপা থেকে হয়ে যায় কামিনীর স্বামী।
এভাবেই শম্বুকগতিতে চলে গ্রামজীবন। যে জীবনের পায়ে পায়ে অজস্র রহস্যজালের বেড়ি। নির্বিষ, নিরীহ দৃষ্টির সাথে পথ হাঁটে কামুক দৃষ্টি। কামিনী গর্ভধারিনী হয়। কোল জুড়ে সন্তান আসে। জটা মনের আনন্দে বন্ধুদের মোড়ের মাথার চমচম বিলি করে।

* * *

সন্দীপ জটার মুখ থেকেই তার আর কামিনীর গল্প শুনেছিল। এই সরল অশিক্ষিত মনসাপ্রেমী জটাকে সন্দীপের বড় ভালো লাগে। সেদিন সন্দীপ মাঠের পথে একা এলোমেলো ভাবনা ভাবতে ভাবতে চলেছে। নিত্যদিনের সঙ্গী জটা সদ্যোজাতকে নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু চলতে চলতে একসময় জটার সাক্ষাৎ পায় সন্দীপ।
“মা মুনসা কামিনীর বুকের দুদ খেয়্যে জেল্য কাল…” হন্তদন্ত জটা হাঁফায়, থরথর করে কাঁপে।
বলে কী! “তুমি নিজের চোখে দেখেছ জটা! তোমার বউ সুস্থ আছে?”— জটাকে সঙ্গে নিয়ে সন্দীপের অনুসন্ধানী চোখ ছুটে চলে জটার বাড়ির বারান্দায়। যেতে যেতে জটার বর্ণনা শোনে—
“ছেল্যাট্যোকে মাই দিয়ে, ঘুম পাড়িঙে গরমে কাহিল হলছিল্যো বউট্যো। মাঝরেতে দাওয়ায় এলোচুলে খুটিতে ঠেসান দিঙয়ে বস্যি ছিল্য। নিসাড়ে বৌট্যোর পেয়ারের মণি এস্যি পা দুখ্যান পেচিঙে ধরল্যে! ঝাপটানির আওয়াজে চোখ রগুড়ে দেখি ইসব। সে মেয়্যার তো চোখ দাড়িঙ জ্যালো। মারলে নাকি লেজ্যের ঝাপটা। তারপর কাপড়ের ভিতরি সেদিঙে দিলে দুদে মুক।” দম নিয়ে জটা বলে, “কিন্তু বাবু মা মুনসার কিরিপা আছে! বৌট্যো আমার জানে বেঁচ্যি জেল্য। মণি বড় পেয়ারের পত্থুম ছেল্যা তো কামিনীর।”
সন্দীপ কামিনীকে দেখে গ্রাম্য লোকেদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে। কালো পাথরের ভাস্কর্য যেন! ঠেলে ওঠা উদ্ধত যৌবন। শুধু ঝিমিয়ে বসে আছে। আর ঘোরলাগা লাল চোখে চারিদিক চেয়ে দেখছে মাঝে মাঝে। এত ভিড়ে কামিনীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলে কৌতূহল নিরসন সম্ভব নয়। বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়ায় না সন্দীপ। একটা সাপ এসে কামড়ে দিয়ে গেল, অথচ মেয়েটার কিছুই হল না! কোনও ডাক্তার-ওষুধ নেই। তার যুক্তিবাদী মন কোনও উত্তর খুঁজে পায় না। রহস্যজালে ভিজে শালিখের ডানার মতো মনটা চুপসে যায় সন্দীপের। কে জানে হয়তো নির্বিষ সাপ ছিল!

* * *

পরের দিন বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের পাতায় একটি খবর প্রকাশিত হয়, ‘মাতৃদুগ্ধ পানে সদ্যোজাতর মৃত্যু। মা সুস্থ আছে। তবে ডাক্তারি পরীক্ষায় সন্দেহ করা হচ্ছে মায়ের দুধে সাপের বিষ ছিল।’

বৈবাহিক

অভীক দত্ত

সোমবারের সকাল।
প্রবুদ্ধ খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হিংসা, হানাহানি, মারামারি ছাড়া কিছু নেই। প্রবুদ্ধর মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল যত পড়ছিলেন।
অমলা কলেজের জন্য টিফিন বানাচ্ছিল। রান্নাঘর থেকে হাঁক পাড়ল— “বাবা, চা খাবে? নইলে স্নানে যাব।”
প্রবুদ্ধ বললেন, “না থাক। তুই তৈরি হয়ে নে। আমি ব্যাংকে যাব একবার তুই বেরোলে।”
অমলা টিফিন তৈরি করে টেবিলে রেখে স্নানে ঢুকল। আর প্রায় তার সঙ্গেই কলিং বেল বেজে উঠল।
প্রবুদ্ধ দরজা খুলে দেখলেন একটা বাইশ-তেইশ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রবুদ্ধ অবাক হলেন। ছেলেটিকে চিনতে পারলেন না। বললেন “কী চাই?”
ছেলেটি বলল, “অমলা আছেন?”
প্রবুদ্ধ বলতে যাচ্ছিলেন, “তোর থেকে কত বড় আর তুই নাম ধরে ডাকছিস?” বললেন না।
বললেন, “এসে বোসো। স্নানে গেছে। আসছে।”
ছেলেটি ঘরের ভেতর এসে বসল। প্রবুদ্ধবাবু সোফায় বসে আড়চোখে ছেলেটিকে মাপলেন। বাইশ-তেইশই হবে। ফরসা, রোগা চেহারা। চোখে বেশ দীপ্তি আছে একটা। প্রবুদ্ধ বললেন, “তা তুমি টিউশন নিতে এসেছ অমলার কাছে?”
ছেলেটি বলল, “না, আমি অমলাকে বিয়ে করতে চাই। পুজোর সময় ওনাকে আমি প্রপোজ করেছিলাম। উনি বলেছিলেন আমি যদি ক্যাম্পাসিং-এ চাকরি পাই তাহলে আমাকে বিয়ে করবেন। কাল চাকরিটা হয়ে গেছে। সেই খবরই দিতে এসেছি।”
প্রবুদ্ধ শুকনো ডাঙায় আছাড় খেলেন।
ছেলেটির দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বললেন, “অমলা গেল জানুয়ারিতে চৌত্রিশে পড়ল।”
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে বলল, “জানি তো। ফেসবুকে উইশও করেছি।”
প্রবুদ্ধ কী বলবেন বুঝতে পারলেন না।
খবরের কাগজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
সাধারণত মেয়ের কোনও ব্যাপারেই তিনি থাকবেন না ঠিক করেছিলেন, কিন্তু এবার ব্যাপারটা ঠিক সহ্য হচ্ছিল না তাঁর।
অমলার স্নান করতে সময় লাগে। পনেরো থেকে কুড়ি মিনিটের কমে অমলা বাথরুম থেকে বেরোয় না। এই সময়টা প্রবুদ্ধর অসহ্য লাগছিল। তিনি চাইছিলেন ছেলেটার সঙ্গে অমলার কী কথোপকথন হয় সেটা যেন পুরোটাই শুনতে পান।
স্ত্রী তিলোত্তমা চলে যাবার পর আজকাল মেয়ের ব্যাপারে একটু বেশিই চিন্তা হয়। মেয়ে তাঁর কথা শোনে না। বিয়ে থা করেনি। মা বেঁচে থাকাকালীন মেয়েকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, অমলা শোনেনি। স্ত্রী বিয়োগের পর প্রবুদ্ধ একবার কথা তুলেছিলেন, অমলা তাঁকে সরাসরি বলে দিয়েছে এ ব্যাপারে কোনও কথা না বলতে। তারপরেই প্রবুদ্ধ জেদ করেছেন মেয়েকে বিয়ের ব্যাপারে জোর করবেন না। যা ঠিক করবে, তাই করুক।
ছেলেটি চুপচাপ বসে মোবাইল ঘেঁটে যাচ্ছে।
কাগজ পড়ার চেষ্টা করে মন বসাতে পারলেন না প্রবুদ্ধ। টিভি চালিয়ে নিউজ চ্যানেল দিলেন। সঞ্চালক লাফালাফি করছে। কুস্তি হচ্ছে না আলোচনা সভা হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।
ছেলেটা বলল, “একটু জল পাওয়া যাবে?”
প্রবুদ্ধ বললেন, “ওই টেবিলে আছে। নিয়ে নাও।”
ছেলেটা উঠে জলের বোতল থেকে বাচ্চাদের মতো মুখ লাগিয়ে জল খেল।
প্রবুদ্ধর ঘেন্না হচ্ছিল, কিন্তু কিছু বললেন না। কাজের মেয়েটা এলে তাকে দিয়ে বোতলটা পরিষ্কার করে নিতে হবে।
ছেলেটা আবার বসে মোবাইল ঘাঁটতে লাগল।
প্রবুদ্ধ বললেন, “তোমার নাম কী?”
ছেলেটা বলল, “স্যাম। পুরো নাম শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী। কিন্তু বন্ধুরা ভালবেসে স্যাম বলে ডাকে।”
প্রবুদ্ধ বললেন, “ওহ।”
স্যাম বলল, “আপনি অমলার কে হন?”
প্রবুদ্ধ ‘বাবা’ বলেই কাগজে মন দিলেন।
ছেলেটা উঠে প্রবুদ্ধকে প্রণাম করতে এল।
প্রবুদ্ধ ছিটকে গিয়ে “না না থাক থাক” বলে পা তুলতে গেলেন, পারলেন না। স্যাম প্রণাম করেই ছাড়ল।
প্রবুদ্ধ বললেন, “এসবের কী দরকার?”
স্যাম বলল, “মা বলে দিয়েছে এখানে এসে আপনাকে প্রণাম করি যেন।”
প্রবুদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, “তোমার মা জানেন?”
স্যাম আবার মোবাইলে মনোযোগ দিতে দিতে বলল, “হ্যাঁ, মা-বাবা সবাই জানে। আমি বলে দিয়েছি। বিয়ে তো একটা বড় ব্যাপার, তাই না? বাবা-মা, ফ্যামিলি ইনভলভ না হলে হয় নাকি?”
প্রবুদ্ধ বড় বড় চোখ করে স্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও আচ্ছা।”
স্যাম বলল, “অমলার আর কতক্ষণ লাগবে?”
প্রবুদ্ধ বললেন, “জানি না। বলতে পারছি না।”
স্যাম আর কিছু বলল না। টিভিতে সঞ্চালক লাফঝাঁপ শুরু করেছে। প্রবুদ্ধর মাঝে মাঝেই ইচ্ছা করে লোকটাকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে আসতে। এসব লোককে টিকিট কেটে দেখা উচিত।
টিভির টেবিলে অমলার ছোটবেলার বেশ কয়েকটা ফটো আছে। দেওয়ালে অমলার ক্লাস এইটে আঁকা ছবি। স্যাম উঠে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্রবুদ্ধ আবার কাগজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
শসা চাষের উপকারিতা সম্পর্কে দীর্ঘ একটা প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। প্রবুদ্ধ কিছুক্ষণ সেটা পড়ার চেষ্টা করলেন।
তাঁর মাটিতে অ্যালার্জি আছে। এর আগেও বাড়িতে বাগান করার ইচ্ছায় মাটি কোপাতে গিয়ে হেঁচে কেশে একশা করেছেন। অমলা ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিল।
ডাক্তার সোম। অত্যন্ত মুখখারাপ একজন লোক। তাঁকে বলে বসলেন, “যেগুলো পোষায় না, বুড়ো বয়সে না করলেই নয়?”
প্রবুদ্ধ রেগে গেছিলেন।
কিন্তু কিছু বলেননি। শান্তিপ্রিয় মানুষ তিনি। বলার ইচ্ছা ছিল বাষট্টি বছরটা কোনও বয়স না। বিদেশে এই বয়সে লোকে জীবন শুরু করে। কিন্তু কিছু বলেননি। চিরকালই সব প্রতিবাদ মনে মনেই করেছেন। বলতে পারেন না।
স্যাম ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করল।
প্রবুদ্ধর কৌতূহল হল, কিন্তু কিছু বললেন না। বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হল।
প্রবুদ্ধ বুঝলেন অমলা বেরোচ্ছে। তিনি গলা সামান্য তুলে বললেন, “তোর সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছে।”
অমলা বললেন, “পাঁচ মিনিট বাবা, আসছি।”
প্রবুদ্ধ দেখলেন স্যাম ডায়েরিতে কিছু একটা লিখলে। তাঁর সঙ্গে চোখাচুখি হওয়ায় হেসে বলল, “ডায়েরি লেখার স্বভাব আছে আমার। যা হয়, লিখে রাখি।”
প্রবুদ্ধ অবাক হলেন। অমলারও ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে। ছোটবেলায় তিনিই শিখিয়েছিলেন ডায়েরি লিখতে। স্যাম অমলার পরের জেনারেশন। তার যে ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে… শুধু স্যামই না, এই প্রজন্মের কারও ডায়েরি লেখার শখ আছে সেটা অবাক করল তাঁকে।
তিনি বললেন, “তুমি অমলার ছাত্র ছিলে?”
স্যাম মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”
“অমলা তোমাকে বিয়ে করবে বলেছে?”
স্যাম বলল, “হ্যাঁ। আমি নিজের পায়ে দাঁড়ালে তবেই।”
প্রবুদ্ধর হিসাব মিলছিল না। অমলার জন্য বেশ কয়েকজনকে দেখা হয়েছিল। তাঁর এন আর আই বন্ধু প্রভাসের ছেলে দিবাকরও তার মধ্যে একজন। এদের কারও সঙ্গেই অমলা বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে রাজি পর্যন্ত হয়নি। প্রথমেই বলে দিয়েছিল তার বিয়েতে কোনও রকম আগ্রহ নেই। এই ছেলেকে বিয়ের কথা বলেছে? অবশ্য এও হতে পারে ছেলেটা হয়তো ঘ্যানঘ্যান করেছিল, তার ফলশ্রুতি হিসেবে এ কথা বলেছিল অমলা।
কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন প্রবুদ্ধ। এখনই অমলা আসবে। প্রথমে থাকবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু এখন চলে যাওয়াটাই ভালো হবে ভেবে উঠলেন।
মেয়ের কোনও ব্যাপারে থাকবেন না যখন ঠিক করেছেন, তখন না থাকাই ভালো।
সোফা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় অমলা ঘরে ঢুকল। অমলাকে উঠতে দেখে স্যামও উঠে দাঁড়াল।
প্রবুদ্ধও দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন।
অমলা স্যামকে বলল, “বোসো।”
স্যাম বসে পড়ল।
অমলা প্রবুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছ?”
প্রবুদ্ধ বললেন, “তোরা কথা বল, আমি ও ঘরে যাই।”
অমলা সোফায় বসে বলল, “না না তুমিও বোসো। তুমি গেলে হবে না।”
প্রবুদ্ধ কিছু না বুঝে সোফায় বসে বললেন, “না, মানে ছেলেটা বলছে তোকে বিয়ে করবে। তুই নাকি ওকে কথা দিয়েছিস চাকরি পেলে বিয়ে করবি?”
অমলা স্যামের দিকে তাকাল। বলল, “হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।”
প্রবুদ্ধ বললেন “ও চাকরি পেয়েছে কাল। সেটা বলতেই এসেছে।”
অমলা স্যামের দিকে তাকাল। স্যাম বলল, “অফার লেটার পাঠাবে ওরা পরের সপ্তাহে। টেকনিক্যাল খুব টাফ ছিল। কিন্তু আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি। এইচ আরে বেশি জিজ্ঞেস করেনি আর।”
অমলা বলল, “ঠিক আছে, এখন তো তুমি প্রবেশন পিরিয়ডে থাকবে। পারমানেন্ট হলে এগনো যাবে। ঠিক আছে? এখন যাও, আমি কলেজ বেরোব।”
প্রবুদ্ধ অবাক হয়ে অমলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মানে কী? তুই সত্যি ওকে বিয়ে করবি?”
অমলা বলল, “হ্যাঁ। শ্যাম পুজোর সময় আমাকে সরাসরি এসে প্রপোজ করেছিল। আমি প্রথমে ওকে বুঝিয়েছিলাম যে এটা অসম্ভব ব্যাপার। আমাদের বয়সের পার্থক্য বারো বছর। শ্যাম আমাকে কনভিন্স করাতে পেরেছে যে এই এজ ডিফারেন্সটা কোনও ব্যাপার না।”
প্রবুদ্ধ বললেন, “কী কনভিন্স করেছে? মানে কীভাবে? আমিও জানতে চাই।”
অমলা বলল, “কনভিন্স করিয়েছে এজ ডিফারেন্সটা কোনও ব্যাপার না। আন্ডারস্ট্যান্ডিংটাই আসল। আমি কনভিন্সড। এছাড়াও বিয়ের পর ও আমাদের বাড়িতেই থাকবে। ওর মনে হয়েছে বাড়ি চেঞ্জ করাটা আমার পক্ষে কঠিন ব্যাপার। সেটাও আমার কনভিন্সিং মনে হয়েছে।”
প্রবুদ্ধ হতভম্ব হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড পর বললেন, “আমাকে কী করতে হবে?”
অমলা বলল, “তোমাকে কিছু করতে হবে না। শ্যামের প্রবেশন পিরিয়ড পেরিয়ে গেলে ওর বাবা-মা আসবেন। তোমরা বিয়ের কথা বলে নিও।”
প্রবুদ্ধ বুঝতে পারলেন না রাগবেন না কাঁদবেন না হাসবেন।
অমলা চিরকালই পড়াশুনায় ভীষণ ভালো। কোনোদিনও পড়তে বলতে হত না।
মেয়ের পড়াশুনার ব্যাপারে কোনোদিনই প্রবুদ্ধ এবং তিলোত্তমাকে চিন্তা করতে হয়নি। চিন্তাটা শুরু হল বরং পড়াশুনা শেষের পর। তিলোত্তমার বাড়ি থেকে কিংবা প্রবুদ্ধর আত্মীয়স্বজনরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান এলে একই প্রশ্ন করে যায়— “কী গো! মেয়ের বিয়ে কবে?” “মেয়ের বিয়ে দেবে না?” “এত বড় মেয়ে আইবুড়ো হয়ে থাকলে কি ভালো?”
তিলোত্তমা মেয়ের চিন্তাতেই সুগার বাধিয়ে বসলেন এবং একদিন মরে গেলেন।
প্রবুদ্ধ একদিন মেয়ের ঝাড় খাবার পর নিজের সঙ্গে বসলেন। নিজেই ঠিক করলেন মেয়ের কোনও ব্যাপারে তিনি নেই। তারপর থেকে সুখেই ছিলেন। এতদিন পর হঠাৎ এতটা অগ্রগতি হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
স্যাম একটা ঝোলা ব্যাগ এনেছিল। সেটা হঠাৎ হাতড়াতে শুরু করল। অমলা বলল, “কী খুঁজছ?”
স্যাম খুঁজে পেল। হাসিমুখে একটা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সমগ্র বের করে প্রবুদ্ধর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা পড়তে পারেন।”
প্রবুদ্ধ একবার অমলার দিকে, আরেকবার স্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী আছে এতে?”
স্যাম বলল, “ছোটদের পুরাণের গল্প। সরল ভাষায় লেখা। বলরাম আর রেবতীর কাহিনি। একশ চৌষট্টি পাতা। রেবতী ত্রেতা যুগের মহিলা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম রৈবত ককূম্মী। রূপে, গুণে রেবতী অতুলনীয়া ছিলেন। ত্রেতা যুগে তাঁর সমকক্ষ কোনও পুরুষ পাওয়া না যাওয়ায় তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে ব্রহ্মার দরবারে যান। ব্রহ্মার দরবারে হাহা এবং হুহু নামক দুই গন্ধর্ব সেখানে ব্রহ্মাকে গান শোনাচ্ছিলেন। তখন তো আর কথা বলা সম্ভব নয়। যাই হোক, সে সঙ্গীত যখন শেষ হল, তখন দু-যুগ পেরিয়ে গেছে। রৈবত ব্রহ্মাকে বললেন, আমার রেবতীর জন্য পাত্র খুঁজে দিন। ব্রহ্মা রেবতীর বাবাকে বললেন, তোমরা ত্রেতা যুগে এসেছিলে। কিন্তু এখন তো আর ত্রেতাযুগ নেই। ব্রহ্মার দরবারে জরা-মৃত্যু কিছু নেই। এদিকে গান শুনতে শুনতে দু-যুগ পেরিয়ে গেছে। এক কাজ করো, তুমি বলরামের সঙ্গে রেবতীর বিয়ে দাও। তাঁরা মর্ত্যে এসে কৃষ্ণ এবং বলরামকে তাঁদের আর্জি জানালেন। এদিকে রেবতী তো বলরামের থেকে অনেক লম্বা। ত্রেতাযুগের মানুষেরা সবথেকে বেশি লম্বা ছিল। তারপরে সত্যযুগের মানুষেরা। দ্বাপর সে তুলনায় কিছুই লম্বা নয়। যাই হোক, বলরাম তাঁর লাঙ্গল দিয়ে রেবতীকে তাঁর সমান করে দিলেন। এরপরে দুজনে সুখে ঘরকন্না করতে লাগলেন।”
প্রবুদ্ধ অবাক চোখে বললেন, “এটা জেনে আমি কী করব?”
স্যাম বলল, “প্রচুর লোক থাকবে যারা আমাদের বিয়ে নিয়ে হাসাহাসি করবে, ট্রল করবে। আপনি এই বইয়ের গল্পটা বিয়ের কার্ডে জেরক্স করে সবার কাছে পাঠাবেন। সঙ্গে লিখে দেবেন, আমার রেবতীর জন্য ওর জেনারেশনের কাউকে পাইনি। তাই শ্যামলকান্তির সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করা হল।”
অমলা হাসছিল বাবার দিকে তাকিয়ে। বলল, “ঠিক আছে না পাত্র?”
প্রবুদ্ধ অমলার কথার উত্তর না দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্যামকে বললেন, “বইটা রেখে যেও। জেরক্স করিয়ে তোমাকে ফেরত দেব পরে।”

