বেহুলা আর সরল বেদের গল্প

শ্রীময়ী চক্রবর্ত্তী

বেহুলার যখন বিয়ে হল, তখন তার বয়স বড়জোর ছয় বা সাত। ভালো করে মনেই পড়ে না ছাই… যেন পুতুল খেলার বিয়ে। সবই কেমন আবছা আবছা। ঘুম পাচ্ছিল বেজায়, খিদেতে পেটে পাক দিতে দিতে কখন যেন খিদে তেষ্টা বোধটুকু অব্দি চলে গিয়েছিল। পাশ থেকে কাকিমা ঠেলা মেরে মেরে সজাগ করার চেষ্টা করছিল আর বেহুলা একবার কাকিমার ঘাড়ে একবার পাশে বসা বরের ঘাড়ে ঢলে ঢলে পড়ছিল। সেদিন একদম লজ্জা-টজ্জা করছিল না তার। আজ তেরো বছরের সদ্য ঋতুমতী বেহুলার সে কথা ভাবতেও গালে গোলাপের ছোপ লাগে। আজ সে তো আর বাচ্চাটি নেই, দিদি-বউদিরা কানে কানে বেশ প্রাঞ্জলভাবে তাকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটুকু বুঝিয়ে দিয়েছে। গতবার শ্বশুরবাড়িতে ফুলশয্যার দিন অনেক রাতে ঘুমন্ত ছেলের বউকে দাসীর কোলে কোলে পালঙ্কে শুইয়ে দিয়ে গিয়েছিল লখিন্দরের মা সনকা, তার শাশুড়ি মা। দেখো দেখি, ছি ছি! স্বামীর নাম মুখে আনল বেহুলা। পরক্ষণেই ফিক করে হেসে ফেলল সে।
নাহ, মনে মনে নাম নিলে দোষ লাগে না। বেশ করবে নাম নেবে সে।
“লখিন্দর, লখিন্দর, লখিন্দর কই কিছু হল? মা-ঠাকুমার সবটাতেই বড় বাড়াবাড়ি।”
তার শ্বশুরবাড়িতে কী যেন একটা অভিশাপ আছে। তার ছয় ভাসুরই সন্তানহীন অবস্থায় স্বর্গে গেছেন, সবাইকে নাকি সাপে কেটেছিল। বেঁচে আছে শুধু শিবরাত্রির সলতে তার স্বামী। ঠাকুমা তো কথায় কথায় বলেন, “তোর শ্বশুরের সপ্তডিঙা দেশ-বিদেশে কারবার আর তোদের বাপের মুদিখানার দোকান। যদিও চাঁদ সদাগরের অবস্থা এখন অনেক পড়ে গেছে, তবু এ ঘরের বর কি তোর পাওয়ার কথা? নেহাত তোর কুষ্ঠিতে স্বামীর অমৃত যোগ আছে, শাঁখা সিঁদুর তোর অক্ষয় হবে, তাই বিনি পণে এমন রাজপুত্তুর জামাই পেলাম।”
একটানা বকে যায় বুড়ি।
তাই বলে কি সাবধানতার ঘাটতি ছিল? সারাবছর তাকে দিয়ে স্বামীর কল্যাণে বারো ব্রত করাত ঠাকুমা। পুজোআচ্চা লক্ষণ-অলক্ষণের জ্ঞান এই ক-বছরে টনটনে হয়েছে কিশোরী বধূটির।
পালকিতে করে ঘরবসত করতে যাওয়া বেহুলা কত কথাই না ভাবছিল। সিঁথিমূল থেকে সিঁদুর নাকে ঝরে পড়েছে, ফর্সা মুখে পাতলা ঠোঁট দুটি পানের রসে লাল, চোখের কোণের শুকনো জলের দাগ, পালকির ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের রশ্মি কানের দুলে প্রতিফলিত হয়ে মাথার পেছনে আলোর বলয় সৃষ্টি করেছে। ঠাকুমা প্রাণ ভরে কাঁদতে অব্দি দিল না, তাতে নাকি স্বামীর অকল্যাণ হবে। শ্বশুরবাড়ি আর কি তাকে কোনোদিন গরিব বাপের বাড়ি আসতে দেবে? আর কি সে তার পোষা মেনিটাকে আদর করতে পারবে? আবার চোখ উপচিয়ে জল আসে বেহুলার। রেশমি শাড়িটায় ছাই চোখের জল অবদি মোছে না। সত্যি সত্যি অভিশাপ কিছু আছে নাকি? ভয়-ভয় করতে থাকে তার।
বেহুলার যখন বিয়ে হয়, তখনই তার দুই ভাসুর মারা গেছেন। এই কয় বছরে মারা গেছেন আরও চারজন। তার শ্বশুর নাকি কবে গর্ভবতী সর্পিনীকে লাঠির ঘায়ে মেরে ফেলেছিলেন, তারপর থেকে বংশে অভিশাপ লেগেছে। বাকি আছে শুধু আঠারো বছরের লখিন্দর। কী আশ্চর্য সব ক-টি মৃত্যুই সর্পদংশনের কারণে। পরিবারে যেন মড়ক লেগেছে। বেঁচে আছেন কেবল প্রৌঢ় চাঁদ সদাগর, তাঁর স্ত্রী সনকা, বেহুলার স্বামী লখিন্দর, ছয় ছেলের ছয় বিধবা বধূ, চাঁদ সদাগরের একমাত্র কন্যা চিত্রা, ঘরজামাই স্বামী গদাধর এবং তাদের দুই পুত্র জয় এবং বিজয়। জয় বিজয়ের জন্য বাড়িতে তবু যেটুকু শব্দ আলো হাসি। তা নইলে এ যেন মৃত্যুপুরী, দরজার আনাচেকানাচে ঘাপটি মেরে আছে মরণ। কাজের লোকও খুব বেশি নেই অন্দরমহলে, সনকার খাসদাসী পটলের মা এবং চিত্রার খাসদাসী মুখি। বাকি কাজ ছয় বিধবা বউতে ভাগাভাগি করে করে। আঁকাড়া গতর নিয়ে পতিপুত্রহীনা নারী করেই বা কী?
বেহুলার পালকি এসে অন্দরমহলের উঠোনে দাঁড়াল। বেহারারা চলে যেতে মাত্র দুটি নারী এল তাকে বরণ করে ঘরে তুলতে, চাঁদ সদাগরের অন্দরমহলের আব্রু বড় কড়া। বাড়িতে মাত্র দুটি এয়ো— সনকা আর চিত্রা, পাড়ার কোনও সধবা মহিলা তাদের বাড়ির কাজকর্মে আর পা রাখেন না অভিশাপের ছোঁয়াচ লাগার ভয়ে। বেহুলা পালকি থেকে নামার সময় তার ডান চোখ নেচে উঠল। অমঙ্গলের ভয়ে শিউরে ওঠে বালিকা।
প্রথম ক-টা দিন কেটে গেল, পাঁজি পুঁথি দেখে, বেহুলার গর্ভাধানের সময় বিচার করে, নিশ্চিত পুত্রসন্তানলাভের সময় গুণে বেহুলা লখিন্দরের বাসর সাজাতে। বেশ উঁচু শুকনো জায়গায় ঘর। ঘরে দরজা ভিন্ন কোনও ছিদ্রপথ নেই। ঘরে বেশ গরম, তবু কোনও উপায় নেই। বিধবা জায়েরা বাসরঘরে গেলে অকল্যাণ হবে, শাশুড়িকে ছেলের বাসরে যেতে নেই, তাই বেহুলার ননদ চিত্রা আর তার দাসী মুখি বেহুলাকে শোয়ার ঘরে পৌঁছে দিতে এল। ঘরে তখনও লখিন্দর আসেনি, বেহুলাকে পালঙ্কে বসিয়ে দু-চারটে দরকারি কর্তব্যের কথা বুঝিয়ে দিয়ে দরজা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল চিত্রা আর মুখি। বেহুলার মনে হল মুখি যেন লখিন্দরের বালিশটা গুছিয়ে দিতে একটু বেশি সময় লাগাচ্ছে। যাই হোক, বেহুলা একা বসে বসে এই ক-দিনে নাপতিনী বউয়ের শিক্ষা পুরুষকে আকর্ষণ করার ছলাকলা মনে মনে তোলাপড়া করছিল, ঘরে লখিন্দর এসে ঢুকল। বেহুলার লজ্জায় ভয়ে পেটের কাছটা কেমন করছিল, তবু সে সাহস করে লখিন্দরকে হাত ধরে খাটে বসিয়ে ঘরের কোণে রাখা বাটা থেকে পান সাজতে বসল। পুত্রজন্মের দায়িত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে লখিন্দরকেও বিলক্ষণ শিক্ষা দিয়ে বাসরঘরে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখন তারও বুক ধড়ফড় করছে। তবু লখিন্দর সহজ হওয়ার জন্য বালিশে হেলান দিয়ে বসল। তার একটা হাত বুঝি বালিশের তলায় ঢুকে গিয়েছিল। হঠাৎ হাতে তীব্র জ্বালায় ছটফট করে উঠল সে। মুহূর্তে হাত সরিয়ে এনে দেখল হাতে সাপে কাটার দুটি রক্ত বিন্দু ক্রমশ পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। বেহুলা চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