যদি এমন না হত

হৃষীকেশ বাগচী

(১)

ট্রেনে যেতে যেতে কালকের রাতটার কথা ভাবছিল ইন্দ্রগুপ্ত। দেড় মাসের বিবাহিত জীবন। শুকনো রজনীগন্ধার স্টিকের মতো হয়ে যাচ্ছে। তুঁতে-গোলা জল ছড়িয়ে রংচঙে না করলে আর উপায় নেই।
এক্সপ্রেস ট্রেন চলেছে বাসনাপুর। মাঠভর্তি কেটে নেওয়া ধানের ঝুঁটি। বসে বসেই ঝিমোতে থাকে ইন্দ্রগুপ্ত। বিয়ের পর থেকে তার সকালের দিকটাতেই বেশি ঘুম আসে। রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে রোজ তিনটে বেজে যায়। কিন্তু এতক্ষণ সে যে কী করে তা নিজেই বুঝতে পারে না। কেন যে রোজ এত রাত হয় ঘুমোতে তার কোনও সঠিক ব্যাখ্যা নেই তার কাছে। অন্য নববিবাহিতদের একটা ব্যাখ্যা অবশ্য আছে। কিন্তু মা কালীর দিব্যি বলছি, তার ক্ষেত্রে তেমন জুৎসই কোনও ব্যাখ্যা নেই।
এসব ভাবতে ভাবতেই কপালটা মাথাটা বিন্দু বিন্দু ঘামে ভরে উঠল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথাটা মুছল। একটা দীর্ঘকালীন বেদনা তার দৃষ্টিকে ছোট করে দিল।
ভক-ভক করে ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন চলছে। বাইরে পুজো-পুজো আমেজ। কিন্তু তার মনে কোনও কিছুর প্রক্ষেপ নেই।
তার মনে শুধু গতকালের রাত। কী তার আগের রাত্রিগুলি। তার দিনের আলোয় থাবা বসিয়েছে রাত। তার চেতনা জুড়ে শুধুই রাত। আর পাশ ফিরে শোবার গল্প।
ব্রিফকেসটা আগলে নিয়ে স্টেশনে নামল। এত মানুষের ভিড়েও সে কেমন জানি নিঃসঙ্গ বোধ করে। রাতে ঘুম কম হবার জন্য মাথাটা কেমন ভোঁ-ভোঁ করছে। ওভারব্রিজ পেরিয়ে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল। অন্যান্য দিন সরাসরি লাইন পেরিয়ে পারাপার করে। আজ কেন নিজের অজান্তেই ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে গেল সেটা সে একটু ভাবার চেষ্টা করে।
এখন কয়েকদিন ধরেই ওর নিজের আচরণে নানারকম অসামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছে। রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় তার চারপাশে কেউ নেই। আর সব অসংগতি নিয়ে মুখ গোমড়া করে ভাবতে বসাটাও নতুন ডেভেলপমেন্ট।
প্ল্যাটফর্মের ওপর মাসিক বইয়ের দোকান। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে মাঝারি মানের পর্নোগ্রাফি। অতিরিক্ত বক্ষসমৃদ্ধ মেয়েদের ছবি। ইন্দ্রগুপ্তের আজ সেসবও দেখতে ইচ্ছে করছে না। ও কি অসুস্থ?
চারপাশে নিত্যযাত্রীরা হাসতে হাসতে চলেছে। একেকজনের কমপক্ষে আট কী দশ বছরের বিবাহিত জীবন। কাউকে দেখে ওর মতো ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছে না তো! তাহলে ওদের কাল রাতে হয়নি? না কি ওরা সব অভিজ্ঞ পল্টন, কোথায় কখন বন্দুক রাখতে হয় জেনে গেছে?
কী সব আজেবাজে ভাবছে! নিজেকে কিছুটা ধিক্কার কিছুটা সহানুভূতি জানাতে জানাতে ওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সাদা অ্যাম্বাসেডরটার দিকে এগিয়ে গেল।

(২)

অফিসে আজ প্রচণ্ড কাজের চাপ। যান্ত্রিকভাবে সে কাজগুলো করতে লাগল। ফাইলের পর ফাইল টেবিলে জমেছে। ও একটার পর একটা সই করে যাচ্ছে। স্বাক্ষরবাবুর সাথে টাইপ করা চিঠির বয়ান নিয়ে চেঁচামেচি করল অনেকক্ষণ। যেটা সে কোনোদিন করে না। স্বাক্ষরবাবু তার বাপের বয়েসি লোক। হতেই পারে দু-একটা ব্যাকরণগত ত্রুটি। চায়ে চিনি কম দেয়ায় পিওন খাকিয়া পান্ডেকে প্রচণ্ড ঝাড়ল। যদিও চা বানায় মাসি ব্যঞ্জনবালা।
অফিসের সবাই যেন বড়বাবুর মেজাজে তটস্থ হয়ে উঠল। এমন সময় ঘরে ঢুকল দোলাচলী।
– আপনি এই সময়? আপনার যে চিঠিগুলো পাঠানোর কথা পাঠিয়েছেন?
– না, মানে স্যার… বলছি… গ্রেড টু কর্মী দোলাচলী ঘাবড়ে গেল। স্যারের কাছে এমন সরাসরি আক্রমণ সে অনেকদিন পায়নি। স্যারের কাছে চিরদিন সে মিষ্টি ভব্যতাই পেয়ে এসেছে।
ইন্দ্রগুপ্তও নিজের ব্যবহারে অবাক হল। হেঁটে যাওয়া দোলাচলীর পেছনটা লক্ষ করল। ওখানটা লক্ষ করা ওর অনেকদিনের ব্যসন। কিন্তু আজ সবকিছুতে কেমন জানি অসহিষ্ণু লাগছে। রাতে ভালো ঘুম না হলে…আচ্ছা কত লোক তো তার মতোই ব্যস্ত। তার চেয়েও ব্যস্ত। বয়স্ক। ওরা এত জার্নি করে বাড়ি গিয়ে রাতে করে কীভাবে? ভালো হয়? না হলে অত হেসে গালগল্প করে অফিসে এসে ফেরত যায় কীভাবে? একবার জিজ্ঞাসা করলে হত।
দরজা খুলে আবার দোলাচলী ঢুকলেন। বয়সে তার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। তার বউ চটুলাক্ষির মত সুন্দরী না হলেও চেহারায় চটক আছে। দুই ছেলের মা। ভারী বুক। পঁচিশ হাজার টাকা মাইনের শাসিত বুক। কত ঝড়ঝাপটা গেছে, তবু কত উদ্ধত। পরের জন্মে সে মেয়ে হয়ে জন্মাবে। আর শুধু-শুধু শুয়ে থেকে ব্যাটারির চার্জ মাপবে। মেয়েদের এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে কিছু হোস্টেলে শেখা সুভাষিত ওর মনে এল।
– স্যার চিঠিগুলো তৈরি। পিওনকে দিয়ে দেব?
কতক্ষণ দোলাচলীর বুকের দিকে তাকিয়ে ছিল খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরলে দেখল দোলাদি অভিমানাহত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
দোলাদি এত টিপটপ। এই বয়েসেও এত মেনটেন করেন। চটুলাক্ষিও তো গোছানো, পরিপাটি। তবে কাল রাত্রে কেমন একটা রংচটা ব্লাউজ পরে ছিল। সন্ধেবেলায় গা ধোয়নি। তাই তো কাল একটা… দুটো… তিনটে কিছুতেই…
– স্যার চিঠিগুলো পাঠিয়ে দেব?
ছি, ছি আবার! ইন্দ্রগুপ্ত সম্মতি দিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। দু-চারজন লোক ওর টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে গেছে। সে ফাইলগুলো আবার সই করতে থাকে।
কী যে হচ্ছে আজকে ওর! আজ শুধু নয় বিয়ের পর দেড়মাস ধরেই হচ্ছে। মাথায় সবসময় একটা অন্যকিছু ঘুরছে। সবসময় একটা ভয়-ভয় লাগে। এই বুঝি আলো নিভে যাবে। দরজা বন্ধ হবে। চটুলাক্ষি হালকা প্রসাধনী সেরে তার পাশে এসে শোবে। তার গায়ে হাত রাখবে। আস্তে আস্তে গায়ে পা-টা তুলে দেবে। ইন্দ্রগুপ্ত ওর হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাবার আভাস পেল। কেমন যেন একটা অজানা আশঙ্কা শিরশিরানি হয়ে ওর মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে আসছে…
ফাইলটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল হয়তো। পাশে স্বাক্ষরবাবু ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও একটু অপ্রতিভ হয়। সাতটা বেজে গেল। আধঘণ্টার মধ্যেই বেরোতে হবে। নইলে ফিরতি ট্রেনটা পাবে না। সাড়ে সাতটা। মানে বাড়ি ফিরতে সেই সাড়ে দশটা। তারপর একটু নিউজ চ্যানেল। ডিনার। মা-র সাথে কিছু সুখদুখের আলাপ। বারোটা বেজে যাবে। তারপর সে দোতলায় উঠবে। বেঁটে রোগা একটা ছায়া ঘরে ঢুকবে। লাইট বন্ধ হবে। চটুলাক্ষি হালকা প্রসাধনী সেরে…
ওহ অসহ্য! কী হচ্ছে এসব! আজ যেন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হচ্ছে।
আসলে এসব হতই না। অন্তত এতটা হত না সে জানে। তার জন্য চটুলাক্ষিই দায়ী। কাল রাতে বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর বউ তার মাথায় তবলা বাজিয়ে দিয়েছে।
এই অপমানটা ও আজ কিছুতেই হজম করতে পারছে না। বৌ তার পৌরুষ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করলে সে মনে কিছু করত না, কিন্তু মাথায় মানে পেল্লাই টাকে তবলা বাজিয়ে দেওয়াটাকে ও কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না।

(৩)

টাক বংশগত সবাই জানে। কিন্তু এ বংশগত ফাঁড়া যার কপালে আছে, তার যে কী অবস্থা হয়, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে।
ছোটবেলা থেকে সে যে কতরকম তেল আর কতরকম চিরুনি ব্যবহার করেছে তার হিসেব নেই। যতরকম শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন হয়, তারা কোনও না কোনও সময় তার বাথরুমে শোভাবর্ধন করেছে। কিন্তু কোথায় কী? তার স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে-জাগরণে বালিশে টাটকা চুলে ভরে গেছে।
অন্ধকারে মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে ছাদে চলে গেছে। মনে হয়েছে পৃথিবীতে তার মতো দুঃখী মানুষ আর দুটো নেই। দিনে দিনে খিদে কমে গেছে। ওজন কমে গেছে। সে একটু পরপর উঠে আয়নার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে এসেছে।
সবচেয়ে মন খারাপ হত চুল কাটতে গেলে। সামনে আর মাঝখানে কোনোভাবেই ঢেকে রাখা যায় না। যতক্ষণ চুল কাটা হয় ও চোখ বন্ধ করে রাখে। চুল কাটার পর ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকায়। পাশে বসে বছর পঞ্চাশের একজন চুল কাটাচ্ছে। মাথাভর্তি চুল। চুল কাটার কত রকম নকশা। টাকা মিটিয়ে রবিবারের রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে কতদিন ভুল করে অন্য রাস্তায় চলে গেছে।
যে যখন যা তেলের কথা বলেছে, তা-ই মাথায় মেখেছে। রাতে শোবার আগে তেল লাগিয়ে শুয়েছে। বালিশে তেল চিটচিটে দাগ পড়ে গেছে। তেলের গন্ধে বিছানায় পিঁপড়ে উঠে গেছে। কিন্তু চুল গজায়নি।
কয়েকদিন মাথায় টুপি পরে বাইরে বের হত। শীত নেই গ্রীষ্ম নেই, মাথায় টুপি। বন্ধুরা অতিরিক্ত আওয়াজ দেওয়াতে সেটা বন্ধ হয়েছে। আঙুলে আঙুল ঘষে রামদেবও করেছে। কোনও সুরাহা হয়নি। ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে টানা ছয়মাস ওষুধও খেয়েছে। কোথায় কী! এখন তাই সব ছেড়ে দিয়েছে। হতাশাটা কয়েকদিন বেশ স্তিমিত হয়ে আসছিল। বেড়ে গেল বিয়ের পর। বিয়ের বাসর জাগার দিনই তার শালা-শালীরা টাক নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেছে। সবাই যত মজা করেছে তত সে কুঁকড়ে গেছে ভেতরে ভেতরে।
এদিকে চটুলাক্ষি যথেষ্ট সুন্দরী। স্বাস্থ্যও সুন্দর। বিবাহিত বন্ধুরা বিয়ের আগে তার প্যাংলা চেহারার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এদিকে বউ প্রায় তার মাথায় মাথায়। ছেলে আন্দাজে ইন্দ্রগুপ্তকে লম্বা বলা যায় না মোটেই। তাই বিয়েতে সম্মতি দিতে সে প্রথম প্রথম একটু ইতস্তত করেছিল। বন্ধুরা বলল, “ইন্দ্র তুই এত বড় চাকুরে। এই পৃথিবীতে পয়সা যার সবই তার। আর অসুবিধে হলে আমরা তো আছিই ইত্যাদি।”
যা হোক, বিয়ে তো হয়ে গেল। বিয়ের দিন রাতে বাসর জেগে ভোররাতে শোবার পর বউ পাশে শুয়ে সবার মধ্যেই ওর পায়ে পা দিয়ে চিমটি কেটেছে। কোথায় উৎসাহিত হবে তা নয়। সে চমকে উঠে ঘাবড়ে গেছে।
সেই ঘাবড়ে যাওয়া এখনও চলছে। কিছুতেই রাতের বেলা ঠিকঠাক হচ্ছে না। চটুলাক্ষি প্রতিদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শোয়, আর সে তার পৌরুষকে গালি দিতে দিতে রাত জেগে কাটায়।
শারীরিকভাবে সে যে অসমর্থ নয়, ইন্দ্র তা জানে এবং সেটা প্রমাণিতও। কিন্তু তার সমস্যা হল সে সবসময় জেগে উঠতে পারছে না। সে জানে এটা কোনও সমস্যা নয়। নতুন বিয়ের পর পর হয়। তা বলে চটুল কাল রাতে টাকে তবলা বাজিয়ে দেবে?

(৪)

সমস্যাটা এতই গোলমেলে যে কারোর সাথে আলোচনাও করা যাচ্ছে না। কথা বলতে গেলেই একটা রটনা হবে। তবে তার চিত্তবৈকল্য লক্ষ করে স্বাক্ষরবাবু ওকে উপদেশ দিয়েছেন বাসনাপুরের এক সাধুর কাছে যেতে। উনি নাকি ত্রিকালজ্ঞ মহাপুরুষ। কপালদেব। কপাল দেখে ভাগ্য নির্ধারণ করেন। তাঁর নিদান একেবারে অব্যর্থ।
প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে সে ব্যাপারটাকে অবহেলা করতে পারল না। একদিন চলেই গেল অফিস থেকে আগে বেরিয়ে।
কপালদেব একটা বিরাট বড় অশ্বত্থ গাছের নিচে চাতালে বসেছেন। চতুর্দিকে ভক্তবৃন্দ পরিবৃত। বাবার মাঝে মাঝে ভর হচ্ছে, আবার প্রকৃতিস্থ হচ্ছেন। ভক্তরা অবিরাম জয়ধ্বনি দিচ্ছে। চারিদিকে খোল কত্তাল বাজছে। ধুনোর ধোঁয়ায় জায়গাটা ভরা। তার কেমন আচ্ছন্নের মতো লাগল।
সে সাহস করে বাবার কাছে এগিয়ে এল।
কপালদেব তাকে দেখে হঠাৎ বলে উঠলেন, “অক্ষম যৌনজীবন, হতাশা, অপূর্ণতা– শনি তোর মাথায় চড়ে বসেছে একেবারে। দাঁড়া, দাঁড়া বল তোর কী চাই?”
ইন্দ্রগুপ্ত তো যাকে বলে একদম বাক্যরহিত। ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
– বল বাবা বল তোর যা চাই আমাকে বল। সব কামনা বাসনার প্রাপ্তিযোগ আজ তোর কপালে লেখা আছে। তুই খালি প্রাণ ভরে চেয়ে নে।
সে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না।
– বাবা আপনি তো সবই জানেন। আপনার কাছে কি কিছু গোপন থাকে?
– তবু তোকেই চাইতে হবে। আমি তো তোকে দেবার জন্য বসে আছি রে পাগল।
– যা চাইব তা-ই পাব? সে একটু ইতস্তত করে।
– যা চাইবি, আজ তা-ই পাবি। একবার দিল সে মাঙ্গকে তো দেখ।
– বাবা আমার মাথায় টাক। চুলে ভরে দাও। আর বড্ড রোগা আর বেঁটে। আমাকে স্বাস্থ্যবান পুরুষ করে দাও।
– বেশ তাই হবে। এই বলে কপালদেব তার মাথায় গায়ে যজ্ঞের বিভূতি আর জল ছড়িয়ে দিলেন।
– কিন্তু একটা শর্ত আছে।
– কী শর্ত বাবা? পয়সাকড়ি যতই লাগুক তার কোনও আপত্তি নেই। এতকাল তো কম পয়সা ঢালেনি! আর মাথাভর্তি চুল। উফ! ভাবলেই ওর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
– শোন, তুই যখন পূর্ণরূপ লাভ করবি, তখন বউকে জিজ্ঞাসা করবি তোর নতুন রূপ বউয়ের পছন্দ হয়েছে কিনা। যদি তোর বউ অসম্মতি জানায়, তবে কিন্তু তুই আবার আগের রূপেই ফিরে আসবি।
হায় রে হায়! এটা কোনও শর্ত হল। চটুলাক্ষি তো সবসময় তাকে বলছে মাথায় উইগ পরতে। তার ওপর পার্মানেন্ট চুল। ভাবা যায়! আর চেহারার ব্যাপারটা ছেড়েই দিলাম। মেয়েরা ওটা ঠিকঠাক হলে আর কী চায়?
– ঠিক আছে বাবা আমি শর্তে রাজি। কিন্তু বাবা আমার রূপ কখন ফিরে পাব?
– পাব মানে? পেয়ে গেছিস।
আস্তে আস্তে মাথায় হাত দিয়ে দেখল মাথায় ভরে গেছে টোপরের মতো চুলে। বুকের চামড়াও টানটান লাগছে। হাতের পাঞ্জা চওড়া হয়ে গেছে। বসে থাকা অবস্থাতেই তাকে অনেকটা লম্বা লাগছে।
– শোন তুই যে এখানে আসার পর পালটে গেছিস এটা গোপন রাখবি। কাউকে কিছু বলবি না। যা, এখন বাড়ি যা।
– বাবা আপনার দক্ষিণা? কপালবাবার পা ছুঁয়ে কৃতজ্ঞতায় গলে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
– যা যা, বাড়ি যা। আমি সাধক। অর্থে লালসা নেই।
হাতে ব্রিফকেসটা নিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটতে থাকে। পৌঁছে দেখে বাসনাপুর এক্সপ্রেস ছাড়ব ছাড়ব করছে। ট্রেনে উঠে প্রচণ্ড উত্তেজনায় আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আহা কী অনুপম দৃশ্য! মাথাভর্তি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। এই দৃশ্যটা দেখবার জন্য সে স্বপ্নে জাগরণে কতদিনই না অপেক্ষা করে আছে।