ঘরের ঠিক বাইরেই বোধ হয় চিত্রা আর মুখি অপেক্ষা করছিল। তারা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে এল। ক্রমে ঘর ভরে গেল। কবিরাজ এলেন, নাড়ি ধরে ধ্যানস্থ হলেন। সবাই চুপ। ঘরে একটা সুচ পড়লে বুঝি শোনা যাবে। চিত্রা লক্ষ করল, ঘরের এক কোণে বেহুলা বসে আছে। একদৃষ্টে মুখিকে দেখছে বেহুলা, তার চোখে সন্দেহ আর অবিশ্বাস। চিত্রা একটা পিতলের ঘটিতে জল নিয়ে ভাইয়ের বউয়ের দিকে এগিয়ে গেল। বেহুলার বুক অব্দি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ঢকঢকিয়ে প্রায় আধঘটি জল খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল ঘরের কোণে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছে নতুন বউ। তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না। অনেকক্ষণ বাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন কবিরাজ। নাহ, আজ তাঁর ধন্বন্তরি অষুধও বুঝি ব্যর্থ হল। দীনু ওঝা এগিয়ে এসে অনেকক্ষণ কী সব ঝাড়ফুঁক করল। এমনকী কালসাপটাকে ধরে ক্ষিপ্ত আত্মীয়দের হাতে তুলে দিল সে। কিন্তু শেষ অবধি হাল ছেড়ে চাঁদ সদাগরের দিকে তাকিয়ে বলল, “সবই অদিষ্টের লিখন গো কত্তা, অভিশাপ কি কেউ খণ্ডাতে পারে?”
অন্দরমহলে কান্নার রোল উঠল। মহাশক্তিশালী চাঁদ সদাগর পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন। সনকা থেকে থেকে মূর্ছা যাচ্ছেন। লখিন্দরের অন্ত্যেষ্টির দায়িত্ব পড়ল গদাধর আর চিত্রার ওপর। সাপে কাটা মরার দাহ হয় না। লখিন্দরকে তার দাদাদের মতো কলার ভেলায় করতোয়া নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। চিত্রা পাড়া ঝেঁটিয়ে আসা স্ত্রীলোকেদের বলল, বেহুলা জ্ঞান হারানোর আগে তাকে জানিয়েছে সে স্বামীর সঙ্গে কলার ভেলায় স্বর্গে যেতে চায়… স্বর্গের দেবতাদের পায়ে ধরে সে স্বামীর আয়ু ফিরিয়ে নেবে। কে-ই বা একথায় ‘না’ করবে। সনকার পুত্রশোকে পাগলিনীপ্রায় দশা, চাঁদ সদাগর ঘরে খিল দিয়েছেন। জীবন্ত বেহুলার সশরীরে স্বর্গে যাওয়া দেখতে গ্রামের লোক ঘাটে ভেঙে পড়ল। এও তো একপ্রকার সতী হওয়াই বটে। বেহুলার শরীরভর্তি গয়না সব খুলে নিল চিত্রা। শুধু এয়োতের চিহ্ন আর নাকে সোনার নাকছাবিটুকু রেখে দিল। নইলে লোকের চোখ টাটাবে। সতীর মাথা ভরে সিঁদুর দিল মেয়েরা। তারপর প্রথম বর্ষার মেঘভাঙা রোদ গায়ে মেখে ফুলে ফুলে সাজানো কলার ভেলা ভেসে চলল স্বর্গের পথে। ভেলায় পাশাপাশি শুয়ে আছে এক জীবন্ত জ্ঞানহীন তরুণী আর এক মৃত তরুণ।

গভীর রাতে বেহুলার জ্ঞান ফিরলো। চোখ খুলেই চাঁদের উপর দিয়ে মেঘ ভেসে যেতে দেখল সে। তার মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে! খানিকক্ষণ আবার চোখ বুজে শুয়ে থাকতে গিয়ে মাদকের প্রভাবে চোখ জুড়ে ঘুম এল তার। এবার যখন ঘুম ভাঙল, আকাশে তখন আলো ফুটি ফুটি করছে। এবার বেহুলা চোখ বুজেই অনুভব করল বিছানাটা দুলছে, নাকি মাথা ঘুরছে? চোখ খুলে তাকাল সে। আকাশের নিচে শুয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তার আগে হয়নি। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে যেতেই খানিকটা জল চলকে উঠল ভেলায়। ঠান্ডায় ভয়ে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল বেহুলা। ছিপছিপে বৃষ্টি হচ্ছে, পাশে স্বামীর মৃতদেহ। আস্তে আস্তে পুরো ব্যাপারটা খানিকটা পরিষ্কার হল তার কাছে। অভিশাপ নয়… অভিশাপ নয়… এ মৃত্যুস্রোত মানুষের চক্রান্ত। রাত্তির বেলা মুখির চালচলনে সন্দেহ হয়েছিল তার। লখিন্দরকে সাপে কাটতেই সে সন্দেহ তার চোখে ফুটে উঠেছিল, ফলে তাকে এই জীবন্ত সমাধি দেবার চেষ্টা।