(৫)

চোখে মুখে একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে কলিং বেলটা টিপে দিল ইন্দ্রগুপ্ত।
– কে? কাকে চান আপনি?
– মা আমি ইন্দ্র। কাতরস্বরে বলল।
– তুই? কী বলছিস? মা দ্বিধাবিভক্ত। তবু গলার স্বর শুনে আর মুখের মিল দেখে দরজা খুললেন।
– তোর মাথাভর্তি চুল এল কীভাবে? আর… আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
– এসে গেল মা। ভগবানের কাছে চাইলাম, উনি দিয়ে দিলেন। সে তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
– ভোজবাজি নাকি? চাইলাম আর এসে গেল!
– হ্যাঁ মা সত্যি। আমি তো নিজেই অবাক। ও ব্যাপারটা লঘু করার চেষ্টা করে।
– আপনার মানে তোর বাবার নাম কী? তোর জন্ম কত সালে? তুই কবে মাধ্যমিক পাশ…?
– মা, মা… তোমার হলটা কী? বলতে বলতে সে জামা তুলে পেটের কাটা দাগটা দেখায়। ছোটবেলায় বটির ওপর পড়ে গিয়ে দশটা সেলাই পড়েছিল।
– তা না হয় হল, কিন্তু আর… আরও কিছু বলতে গিয়ে স্থিতিশীলাদেবী থেমে গেলেন।
ইন্দ্রগুপ্ত আর কথা না বাড়িয়ে দোতলায় উঠে গেল।
অন্যান্য দিন হলে চটুলাক্ষিও উপরে আসে। আজ আর এল না। ইন্দ্রগুপ্ত আগে হলে এই নিয়েই আধঘণ্টা ভাবত। আজ তার ভাবার অবকাশ নেই।
বাথরুমে গিয়ে তিনবার করে মাথায় শ্যাম্পু করল। হাতে কোনও চুল নেই। একটাও চুল ওঠেনি। আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছে ওর। শাওয়ার খুলে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল কিছুক্ষণ। মিকেলেঞ্জেলোর ডেভিড। আস্ত একটা গ্রিক ভাস্কর্য যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
খাওয়া-দাওয়া বেশ নীরবেই হল। মা-বউ ওর সব কাজকর্ম লক্ষ করছে, এটা সে বুঝতে পারল। মুখে মিটিমিটি হাসল। অন্যান্যদিন হলে এটা নিয়েই আধঘণ্টা… কিন্তু আজ তার ভাবার সময় নেই।
প্রতিদিন রাতে সে ভেতরে কাঁপতে কাঁপতে মাথায় হাত দিয়ে শোয়। চটুল নিজের থেকে এসে একটু নাড়াচাড়া করে। আজ তার সারা শরীরে কীসের যেন একটা আলোড়ন চলছে। লক্ষ করল চটুলাক্ষি পাশ ফিরে শুয়ে আছে। সে বউয়ের কাছে গেল। চটুলাক্ষি একটু হাসল। বাধা দিল না।
তারপর যা হল ইন্দ্রগুপ্ত বুঝতে পারল হওয়াটা স্মরণীয় হতে হলে কেমন হতে হয়। প্রচণ্ড তৃপ্তি নিয়ে সে শুল এবং এক ঘুমে সকাল।

(৬)

সকালবেলা স্নানের পর ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে ইন্দ্রগুপ্ত আয়নার সামনে তাকাল। ঝকঝকে মুখ। কোনও ক্লান্তির ছাপমাত্র নেই।
পাশেই দেখল হাসিমুখে চটুল এসে দাঁড়িয়েছে। তার জামায় পারফিউম ছড়িয়ে দিল। চ্যাপ্টা সিঁদুর। চোখমুখে ক্লান্তির ছাপ। ঠিক অন্যান্য দিন তার যেমন অবস্থাটা হয়। তবে তার প্রসন্নতাটা ইন্দ্রগুপ্তের চোখ এড়াল না।
হঠাৎ তার কপালদেবের শর্তের কথা মনে পড়ে গেল। এটাই তো জিজ্ঞাসা করার আদর্শ সময়। না, থাক যাবার সময় জিজ্ঞাসা করবে।
তবে চটুলের চোখে-মুখে তার প্রশ্নের উত্তর সে পেয়েই গেছে।
আবার খাবার টেবিলে মা নীরব। চটুল মুচকি হেসে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আহা, তার প্রাণভোমরা ওই হাসিটাই তার সব টেনশন কেড়ে নিচ্ছে।
চটুলের চোখে-মুখে প্রশ্নের উত্তর সে পেয়েই গেছে।
অফিসে বেরোবার আগে সে বউকে একটু কাছে টেনে নিল। লক্ষ করল জুতো ছাড়াই সে বউয়ের থেকে অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে। বউয়ের মুখের দিকে সে চাইল। সেই মুচকি হাসি।
এবার ওর কেমন একটু ভয়-ভয় করছে। তবে সাহস করে বলেই ফেলল কথাটা, আচ্ছা সোনা আমাকে তুমি এখন যেমন দেখছ তাতে বেশি ভালো লাগছে, নাকি আগে বেশি ভালো লাগত?
চটুলাক্ষি একবার মুখ তুলে তাকাল। মুখে সেই মুচকি হাসি।
– আমার তো তোমাকে আগেই বেশি ভাল লাগত গো। বলে হাসিতে ফেটে পড়ল চটুলাক্ষি। তারপর ছুটে পাশের ঘরে চলে গেল।
– হাসিটা অট্টহাসি হয়ে যেন তাকে বজ্রাহত করে দিল।
মা-কে প্রণাম করে ইন্দ্রগুপ্ত রিক্সায় উঠল।
বাসনাপুর এক্সপ্রেসে অনেকক্ষণ আনমনা বসে থেকে তার একটু একটু গরম লাগতে লাগল। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। রুমাল বের করে সে কপাল, মাথা… মানে পরিব্যাপ্ত টাকটা মুছল।
জীবনে এই প্রথমবার সে একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ল। হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝতে পারল না।

ব্যাসিলিকা

সোনালি

“লিক ইট অফ; লিক ইট অল অফফ!”
যন্ত্রণা, পিপাসা, আরও কী কী যেন মিশে শব্দগুলোর সঙ্গে।
চার্চের ভিতরের আলোআঁধারি আর্চ দেওয়া সিঁড়ির তলায় ঘুরতে ঘুরতে হাস্কি পুরুষকণ্ঠের আর্তস্বর শুনে এগিয়ে গিয়েছিল সঞ্চারী।
একটা জংধরা লোহার পাত লাগানো পুরোনো কাঠের দরজার ফাঁকে চোখ রেখে নিজের অজান্তেই শ্বাস টেনে নিয়েছিল লম্বা করে।
ছোট্ট ঘরটা। গোল টুলের ওপর কাঠের বাতিদানে রাখা মোমবাতির আলোয় ফুটে উঠেছে একটা ঘামে ভেজা চকচকে চওড়া পিঠ, নিচের দিকে ঢালু হয়ে নামা সরু কোমর, আরও নিচে সুগোল নিতম্বের খাঁজ, পেশিবহুল এক জোড়া লম্বা পুরুষালি পা। মুখোমুখি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে একটা কাঠের চৌকিতে বসে আছে অলিভরঙা সুন্দরী। একটু তেকোনা মুখের ছাঁদ। লম্বা লম্বা হাত পায়ের টান। খয়েরি গোছের একরাশ চুল মাথার ওপর দিকে এলোমেলো খোঁপায় আটকানো। বড় বড় পাপড়িতে ঘেরা দীঘল চোখ জোড়া নিষ্পলক হয়ে আটকে আছে সামনের অনাবৃত পুরুষ শরীরে। একদৃষ্টে চেয়ে আছে মেয়েটা। পলক পড়ছে না। নিশ্বাসও বন্ধ বুঝি। উত্তপ্ত তীব্র দৃষ্টি দিয়েই যেন লেহন করে নেবে সামনের উন্মুক্ত শরীরটাকে। পাতলা লাল চামড়ায় ঢাকা খাঁজকাটা এক জোড়া ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে গেছে। ঠোঁটের ওপরে, ঠিক মাঝখানের খাঁজ বরাবর মুক্তোর মত ঘামের বিন্দু।
সামনের পুরুষালি শরীরটি মসৃণ। ঘামে ভিজে চকচক করছে।
কন্যার হাতে পলকাটা কাঁচের বাটি। সোনালি রঙ টলটল করছে তাতে। ঠিক তরল নয়। একটু ঘন কিছু। সামনের নিখুঁত উন্মুক্ত পুরুষ শরীরটি থেকে চোখ না সরিয়েই সে ডান হাতের আঙুলগুলো চুবিয়ে দিয়েছে সেই সোনারং বস্তুটায়। আঙুলগুলো তুলে নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিতেই, হাত বেয়ে গড়াতে লাগল চটচটে সোনা। খাঁটি মধু।
একটানে তর্জনী আর মধ্যমার গড়ানো মধু সামনে দাঁড়ানো পুরুষটির শরীরের মাঝবরাবর সরল রেখায় মাখিয়ে দিয়েই, আস্তে আস্তে ঠোঁটের কাছে আঙুলগুলো নিয়ে এল মেয়ে। পুরুষটির চোখে চোখ রেখে আস্তে আস্তে চেটে নিতে লাগল নিজের আঙুলগুলো। লাল টুকটুকে জিভের ডগায় গড়িয়ে পড়া নেশা লেপটে যাওয়ার সঙ্গেই ভেসে এল আর্ত পুরুষকণ্ঠ, “আহ মারিয়া…”
নিজের বুকের ঢিপ ঢিপ শুনতে শুনতে সঞ্চারী ভাবল, “মধু? কী উর্বর ভালোবাসার মস্তিষ্ক রে…”

গোয়ার পুরোনো চার্চের ভিতর দাঁড়িয়ে ছিল সঞ্চারী। ইতিহাসের ছাত্রী। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এসেছে গোয়া। এডুকেশানাল ট্যুর।
পনেরো-শ শতাব্দী থেকে পর্তুগিজদের নজর গোয়ার ওপর। যুদ্ধপিপাসু এলবুকার্ক বারে বারে ফিরে এসেছে সৈন্য, আর্মাডা, কামান নিয়ে। আদিল শাহি, বিজাপুরী মুসলমান শাসকদের সঙ্গে এদের লড়াই চলেছে বছরের পর বছর। ধর্মের বিভেদে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় কোঙ্কনি হিন্দুরা গোপনে হাত মিলিয়েছে এই বিদেশিদের সাথে। তারা ভেবেছিল মুসলমানদের চেয়ে এরা ভালো।
আর পর্তুগিজ ভেবেছে, আহা সোনাদানা, মুক্তো, হিরে, সোনার চেয়ে দামি মশলার বাহার আর অজস্র সুন্দরী নারী। এমনি করেই হার্মাদ নিষ্ঠুর পর্তুগিজদের পোক্ত ঘাঁটি হয়ে উঠেছে গোয়া দমন দিউ। একেক বারের আক্রমণের পর এরা বীভৎসভাবে খুন করেছে মুসলমান পুরুষদের। হিন্দুরাও ছাড় পায়নি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। আর মেয়েমানুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে জাহাজের ভিতর খাঁচায় ভরে রেখেছে পোষা জন্তুর মতো। যুদ্ধে জেতার পর দিন চারেক করে নাবিক, সৈনিকদের ক্ষুধার্ত কুকুরের দলের মতো শহরের ওপর ছেড়ে দিয়েছে সেনাপতি।
যাও, যা ইচ্ছে করে এসো, যা পারো লুটে নাও।
আদিল শাহ, পেশোয়া, বিজাপুরী সুলতান কেউই এদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত জিতে গেছে পর্তুগিজরাই। শহর দখল করে এদেশের সমস্ত সোনা রুপো তামা গলিয়ে নিজেদের মুদ্রা বানিয়ে ফেলল এরা। গোয়া দমন দিউ মিলিয়ে তৈরি হল পর্তুগিজ কলোনি। হেরে যাওয়া মানুষগুলোকে মেরে পিটে ক্রীতদাস বানিয়ে কায়েম করে ফেলল রাজত্ব।
পশ্চিমের আরব সাগরের তীর, পাশ্চাত্যের সঙ্গে জলপথে বাণিজ্য, রয়ে গেল এদের হাতের মুঠোয়।
পশ্চিমঘাট পর্বত। সহ্যাদ্রির রুক্ষ সৌন্দর্য। মান্ডভির জলে ভাসা আম নারকেলের অজস্র সবুজ। লাল মাটিতে সোনার চেয়েও দামি মসলার সুগন্ধি ফলন। এদেশের মানুষের ঘরে অপর্যাপ্ত হিরে, চুনি, পান্না।সবই পৌঁছল বিদেশি কোষাগারে। সমস্ত সমুদ্রতীর জুড়ে তৈরি হল কেল্লা, লাইট হাউস। শাসকরা নিরাপদ করল নিজেদের। ছাপোরা বিচের পাশে পুরোনো ফোর্ট, কান্ডলিম বিচের পাশে ফোর্ট আগুয়াডা, কেল্লার সাথে পুরোনো লাইট হাউসে পুরোনো গল্পের হাতছানি। এমন অজস্র দুর্গ চারদিকে।
এমনি করেই থেকে গেল পর্তুগিজরা। সঙ্গে নিয়ে এল উদ্দাম লালসা, বুল ফাইটের রক্ত লাল উন্মাদনা, মদের ফোয়ারা আর ক্রিশ্চান পাদ্রীদের।
চার্চ তৈরি হল। চার্চের ওপরদিকের শিক্ষিত মানুষেরা অনেকেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজে লিপ্ত রইলেন। চারপাশের দেশি মানুষ চার্চে যেতে লাগল খাদ্য আর আশ্রয়ের আশ্বাস পেয়ে। মিশে যেতে থাকল ভারতীয় রক্তের সঙ্গে পর্তুগিজ জিন।
চার্চের আধিপত্য সেকালের রাজাগজাদের থেকে তো কম কিছু ছিল না। চার্চের সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, প্রয়োজনে যুদ্ধ করার শক্তিকে সমঝে চলত সবাই। গোয়াতেও তৈরি হল একের পর এক বিশাল দুর্গের মতো প্রাসাদ। চার্চ অফ সেইন্ট কাজেতান, চার্চ অফ সেইন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি, ব্যাসিলিকা অফ বম যিশাস, আওয়ার লেডি অফ ইম্ম্যাকুলেট কন্সেপশান চার্চ, সে ক্যাথিড্রাল, চ্যাপেল অফ সেইন্ট ক্যাথেরিন, চার্চ অফ লেডি অফ রোজারি, মন্টে হিল চার্চ, চ্যাপেল অফ সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার, আবার সেন্ট আলেক্স চার্চ, যা কিনা সরাসরি রাবালনাথের হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে। জোর যার মুলুক তার। কত যে সোনা রুপোর ছড়াছড়ি চার্চের ভেতর। অল্টারের উপাসনা বেদীতে, দেওয়ালে, বিশাল উঁচু হলের ফ্রেস্কো করা সিলিঙে।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পরেও গোয়ায় পর্তুগিজ শাসন চলেছে বহুদিন। প্রায় পনেরো বছর পর গোয়া ফিরে এসেছে দেশের কাছে। এই যে বহু-বহুদিন পর্তুগিজ শাসন ছিল গোয়াতে, তার কলোনিয়াল গন্ধ এখনও ঘুরে বেড়ায় এ শহরের আকাশে বাতাসে। সব জায়গায় সেই ছোঁয়া। পুরোনো ঢালু টালির ছাদের বাংলোয়। রাতের সুন্দর কাঁচের লন্ঠন জ্বালানো বারান্দার টেবিলে। ফেনির গ্লাসের সঙ্গে ম্যাকারেল ভাজার প্লেটে। পিয়ানোর গানের সুর আর গিটারের টুংটাংসহ প্রেমের গানে। পাশের সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে আসা নোনতা মিঠে হাওয়ার উদ্দাম এলোমেলো শিরশিরানিতে।
গোয়া। বিদেশিনী ধাঁচের সুন্দরী গোয়া। কালঙ্গুট, মিরামার বিচে মুম্বাই সিনেমাশুটের গল্প ছড়ানো মোহময়ী লাস্যে উজ্জ্বল। রঙিন রোমান্সে টলমল গোয়া। বিদেশি মানুষের ভিড়ে ভর্তি হয়ে থাকা গোয়া। এখানে রাস্তায় ঘাটে স্কার্ট, ফ্রক, সারং, হট প্যান্টস বেশি। দেশি পোশাক কম। জামাকাপড় এখানে বাহুল্য। সামাজিক বন্ধনও এখানে শিথিল।
গোয়ার সমুদ্রের কত রূপ। একদিকে আরামবোল, মান্দ্রেম, ভাগাতোরের হিপ্পি উল্লাস, নাইট স্পট, হাওয়াইয়ান ফ্যাশান, সি ফুডের বাহার। অন্যদিকে কোথাও রাশিয়ান কালচারের খানাপিনা, কোথাও রক ফেস্টিভাল।
নেশার নানা চেহারা। উচ্ছল বাঁধনহীন উল্লাসের ঘোড়া ছোটানো অজস্র বার, ভিলা, রঙিন পিছুডাক। সারা পৃথিবীর মানুষ বাঁধন ছেঁড়ার আস্বাদ পেতে ছুটে আসে গোয়ার সমুদ্র পাড়ে।

কলকাতার ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীরা অবশ্য পুরোনো ঐতিহ্য, ফ্রেঞ্চ-পর্তুগিজ স্থাপত্য, চার্চ, কোঙ্কনি মানুষের সঙ্গে এদেশের সাংস্কৃতিক মিশেল, এইসব ছুঁয়ে ছেনে দেখতে এসেছে। সমুদ্রস্নান আর শপিং-এর চেয়ে এসবের টান এদের কাছে বেশি। এরা নেশাপত্রর এক্সপেরিমেন্টে মন দেয়নি। টপলেস বিচে যাবারও রুচি নেই এদের। পর্তুগিজ মানুষদের পাড়া, বাড়িঘর, চার্চ, সরাইখানা– এইসব দেখে বেড়াচ্ছে রোজ। দুজন টিচার এসেছেন এদের সঙ্গে। লোকাল গাইডদের কাছ থেকেও পুরোনো গল্প, স্থানীয় ঘটনা জেনে নিতে বলছেন স্যাররা। আফটার অল, ওরাই তো জীবন্ত ইতিহাসের বই।
ট্যুর বাসটা দুপুর নাগাদ এই স্পটে এসে থেমেছে। চড়া রোদ। বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের মাথাতেই টুপি। চোখে কালো চশমা। ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে বারণ করলেন মাস্টারমশাইরা। স্পেশাল পারমিশান ছাড়া ভিতরে ছবি তোলা বারণ।
পুরনো চার্চের উপাসনাকক্ষে সোনায় মোড়া অল্টার বেদীর চারপাশে ভিড় করে ছিল বন্ধুরা। বিরাট হল। আর কত উঁচু।
সোনার সিংহাসন। রুপোর ভারী কাজকরা মোমদান, বাসনপত্র। সোনার চেয়েও দামি কাঠের জানালা, খিলান। ভেনেশিয়ান গ্লাসের বিশাল বিশাল আয়না। অনেক লম্বা লম্বা জানালা আর কার্নিশের ওপরের দিকে ডোমে রঙিন কাঁচের টুকরো দিয়ে তৈরি অজস্র নকশা, বাইবেলের নানা ঘটনার ছবি। স্যার বললেন স্টেইন্ড গ্লাশ।
একটা কালো কাঠের লম্বাটে বাক্স দাঁড় করানো ছিল একপাশে। পাশে আবার কাল কাপড়ের পর্দার মতন কী একটা ঝুলছে। সঞ্চারীরা জিগ্যেস করতে, ওদের শিক্ষকদের আগেই লোকাল গাইড ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “কনফেশান। কনফেশান। ইট ইজ দ্য কনফেশান বক্স।”
সবাই দারুণ কৌতূহলী হয়ে চলে এল এ বস্তুটা দেখতে।
এবার স্যর বুঝিয়ে বললেন, বাক্সটার ভিতরে দাঁড়াবার জায়গা আছে। দুজন মানুষ দাঁড়াতে পারে এর মধ্যে। একজন, যে কোনও অপরাধ করেছে। যার অনুশোচনা হয়েছে বলে বিবেকের দংশনে ছুটে এসেছে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে। অন্যজন ঈশ্বরের প্রতিনিধি কোনও ধর্মযাজক। বাইবেল বলেছে পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। এখানে নিজের পাপের কথা স্বীকার করে পাদ্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে অনেক সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরত। তাদের গ্লানি জমা থাকত চার্চের কাছে।
সবাই ঘুরে ফিরে দেখতে থাকে এই বাক্সটা। আর এর চারপাশের জিনিসপত্র।

এক ফাঁকে সঞ্চারী পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়িটার আনাচকানাচগুলো একা ঘুরে দেখবে বলে। পুরোনো সময়কে ছোঁয়ার চেষ্টা করাটা ওর নেশা।
হলদে খয়েরি পাথরের বিশাল প্রাসাদ। অনেকটা দুর্গের মতো। পুজোর বেদী, প্রার্থনার হল ছাড়াও কত কত ঘর, প্যাসেজ চারদিকে। অলিগলি রাস্তারা কোথায় কোথায় গেছে? বাইরের বড় দরজাটাও দুর্গের দরজার মতোই। তিন-চার মানুষসমান উঁচু, ভারী কাঠের। বাইরে লোহার পাত লাগানো। তার ওপর একহাত লম্বা লম্বা মোটা লোহার পেরেক গাঁথা। আক্রমণ ঠেকানোর জন্যেই নিশ্চয়ই। হবে না। কত সোনা রুপো দামি জিনিস ঠাসা ভিতরে। আগে তো আইনি ক্ষমতাও প্রচুর ছিল। রাজাগজাদের মতোই তো ছিল চার্চের লোকেরাও।
দরজার ভিতরের দিকে মোটা কাজ করা রুপোর পাত। একটা বড় প্যাসেজ পুরো চার্চের তোলাটা ঘিরে এসেছে। ওইটা ধরে হাঁটলে প্রদক্ষিণ করে আসা যায় সবটা। ওর সামনের ভাগটাতেই বড় তামার বেদি। সেখানে অজস্র মোমবাতি জ্বলছে। দরজার বাইরে গরিব কোঙ্কনি মেয়ে বাচ্চারা মোম হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রি করবে বলে। যারা ভিতরে আসে, প্রার্থনা সেরে, মনস্কামনা পূরণের আশায় বা প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করে আলো জ্বেলে যায় ।
সঞ্চারী ভাবে অনেক লোকজন থাকে নিশ্চয়ই। না হলে এত বড় বিশাল এই জায়গাটা পরিষ্কারই বা রাখা যাবে কী করে? তবে আগে হয়তো আরও লোক থাকত। কত পুরোনো তালামারা দরজা জানালা দেখা যাচ্ছে। আবার গাইড বলেছেন নানান ফেস্টিভালে দেশ-বিদেশের মানুষ উপচে পড়ে। ফিস্টে খাওয়াদাওয়া হয়। প্রচুর লোকবল না থাকলে এসব সামলানো যাবে না।
এমনিতে তো বিশাল উঁচু হল নিঃশব্দ। পরিচ্ছন্ন। একেবারে শুরুতে তাদের গ্রুপটা যখন এসে ঢুকল লম্বা রোব পরা এক প্রৌঢ় এসে বলে গেছেন কোনও জিনিসে হাত না দিতে। সিসি টিভির ক্যামেরাও দেখা গেছে এদিক ওদিক।
সিঁড়ির নিচে আর্চ দেওয়া আছে পরপর। সেই আবছায়া ঢাকা জায়গায় সারি সারি ছোট ছোট কাঠের বন্ধ দরজা। হয়তো আগে এখানে লোক থাকত।
আস্তে আস্তে সেইখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ই সঞ্চারীর কানে এসেছিল পুরুষকণ্ঠের মাদকতা মাখানো সেই আর্ত উচ্চারণ।
“আহ! মারিয়া! লিক ইট অফ। লিক ইট অল অফফ…”
চুম্বকের মতো সঞ্চারীকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেই স্বর।
ঝিমঝিম নেশা ধরে যাচ্ছিল সঞ্চারীর। আকাঙ্ক্ষার এই সোনালি মুহূর্তের সাক্ষী হবার নিষিদ্ধ উত্তেজনায় হৃদপিণ্ড ছুটছে অশ্বগতিতে। তেতে উঠছে কান, গাল। ঘরের মধ্যে জ্বলতে থাকা মোমবাতিদানের মোমের মতোই কী যেন গলে যাচ্ছে ভিতরে।
চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা-ত্বক; সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে প্যাশনের সুরা পান করছে দুটি জ্বলন্ত শিখার মতো সত্তা।আগুনের তাপ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশের হাওয়া বাতাসে। কী যেন পিপাসার ঢেউ উঠছে ইথারের তরঙ্গে।
হঠাৎ তীব্র মধুর এই দৃশ্যটা খানখান হয়ে গেল এক ধারালো ধাতব ঝিলিকে। মূর্তির মতো সুন্দর টানটান পুরুষ পিঠের মাঝবরাবর ছিটকে এসে বিঁধে গেল তীক্ষ্ণ ধাতব কিছু। গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারা, সামনে বসা মেয়েটির ভীত আতঙ্কিত মুখের চমকে ওঠা ভয় আর তীক্ষ্ণ তীব্র আর্তনাদের মধ্যেই উলটে গেল ঘরের মোমবাতিদান। ঘর অন্ধকার। তারপর মর্মান্তিক নারীকণ্ঠের আরেকটি চিৎকার তার মৃত্যুযন্ত্রণার জানান দিল বুঝি।

পরের মুহূর্তেই আচমকা শুনশান নিস্তব্ধতার মধ্যে ফিরে এসে চমকে উঠল সঞ্চারী। নিঃশব্দ দুপুর। চার্চের প্যাসেজ চুপচাপ।
ভীষণ হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাতেই দেখল, আধবুড়ো পাদ্রী হেঁটে আসছেন একপাশের থামের কোনা থেকে। সাদাকালোয় মেশানো একগাল দাড়ি। লম্বা কালো রোব পরনে। গলায় রোজারি বিডসের পুঁতির সঙ্গে ক্রস ঝুলছে।
তিনি বললেন, “দেখতে পেলে বুঝি? ওহ অনেকেই পায়। ছেলেটার পরে মেয়েটাও একইভাবে খুন হয়েছিল। একই সঙ্গে। একেবারে এফোঁড়ওফোঁড়। পরের দিন টের পেয়েছিল সবাই। পাপ কি আর চাপা থাকে? বিয়ে না শাদি না, চার্চের মধ্যে এসে বেলেল্লাপনা। নরকেই জায়গা হওয়া উচিত এইসব ব্যভিচারীদের। তবু তো চার্চের মধ্যে মৃত্যু, তাই কবরে জায়গা দিয়েছিলেন বিশপরা…”
গলার স্বরটা ভালো লাগল না সঞ্চারীর।
বলেন কী পাদ্রী! দুটো মানুষ ভালোবাসছিল বলেই এমন হিংস্র হয়ে উঠছে এঁর গলার আওয়াজ? যিশাস না বলেছেন প্রেমের, ক্ষমার ধর্ম প্রচার করতে?
তবু এ ভদ্রলোকের পাশে পাশেই পা চালিয়ে এই সিঁড়ির তলার অন্ধকারটা থেকে বেরিয়ে যেতে চায় সঞ্চারী। পৌঁছতে চায় বাইরের আলোয় ।
চলতে চলতেই বলে, “ব্যভিচারী বলছেন কেন? ভালোবাসা কি অপরাধ?”
হাত তুলে থামিয়ে দেন ফাদার।
“থামো হে। যা জানো না তাই নিয়ে কথা বলো কেন? বলেছিল সুইসাইড। কিন্তু আসলে তো পুরনো লাইট হাউস থেকে বৌটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল ছোকরা। ওই যে লোকাল হিরো, পাওলো। একমাথা কোঁকড়া চুল, রোগা মতন সেই মেয়েটা। হ্যাঁ, খুব বদমেজাজি ছিল বটে। পাওলো অন্য কারও দিকে তাকালেও আঁচড়ে কামড়ে চেঁচিয়ে অস্থির করে ফেলত। তা অন্য কারও দিকে তাকানোই বা কেন? ঢের পয়সা দিয়েছিল মেয়েটার বাপ বিয়ের সময়। নইলে অত হাড্ডিসার মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাত না হিরো। সে পয়সা দিয়েই তো অতবড় ফার্নিচারের দোকান তৈরি হল। দোকানেও এসে বসে থাকত বউ। পাছে বর অন্য কারোর সাথে ফষ্টিনষ্টি করে। পাগল! পাগল! আরে, অমনি করে আটকানো যায় কাউকে? আর এ ছোকরা তো আজন্ম লক্কা পায়রা। চারপাশে চিরকাল মাছির মতো মেয়েমানুষ ভন ভন। তাকে সামলে রাখা কি আর ওই খ্যাংরাকাঠি পুচকে মেয়ের কম্মো? কেবল ঘ্যানঘ্যান আর চেঁচামিচি। পাড়ার লোক অবধি অস্থির হয়ে থাকত। তিতিবিরক্ত পাওলো লাইটহাউস দেখতে নিয়ে গেল বউকে এক রোববারে। ফিরে এসে বলল বারণ না শুনে পাঁচিলের ধারে উঠে ঝগড়া করছিল বউ। বলছিল পাওলো যথেষ্ট মনোযোগ দেয় না, ভালবাসে না, তাই সুইসাইড করবে। সেইসব কথা কাটাকাটির মধ্যেই হঠাৎ পা স্লিপ করে নিচে পড়ে গেছে। সকলেই জানত মেয়েটা খ্যাপাটে। নিচ থেকে বডি উদ্ধার করে আনল সবাই মিলে। ভারী কান্নাকাটি করে তাকে কবর দিয়ে হাঁফ ছাড়ল ছোকরা।”
চটপট পা চালাচ্ছিল সঞ্চারী। লম্বা লম্বা আর্চের তলার অন্ধকার যেন ফুরোচ্ছেই না, উফফ।
তবু কৌতূহল না চাপতে পেরে মুখ ফেরায়।
“কিন্তু মারল কে?”
কী বিশ্রী খিকখিকে হাসি বুড়ো পাদ্রীর।
“কেন? সিস্টার জোসেফিন? সে তো বরাবর পাওলোর জন্য ফিদা। ভেবেছিল বৌটা মরে যেতেই পাওলো বুঝতে পারবে যে একেবারে মনপ্রাণ দিয়ে তাকে পাবার জন্যই অল্টারে বসে রোজারিতে জপ করে চলেছে জোসেফিন। কিছু যিশাসের জন্য নয়। পাওলো একবার তার দিকে চোখ তুলে তাকালেই চার্চ থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে যেত। কিন্তু পাওলো ছুতোর তো কোনোদিন টেরও পায়নি সে ব্যথা। উলটে পাশের জেলেপট্টির মেয়ে মারিয়াকে এই চার্চেই ডেকে এনেছিল, গ্রামের সবার চোখ এড়িয়ে নষ্টামি করার জন্য। তার জন্যেই না খিটখিটে বৌটার গতি করেছিল আগেভাগে। চার্চের ফার্নিচার বানাতে আসত। সেই জন্যেই এই তলার ঘরটা দেওয়া হয়েছিল তো তাকে। সেখানেই শুনশান দুপুরে মারিয়াকে নিয়ে আসত বদমাশটা। মারিয়ার বর মরে গেছিল কবেই। মছছিমার ছিল তো। নৌকো নিয়ে বেরিয়ে ঝড়ে তলিয়ে গেছিল। খুচরো কাজ করে দিন কাটত মেয়েটার। তবে সুন্দরী বলে একটু বেশিই ডাক পেত এদিক ওদিক। নষ্টামির নেশায় ডুবে থেকে এরা টের পায়নি জোসেফিন সব দেখে রাখছে। সে মেয়ে চার্চে জয়েন করেছিল বাচ্চা বয়েসে। সাতটা মেয়ের সাত নম্বর। বাপের কারবার ছিল মদ চোলাই করা। মা-টা বাচ্চা বিয়োতে বিয়োতে অক্কা পেয়ে নিস্তার পেয়েছিল। বাপ রোজ রাতে মদ গিলে ফিরে মেয়েদের একেকটাকে বেল্ট দিয়ে বেদম পিটতে পিটতে ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে দরজা দিত। দশবছুরে জোসেফিনের দিকে যেদিন মাতালের চোখ পড়ল, ও মেয়ে রুটি বানানোর বেলনের ঘায়ে বাপের মাথায় আলু গজিয়ে চার্চে পালিয়ে এল একদৌড়ে। মাদার সুপিরিয়র ছিলেন দয়ার শরীর। চট করে সিস্টার বানিয়ে নেবেন বলে ডিক্লেয়ার করে দিলেন। বুঝেছিলেন, এ না হলে গুণ্ডাটার হাত থেকে রেহাই পাবে না। বছর আট-নয় দিব্যি ভিজে বেড়ালের মতো ছিল ছুকরি। মাথা নিচু করে চলাফেরা করত, যেন কাউকে তাকিয়েও দেখে না। একেবারে সন্তদের মতো হাবভাব। আহা, প্রার্থনার সময় কী চোখ উলটে ভক্তি। যেন সাক্ষাৎ এঞ্জেল। এইসময়েই পাওলোর বিয়ে ঠিক হল। বড়লোক শ্বশুর হবু জামাইকে নিয়ে চার্চে এলেন সিনিয়র বিশপ ফাদারের সঙ্গে সব ব্যবস্থা ঠিক করতে। ব্যস। হয়ে গেল সিস্টারের ধম্মকম্ম। রোজারিতে যিশাসের নামের জায়গায় পাওলোর নাম জপত, নির্ঘাত। বিয়ের দিন মন্দ দেখাচ্ছিল না বউটাকে। সাদা লেসের গাউন, লম্বা ভেইল। পয়সাওলা বাপ সারা চার্চ সাদা লিলি দিয়ে সাজিয়েছিল। মেয়ের মাথায় সাদা গোলাপের টায়রা, হাতের বোকেতে সাদা গোলাপের সঙ্গে সাদা ভেলভেটের লম্বা লম্বা ফিতের বো। মায়ের গয়নাগুলো অত রোগা শরীরে একটু ঢলঢল করছিল বটে। তবু খারাপ লাগছিল না সব মিলিয়ে। পাশে হিরোকে ভালো দেখাচ্ছিল বলাই বাহুল্য। সেই দেখেই সিস্টার ফিদা হয়ে গেছিল আর কী, হে হে।”
এত বুকভাঙা সব কষ্টের কথা এমন রসিয়ে বলছেন ভদ্রলোক, বড্ড রাগ হয়ে গেল সঞ্চারীর। একেবারে রহস্য রোমাঞ্চ গল্প বানিয়ে ফেলছেন বুড়ো। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড দ্যাখো, কী সহজে বদনাম দিচ্ছেন চার্চেরই কোনও এক মহিলার নামে।
কী রে বাবা!
বাইরের পিলারঘেরা মোমবাতি জ্বালানোর জায়গাটা দেখা যাচ্ছে একটু দূরে। সাহস পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সঞ্চারী।
ভিতরটা অস্থির লাগছে।
কতদিন আগের এ ঘটনা। তাও এমন পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে! এখনও! কীসে আটকে থাকে ছবিরা? আকাঙ্ক্ষার তীব্রতায়? অপূর্ণ কামনার টানে? শরীরের ক্ষুধায়? শরীরগুলো তো নষ্ট হয়ে গেছে কবেই। তবু এত চাওয়া থেকে যাবে!
আর এই যে খ্যাঁকখ্যাঁকে বুড়ো, ধর্মযাজক বটে, কিন্তু ধার্মিক কি? কী বিশ্রী কথা বলার ভঙ্গি। কতদিন আগে মরে গেছে বলেও মানুষগুলোর প্রতি না আছে সম্মান, না আছে সমবেদনা। জঘন্য!
“থামুন তো। কে মেরেছে সে তো দেখাই গেল না। শুধু শুধু বদনাম করছেন চার্চের কোনও মেম্বারের নামে। প্রমাণ আছে কিছু? এটা নিশ্চয় অনেক-অনেকদিন আগের ঘটনা?”
“ছিল তো প্রমাণ। ছিল বইকি। জোসেফিন নিজের মুখে কনফেশান করেছিল যে। একদিন সকালে তো চার্চের মালি পুজোর ফুল নিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল নিচের তলার ওই ঘরের দরজা খোলা। উঁকি মেরেই চিৎকার করতে করতে এসে অজ্ঞান হয়ে গেল। পরে সবাই ঘরে ঢুকে দেখল পাওলো আর মারিয়া দুজনেই মরে পড়ে আছে। পাওলোর গায়ে সুতোটি নেই। মারিয়া একখানা পাতলা উড়নি জড়ানো। দুজনেই রক্তের পুকুরে চুবে আছে। খুব ধারালো কোনও অস্ত্র দিয়ে গিঁথে দিয়েছে দুজনকেই কেউ। ইনকোয়েস্টের পর; করোনার খুব আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, প্রত্যেকটি আঘাত এত সরু অথচ গভীর, এমন ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর আর কখনও হয়নি। দেশে বা বিদেশে, এত সরু ছুরি তিনি কখনও দেখেননি। অস্ত্রটাও পাওয়া যায়নি অবশ্য। খালি এক বাটি মধু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আইনি ঝঞ্ঝাট মিটে যেতে কবর দেওয়া হল দুটোকেই। সিনিয়ররা বললেন, চার্চের মধ্যে মারা গেছে, আর দুজনেই সিঙ্গল, কাজেই এদের মাফ করে দেওয়া যায়। সেদিন সন্ধেবেলা জোসেফিন কনফেশান বক্সে এল। বলল, রোজই দরজার ফাঁক দিয়ে ওদের দেখত। এই আজ যেমন তুমি দেখছিলে। ওদিন আর সহ্য করতে পারেনি। আগের দিনই মারিয়া চাকভাঙা মধু আনবে বলে গেছিল ছোকরাকে মিচকি হেসে। মধু দিয়ে কী হবে জানতে, ওদের আসার আগেই সিস্টার ঘরের একপাশে দাঁড় করানো ভাঙা কাঠের আলমারির ভিতরে ঢুকে বসেছিল। আদরের বহর দেখে রাগে অন্ধ হয়ে আগে পাওলোকে মেরেছে, পরে অন্ধকারে মারিয়াকে। কিছুতেই আর সহ্য হয়নি ওর। কিন্তু এখন নাকি পাওলোর জন্য খুউব কষ্ট হচ্ছে। আমি ওই কনফেশানবক্সে দাঁড়িয়েই তক্ষুনি বলে দিয়েছিলাম, ঘাড় ধরে চার্চ থেকে বের করে দেব। অনেকদিন তক্কে তক্কে থেকেছি। পাওলোর বিয়ের দিন থেকেই দেখেছি, ওর নজর একেবারে আঠার মতো চিপকে আছে ছোকরার গায়ে। মাদার সুপিরিয়র যতই দয়াপরবশ হয়ে চার্চে নিয়ে নিন; কী ফ্যামিলির মাল সে তো দেখতে হবে। এদের ভিতর ধম্ম ঢোকানো হোলি মাদারেরও কম্মো নয়, হ্যাঃ! আর তখনই তো…”
তীব্র তীক্ষ্ণ কন্ঠ ক্রমশ উপরে উঠতে থাকে।
“…তখনই তো ওই ধারালো স্কুয়ারিং-এর তারটা দিয়ে কনফেশান বক্সের মধ্যেই আমাকেও এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে চলে গেল, দ্যাট কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার। অলটারের গলানো মোম, ধুপের ছাই পরিস্কার করতে ব্যবহার হয় ওই তার। শক্ত তামার তৈরি। ওইটেকেই ধার দিয়ে মারাত্মক করে তুলেছিল শয়তানী, কেউ টের পেল না। অথচ তারপর কত কত বছর চার্চের সবাই জানল ও ভারী ভক্তিমতী সন্ন্যাসিনী। চোখ নামিয়ে কেবল পুজোর কাজই করে চলে। কী সংযম, কী ভক্তি। কেউ টের পেল না। ইস, কেউ না, কেউ না। আ ব্লাসফেমি ইউ নো? আ শিয়ার ব্লাসফেমি…”
নিষ্ফল আক্রোশে উচ্চারিত শব্দের মধ্যেই একটু একটু করে মুছে যাচ্ছিলেন ক্ষমাহীন ফাদার। ক্রমশ আবছা হয়ে আসছিল তাঁর অবয়ব। ইরেজারে মোছা পেন্সিল স্কেচের মতো মুছে যাচ্ছিল হাত-পা, রোব, কাঁচাপাকা চুল-দাড়ি।
ঘণ্টার আওয়াজ আসছিল চার্চের ভিতর থেকে। সেখানে সোনায় মোড়া অল্টারের ওপরে নির্মম পেরেকবিদ্ধ যিশুর হৃদপিণ্ড থেকে কেবলই গড়িয়ে পড়ে কাঁটার মুকুটে গিঁথে থাকা যন্ত্রণা। ভালোবাসার পাপ। অনুশোচনার গলতে থাকা মোম ।
ক্রশের সাইন আঁকতে আঁকতে দৌড়ে বাইরের রোদে এসে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামতে থাকল সঞ্চারী।
“ওহ যিশাস!”

মুতো

অমিতাভ নাগ

ঘরের বাইরে থেকে খাবারের গন্ধ আসছে। মুতো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকে দরজার বাইরে। একবার গলা খাঁকরানি দেয়। সাবিত্রী শুনতে পায় না। মুতো দোনোমনা করে তারপর কড়া নাড়ে আলতো করে। জোরে কড়া নাড়লে যে আওয়াজ হবে তাতেই যেন তার লজ্জা কিংবা কুণ্ঠা। সাবিত্রী এবার অবশ্য সেই আওয়াজেই বেরিয়ে আসে– “আরে চাচা, কিতনা ওয়াক্ত আপ বাহার মে খাড়া হ্যায়। অন্দর আইয়ে। ওহ বাহার গয়ে মেঠাই লানে।” মুতো তবু ঘরের ভিতরে ঢুকতে চায় না, একটা বিড়ি ধরায় সে– “হাম বাহার ঠিক হুঁ সাবিত্রী। সুখন কো আনে দো।” সাবিত্রী মাথা নেড়ে ঘরে ঢুকে যায়।
মুতো বিড়ি টানতে টানতে উবু হয়ে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। আজ ভূত-চতুর্দশীর রাত। মাঝে মাঝেই বাজির শব্দ কানে আসছে। দিওয়ালির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে গোটা দুনিয়া। আকাশের দিকে তাকালে থেকে থেকেই দেখা যাচ্ছে আলোর রোশনাই। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার অবসর কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই অবশ্য মুতোর নেই, কোনোদিনও বিশেষ ছিলও না। সে বরাবর মাটির দিকে মুখ নামিয়ে রাখা মানুষ। একদল ছেলে হল্লা করে চলে যাচ্ছে। এদের সবাইকেই মুতো ছোটবেলা থেকে চেনে, এখন এরা সবাই লায়েক হয়েছে। একটা চকোলেট বোম ফাটল একটু দূরে। ছেলেগুলো পরেরটা ছুঁড়ে দেয় তার দিকেই। লাফিয়ে সরে যায় মুতো। “শালা মুতো, শালা বুড়ো গান্ডু,” জোরে হাসতে থাকে ছেলেগুলো। “তোদের বাপের বিয়ে দেখেছি রে আমি, শালা কুত্তার বাচ্চা সব।” গজগজ করতে থাকে সে। জোরে বলতে সাহস হয় না। বলা তো যায় না, যদি ছেলেগুলো শুনে ফেলে কিছু কাণ্ড ঘটায়।

“বাবু, এ আমার দ্বারভাঙার লোক আছে। খুব বিশ্বাস করতে পারবেন বাবু। মাথায় একটু খাটো তবে মিছে কথা বলে না বাবু। ওই ছোটবেলায় মাথায় ইটের বস্তা পড়ে গিয়ে এমন বোকা হয়ে গেছে বাবু, বিদ্যে-বুদ্ধিও কিসসু হয়নি আর তার পর থেকে। যা বলবেন সব কাজ করে দেবে বাবু।” মুনিসিপালের বাবুকে সে কথাই বলেছিল রামবিলাস, লখনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে। লখনের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো ছিল, মুনিসিপালবাবু বাড়িতে চাকরের কাজে নিয়ে নিলেন সেই ইস্তক– “থাকা খাওয়া আর খোরাকি পাবি আপাতত, পরে দেখব কী করা যায়।” ব্যাস, লখন কলকাতায় থেকে গেল।
রামবিলাস পোড়-খাওয়া ধোপা। সে জানে কলকাতায় একবার কোনও কাজে জুতে যেতে পারলে টিকে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। লখনের মা খুব ধরেছিল রামবিলাসকে– “রাম, তুয়ার ভাইয়াটাকে দেখস নাই তু। কলকত্তা লে কে যা বাবুয়া।” গ্রামে থেকে যে কিছু হবে না সেটা লখনের মা বিলক্ষণ জানত। এমনিতেও ছেলে গোঁয়ার-গোবিন্দ, তা সত্ত্বেও লখনের বিয়েও দিয়েছিল সে, মোটা পণও নিয়েছিল চাচার জমি দেখিয়ে। ভালোই চলছিল লখনের মা-র। ছেলে পুরো বাওরা। তাতে কী? ছেলে তো! তাকে দিয়েই তুলসী গাছের পাশে একটা ঘর তুলিয়ে ছিল লখনের মা।
চিরকাল তুলসী গাছে সন্ধের পর জল দিত লখনের মা। বিয়ের পর লখনের বউ শিবিও শুরু করেছিল জল দেওয়া। একদিন অমন সন্ধের সময় শিবি সবে মাথায় ঘোমটা টেনে জল দিতে নিচু হয়েছে আর তখনই ‘হেই নাগিন’ বলে কোত্থেকে ছুটে আসে লখন। রামবিলাসের সঙ্গে ধোপাপল্লীতে কাপড় কাচার জন্য যে কাঠের ধোকা, সেটা ছিল হাতে। এক বাড়িতেই শিবি ‘মাঈ রে’ বলে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। আওয়াজে লখনের মা বেরিয়ে এসে আঁতকে ওঠে, লখন বারবার বলতে থাকে তুলসী গাছের সামনে শিবি ছিলই না, একটা বিশাল কেউটে দেখেই সে ধোকার বাড়ি মারে– “হাম নাগিন কো হি দেখা সচ মে। হামে ক্যায়সে পাতা বহু কাহাসে ঘুস গায়ি।” লখনের মা এসব বিশ্বাস করে না, ছেলের মাথার ব্যামো আছে তাই চুপ করে যেতে চায়। কিন্তু গাঁ-গঞ্জে কথা চাপা থাকে না, শিবির বাবা এক হপ্তার মধ্যে এসে শিবিকে নিয়ে চলে যায়। পঞ্চায়েতে কথা তুলবে, সে শাসানিও দিয়ে যায়। এরপরেই লখনের মা রামবিলাসকে জোরাজোরি শুরু করে লখনকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। ছেলেকে সে কোনোদিনও বাগে আনতে পারেনি। ভেবেছিল বিয়ে দিলে মতি ফিরবে, তাও হল না, এর জন্য অবশ্য সে বহুকেই দোষ দেবে– এ কেমন মেয়েমানুষ যে পুরুষকে বশ করতে পারে না!
রামবিলাসের সঙ্গে লখন সেই যে চলে এল কলকত্তা, সেই থেকেই লখনের জীবন পালটে গেল। মা-কে লখনের কোনোদিন ভালো লাগত না, তাকে খুব খাটাত মা। বাবুজিকেই ভালোবাসত সে, তো বাবুজিও নাগিনের কামড়ে নিধন হয়ে গেল সেই কোন ছোটবেলায়। শিবির মুখটাও লখনের আর ভালো মনে পড়ত না– শুধু মনে ছিল ওর একজোড়া মোটা কালো ভুরু আর নাগিনের মত লম্বা বেণী। সেটা বললে শিবি খুব হাসত হিসহিস করে, আর লখন বহুকে আরও ভয় পেতে থাকত ক্রমশ। শিবির চোখগুলো অসম্ভব কালো ছিল, চকচক করত নাগিনের পিঠের মতো– লখন ভয় পেলেই শিবি জোর করে ওর মাথাটা নিজের বুকের ওপর টানত। লখন আড়ষ্ট হয়ে শিবির বুকের ধকধক শব্দ শুনত, রেললাইনে কান পেতে দূর থেকে ছুটে আসা রেলগাড়ির আওয়াজের মতো।
কলকত্তায় প্রথম প্রথম হাঁপিয়ে উঠেছিল লখন। রাস্তা পার হতেই ঘাম ছুটে যেত তার। তার ওপর ভাষাটাও ঠিকঠাক বুঝতে পারত না। এভাবে প্রায় চল্লিশটা বচ্ছর পার হয়ে গেল। লখন রয়ে গেল কলকাতায়। মা মরে যাওয়ার পর এক রাতের জন্য গেসল দেশে। চাচা সব জমিজিরেত নিজের নাম লিখিয়ে নিল– “তু তো আর আসবি নাই লখন, সারে জমিন হামে হি দেখনা পড়েগা।” শিবির সঙ্গে আর কোনোদিন দেখাই হল না লখনের। মা মরে যাওয়ার পর রামবিলাস বলেছিল অনেক করে– “উসকো পাতা হোনা চাহিয়ে। শাশুমা হ্যায় না!” লখন গা করেনি কিছু। কী লাভ এসব করে? এদ্দিন পর। তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে রাতের দিকে শিবিকে মনে পড়ত না যে তা নয়।
মুনিসিপালবাবুর বাড়িতে চাকরের কাজটা লখন ভালোবেসে করেছিল অনেক বছর। মুনিসিপালবাবুর বিধবা মা লখনকে ভালোও বাসতেন। ফাইফরমাস খাটতে পারে ছেলেটা, প্রতিদিন কোলে তুলে ছাদে নিয়ে বসিয়ে দিত, নামিয়ে আনত। তারপর তিনি চোখ বুজতে মুনিসিপালবাবুর বাড়িতে তার থাকা মুশকিল হয়ে গেল। শেষমেষ অনেক ধরাধরি করে একটা চাকরি পেয়ে গেল সে। বড় রাস্তার মোড়ে একটা নতুন শৌচালয় তৈরি হয়েছিল সে সময়। সেখানেই সারাদিন বসে থাকার চাকরি পেল লখন। ওর ভেতরেই একটা ঘুপছি ঘর মতো– তাতেই একটা বিছানা মতো করে থাকা, জল, পেচ্ছাব-পায়খানা, মায় চানেরও চিন্তা নেই, খাবার কিছুদিন এদিক ওদিক করে শেষে ওই একধারে একটা পায়খানার ঘরের বাইরে উনুন জ্বালিয়ে ভাত ফুটিয়ে নেওয়া। এতে তার কোনও অসুবিধা হয় না। প্রথম প্রথম পেচ্ছাবের গন্ধ নাকে আস্ত খুউব। বমি হয়েছিল একবার রান্না করতে করতে। এখন অভ্যেস। রাতে গ্রিলটা টেনে দিয়ে ঘুমিয়ে নেয় সে। কখনও সখনও দূরপাল্লার কোনও গাড়িতে মেয়েমানুষ থাকলে গ্রিলে খটখটি হয়, ছেলেরা তো বাইরে সেরে নয়, পায়খানা পেলে আলাদা কথা। ঝামেলা-ঝনঝাট যে হয় না তা নয়। সেবার ভোটের পর কোত্থেকে দুটো ছেলেকে ধরাধরি করে নিয়ে এল– কী রক্ত, তাদের জলের তলায় রক্ত ধুইয়ে দিতে থাকল দলের লোক। আরেকবার কাদা ফুটবল খেলে পাড়ার বিচ্ছুগুলো সেই ঢুকবেই– বিশাল ঝামেলা লখনের সঙ্গে। বকেঝকে শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগিয়ে দেয় সে। আরেকবার তাদেরই একজন পরে রাত বারোটার সময় একটা মেয়ে নিয়ে ঢুকতে দেওয়া নিয়েও ঝামেলা করল। সে প্রায় হাতাহাতি। চানের ঘরটা খুলে দিতে হবে এই নিয়ে শাসানি প্রায়। লখন গ্রিলে তালা দিয়ে দেয়– কিছুতেই ঢুকতে দেয় না কাউকে। পরের দিনই মুনিসিপালবাবুর কাছে গিয়ে “বাবু, ইতনা মুসিবত। পিসাবখানাকে তো লোকে পিসাবের বদলি অন্য কামে লাগাতে চায়।” মুনিসিপাল বাবু রেগে যান– “তোকে তো কাজ পাইয়ে দিয়েও স্বস্তি নেই দেখছি। তুই সামলা নিজে, আমার কাছে আসিস না।” রামবিলাসও বলে, “গুসসা মত কিয়া কর লখন। নোকরি জায়েগি তো ক্যায়া করেগা তু, ইয়ে শোচ।”
লখন কিছু বলে না এর পর থেকে। নিজে নিজেই উপায় কিছু বার করে নিতে হবে, সেটা বুঝে যায়।

সুখন হাতে একটা ঠোঙা নিয়ে আসে, মুতোকে দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে– “আরে চাচা, আপ বাহার কিঁউ?” “তেরে লিয়েই ইধার খাড়া হুঁ রে, চল অন্দর।” ঠেকুয়ার ঠোঙাটা সাবিত্রীর হাতে দেয় সুখন– “লিট্টি তৈয়ার হুয়া?” সাবিত্রী মাথা নাড়ে– “চাচা আপ বিস্তর পর হি বৈঠিয়ে।” সাবিত্রীর কাঁচা বয়স, সবে বিয়ে হয়ে কলকত্তা এসেছে, বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে সে, “তো ক্যায়সে হুয়া ইয়ে সব চাচা? পয়দা আপ কে সামনে হুয়া? ক্যায়া শরম,” খিল খিল করে হাসে সে। “তু চুপ যা বহু,” সুখন মাঝে মাঝেই বুজুর্গ লোকদের সামনে সাবিত্রীকে নিয়ে বিপদে পড়ে। কখন যে কাকে কী বলে তার ঠিক নেই কোনও! “আরে নাহি রে, এইসে ক্যায়সে হোগা,” মুতো বলে।
দিন সাতেক আগের ঘটনা। রাত ওই দশটা নাগাদ, মুতো তখন গ্রিলটা টেনে দেবে ভাবছে, হঠাৎ একটা বোঁচকা নিয়ে একটা মেয়ে “আমার একটু সময় লাগবে” বলে ঢুকে পড়ে একটা খোপে। মুতো এই সময়টায় একটু নেশা করে– সুখন বা রামবিলাস কেউ না কেউ জুটেই যায় রোজ। সেদিনও তিনজনে তারা বাইরে শৌচালয়ের একটু পাশে বসে খুরিতে করে অল্প অল্প চুমুক দিচ্ছে, রামবিলাস এবার দেশে যাবে দিওয়ালিতে– তার গল্প হচ্ছে। রামবিলাসের মেয়ের বয়স হয়েছে, বিহা দিতে হবে, বহু ডেকে পাঠিয়েছে। পণের টাকা কীভাবে যোগাড় হবে সেই চিন্তায় তিনজন মশগুল– “আরে, ওহ মাইয়া বিমার হ্যায় ক্যায়া?” সুখন বলে ওঠে। মুতো ফিরে দেখে সেই মেয়েটা কোনোরকমে পা টেনে টেনে যাচ্ছে রাস্তা পেরিয়ে। “আরে ক্যায়া কার রহি ও?” রামবিলাস চেঁচিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই ঘ্যাঁচ করে ট্রাকটা ব্রেক কষে থেমে যায় হাত পাঁচেক দূরে। মেয়েটাকে চাকায় টেনে নিয়ে যায়। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে লোকগুলো ছিল কেউ চায়ের দোকানে বা কেউ বাস স্ট্যান্ডে তাদের কেউ কেউ ছুটে এল। এমন ঘটনা হামেশাই ঘটে রাতের দিকে, সেদিকে বেশি সময় দেওয়ার সময় কারও নেই। সুখন উঠে দেখে আসে– “মার গয়ি বেচারি। চাচা অন্দর যাও, পুলিশ অনেওয়ালা হ্যায়।” পুলিশ এলে ঝামেলা অনেক– মুতো তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ে নিজের কোটরে। আর তখনই হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ– খুব মিহি। মুতো প্রথমে ভাবে নিশ্চই ভুল শুনেছে কিছু। না, আবার শোনা যাচ্ছে। এবার একটু জোরে। বিল্লি হবে, মুতো ভাবে। “শালা কাল সুবহে কচরা সাফ করতে হবে।” গজগজ করে মাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে সে। কিন্তু রাস্তার আওয়াজ কমে এলে কান্নার শব্দটা বাড়তে থাকে। উঠতেই হয় মুতোকে– আওয়াজটা আসছে ওই খোপটা থেকে যেখানে এই মেয়েটা ঢুকেছিল, মুতো উঁকি মারে ভেতরে। মাথাটা বোঁ করে ঘুরে যায় তার। অল্প আলোতেও সে দেখতে পায় একটা মানুষের বাচ্চা প্যানের পাশে শুয়ে আছে, হাত পা ছুঁড়ছে আর কাঁদছে। গলার জোরটা একনাগাড়ে কেঁদে কেঁদে আর খিদেতেই বোধহয় ক্রমশ কমে আসছে। মুতো ঝটতি নিচু হয়ে তুলে নেয়। রক্তে মাখামাখি, বাচ্চাটা, মেয়ে। বুকে আঁকড়ে বেরিয়ে আসে সে। রাস্তার মোড়ে একটা পুলিশের গাড়ি আর একটা অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। ট্রাকটা পালিয়ে গেছে, পুলিশের কোনও কাজ নেই লাশ মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া, তাছাড়া এমনিতেই এই শীত পড়ার ঠিক আগে আগে একটা হিমেল নিস্তেজ আবহাওয়া। মুতো সোজা চলে যায় পুলিশের ভ্যানটার দিকে। “স্যার, ওই মেয়েটা আমার ওই পিসাবখানায় এই বাচ্চিটা পয়দা করেছে।” পুলিশ কনস্টেবলটি সবে আরাম করে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল, ঘুরে দেখে তার মাথায় রাগ চড়ে গেল– “শালা গান্ডু , রাত বিরেতে মাজাকি করছিস?” তারপর ঝুঁকে পড়ে– “তুই এই বাচ্চাটা পেলি কোত্থেকে? তুলে নিয়ে এসেছিস নাকি? জেলে ভরে দেব বানচোত।” মুতো ঘাবড়ে যায়– “না হুজুর, এই মাইয়াটা যেটা কাটা পড়ল ওটা এইমাত্র বিইয়েছে এটা, হামলোগ বাহার রাস্তে মে থা হুজুর, হামকো কুছু পাতা নাহি, সাচ বোলা হুজুর।” চায়ের দোকানি, যার কাছ থেকে টহলদারী পুলিশ বিনি পয়সায় চা-সিগারেট পায়, সে-ও বলে, “ও সাদা আদমী স্যার। বিহারি। ওই টয়লেটটার কেয়ারটেকার। ও সত্যি এতক্ষণ বাইরেই ছিল স্যার।” পুলিশ কিছুক্ষণ ভাবে– “নে চল থানায়, বেওয়ারিশ বাচ্চা নিয়েছিস, থানায় তো যেতেই হবে।”
অনেক কাকুতি মিনতি করেও সে রাতে থানায় যেতে হয় মুতোকে। বাচ্চাটাকে নিয়ে পুলিশ কী করল আর জানতে পারে না সে। রাতে থানায় দুটো বিস্কুট দিয়েছিল খেতে। মুতোর একটুও ঘুম হয়নি রাতে। পরেরদিন সকালে বড়বাবুর কাছে কান্নাকাটি করে ছাড়া পেতে পেতে দুপুর গড়িয়ে গেল। বেরিয়ে এসে একটা বিড়ি ধরায় সে। “আচ্ছা, আমি জার্নালিস্ট। আমি একটা কেসের ব্যাপারে থানায় এসে তোমার কথাটা শুনছিলাম।” মুতো ঘুরে দেখে একটা মেয়ে– ছোট চুল, চোখে চশমা, প্যান্ট-শার্ট পরা, মাথায় টুপি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সে– “আরে আমি টিভি-র লোক, মেয়ে দেখোনি নাকি, আজব মাইরি।” মেয়েটা বুঝিয়ে দিতে চায়। “হামি বেকসুর আছি দিদি।” বলেই মুতো জোরে জোরে পা চালাতে থাকে। পাছে মেয়েটা আবার ধরে, প্রায় ছুটতে থাকে সে। এক নিঃশ্বাসে এসে রামবিলাসের বাড়িতে ঢোকে, রামবিলাস সব শুনে, পিঠ চাপড়ে দেয়– “মর্দ মাফিক কাম কিয়া তু লখন।” দুজনে ছাতু খেয়ে মুতো আরাম করতে যায় নিজের ডেরায়। বিকেলে খবর পেয়ে সুখন আসে– “চাচা, ক্যা সব সুনা, খবর ক্যায়া হ্যায়?” মুতো বেরিয়ে দেখে সেই মেয়েটা, এখন সঙ্গে আরেকটা ছেলে তার হাতে ইয়া বড় একটা ক্যামেরা। মেয়েটা হাতে একটা মাইক নিয়ে এগিয়ে আসে– “এখন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, তিনি এক মহান মানুষ, আপনার নামটা একটু বলুন।” মুতো ঘাবড়ে গিয়ে এদিকে ওদিক তাকায় ।
“ওদিকে না আপনি ওই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকবেন আর যা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দেবেন।” মুতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। সুখনও একটু ঘাবড়েই যায় পুরো ব্যাপারটায়।
“বলুন আপনার নাম,” মেয়েটা তাড়া দেয়।
“আজ্ঞে লখন,” বলে ওঠে মুতো।
“আরে মুতো, মুতো,” পেছন থেকে পাড়ার ছেলেগুলো বলে ওঠে। কখন যে ওরা এসে জুটেছে, মুতো টের পায়নি। “মুতখানার মুতো।” একটা হাসির হররা ওঠে। মাইক হাতে মেয়েটাও হেসে ওঠে। খবর পেয়ে মুনিসিপালবাবুও চলে আসেন, মুতোর কাঁধে হাত রাখেন– “ওকে আমি-ই বিহার থেকে নিয়ে আসি। ছোটবেলা থেকেই ওর ভেতর একটা হনেস্টি দেখেছিলাম। আর তার সঙ্গে হৃদয়টাও খুবই বড়।” মুনিসিপালবাবু বলেই চলেন, মুতোর কানে কিছুই ঢোকে না। সে দেখে তার সামনে ভিড় বেড়েই চলেছে। কত মানুষ, সবাই ক্যামেরার সামনে এসে কিছু বলতে চাইছে। ধাক্কাধাক্কি হওয়ার অবস্থা, মেয়েটি বলে, “এই যে বাচ্চাটার প্রাণ বাঁচালেন কাল। কী মনে হচ্ছে? আপনার এই চ্যারিটির পিছনে মূল ইনস্পিরেশন কী?” মুতো কী বলবে বুঝে ওঠে না। মুনিসিপালবাবু এখন পুরো ক্যামেরা ক্যাপচার করে নিয়েছেন, মুতো আস্তে করে পিছিয়ে হল্লা থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, কেউ একটা আবার ঠেলে এগিয়ে দেয় তাকে।

“আমি অত কিছু ভাবিনি স্যার। আমার নিদ আসছিল না বাচ্চিটার রোনায়।”
এর পরেও অনেকক্ষণ ধরে চলে এই প্রশ্নোত্তর সেশন, যতক্ষণ না মুতো একজন মহান মন-রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। পাড়ার ছেলেরা তার সততার উদাহরণ দিতে থাকে, তারাও যেন এই প্রথম মুতোকে অন্য চোখে দেখতে থাকে।

8

সাবিত্রীর রুটি বানানো হয়ে গেছে। “আইয়ে চাচা। আপ তো টিভি স্টার বান গায়ে।” সাবিত্রী আবার হাসতে শুরু করে। “আরে চুপ রহ,” সুখন ঝাপটে ওঠে, ভাবে চাচা কী ভাববে। মুতো কখনও অন্য কারও বাড়িতে খায় না সাধারণত, নিজের ডেরাতে পেচ্ছাবের গন্ধমাখা খাবার বানিয়ে খেতেই তার অভ্যেস। সে খেয়াল করেছে সেদিনের সেই টিভি-র ঘটনার পর তার ইজ্জত বেড়ে গেছে পাড়ায়। লোকাল কাউন্সিলরও এসেছিলেন পরের দিন, মহিলা, সিরিয়ালে পার্ট করে শুনেছিল সে। নাকে রুমাল চেপে “আপনি এমন একটা মহান কাজ করেছেন, আমরা এলাকাবাসীরা সবাই গর্বিত। পার্টি আপনার সঙ্গে আছে। আমরা সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজে মানুষের পাশে থেকেছি, থাকব।” পরক্ষণেই “উফ কী গন্ধ এখানে” বলে কেটে পড়েন তিনি, তাঁর চ্যালারা একটা মালা দিয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন লোক দেখা করেছে, “তেরা নসিব খুল গয়া রে লখন, হামকো ভুল না জানা,” বলেছিল রামবিলাস।
“সুখন, তু মুঝে খানা মেরা ঘর ভেজ দে।” লখন বলে। সুখন অবাক হয়, চাচা কোনও কারণে রেগে গেল নাকি? “গুসসা হুয়া চাচা?” সুখন জিজ্ঞেস করে রাগ-রাগ মুখে তাকায় সাবিত্রীর দিকে। সাবিত্রী ভয় পায় এই বুঝি আবার বকা খেতে হয়। “নাহি রে, মেরা ডেরা হি আচ্ছা রহেগা।” সুখন চুপ করে থাকে।
“আরে, ঘাবড়া মত, মেরা ও বদবু পে নাশা হো গায়া।” লখন বলে, “ওহ হি মেরা আসলি জাগা হ্যায়, সমঝা কি নাহি?”
“নাহি চাচা,” সুখন বলে।
“আরে মেরা নাম মালুম নাহি তুঝে? ওহ ছোকরে লোগ হামে ক্যা বলে পুকারতে হ্যায়।” হা হা করে হেসে ওঠে লখন– “আরে মেরা নাম হ্যায় মুতো, মুত কা বদবু বিনা মুঝে খানা আচ্ছা নাহি লাগতা রে।”
মুতো ওরফে লখন, বিহারী, দ্বারভাঙার লখন যাদব নিভন্ত ভূতচতুর্দশীর রাতে হাহা করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। ল্যাম্পপোস্টের আলো ওপর থেকে ধরতে থাকে তাকে আর সে অতিক্রম করতে থাকে সুদূর নীহারিকা। কলকাতা শহর ঘুমিয়ে থাকে– দীপাবলী আসছে, আলোর উত্সব।