নদীর দুই পাশে ঘন জঙ্গল, কোনও জনমানুষের দেখা নেই, ভয়ে বেহুলার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। কে জানে কোন বাঁকে চোরা ঘূর্ণির স্রোত, কোন জঙ্গলে বাঘ, কোথায় কাঠের টুকরোর মতো ভেসে আছে ধারালো দাঁতের কুমির। ভেলা কিন্তু আপনমনে স্রোতের টানে ভেসেই চলল।
বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। ক্রমে ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে, কলকলিয়ে তীব্র জল স্রোত ছুটছে। জঙ্গল ফাঁকা হয়ে এসেছে। একটা কাঁচা ঘাটে বসে কাপড় কাচছিল একটি কিশোরী মেয়ে, নাম তার দুলি। দুলি সাপুড়ে বেদে দলের মেয়ে। একটু দূরে ঝোপ ঝাড়ে কী সব ঔষধি লতা খুঁজছিল সর্দারের ছেলে সরল। দুলি হঠাৎই চিৎকার করে ডাক দিল, “এ সরল দেখে যা কেনে, ভেলায় কে ভেসে যায়।”
সরল আর দুলি দুজনেই জলে ঝাঁপ দিল। দুলি বেদের দলের মেয়ে, জলে জঙ্গলে সমান সাবলীল। খুব কষ্ট করে দুজনে ভেলা টেনে আনল পারে। ভেলায় সাপে কাটা মড়া তারা মেলা দেখেছে। কিন্তু জ্যান্ত মেয়েমানুষ কখনও দেখেনি। বেহুলার তখন তুমুল জ্বর এসে গেছে। সরল ভুরু কুঁচকে মড়াটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর চোখের পাতা টেনে, নাকের সামনে আঙুল নেড়ে কী যেন দেখল। তারপর দুলির দিকে চেয়ে বলল, “মনে লাগে ইয়ার শরীলে টুকু প্রাণ যেন একনও ধুকপুক করতিছে, এরে বিষহারীর কাছে লিয়ে যেতি লাগব।”
বেহুলা দুলির শরীরে ভর দিয়ে কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে আর সরল লখিন্দরকে ঘাড়ে নিয়ে চলল তাদের ডেরায়, তাদের সর্দারনি মনসার আস্তানায়।
বেদেদের আস্তানা বেশি দূরে নয়। এ সাপুড়েদের অস্থায়ী ঘর সংসার। পাতা, খড়, বাঁশ, কাঠকুঠো দিয়ে তৈরি ছোট-ছোট কুটির। মাঝখানে একটা বড় আটচালা গোছের ছাউনি। দুলি আর সরল বেহুলা লখিন্দরকে নিয়ে গিয়ে সেই আটচালায় শুইয়ে দিল। ডেরায় ঢুকতে না ঢুকতে ওদের চারপাশে ছেলে-বুড়োর ভিড় জমে যায়। মনসা এসে দাঁড়াতেই হইচই কিছুটা থিতিয়ে গেল। মনসার চেহারা অতি সাধারণ, গলায় কি যেন বীজের নীল একটা মালা। এই যৌবনোত্তীর্ণ নারীর চোখের দিকে তাকালে থমকে যেতে হয়। কঠিন চোখে বুদ্ধি, প্রজ্ঞা এবং প্রভুত্বের সঙ্গে আরও রহস্যময় কিছু মিশে আছে, যা অনুভব করা যায়, অথচ স্পর্শ করা যায় না। মনসা লখিন্দরের পাশে এসে বসল। হাতটা তুলে নাড়ির অতি ক্ষীণ গতি দেখল, হাতে সাপের কামড়ের দাগ, নাকের কাছে এনে গন্ধ শুঁকল। তারপর পাশে দাঁড়ানো দুই সহকারীকে কিছু গাছগাছড়া আনার আদেশ দিল। সাপে কাটা জায়গাটা ধুয়ে তীক্ষ্ণ সরু ছুরি দিয়ে চিরে দিল মনসা। খানিকটা রক্ত বেরিয়ে যেতে হলুদ রঙের কী যেন গুঁড়ো ভরে দিল ক্ষততে। দুলি ততক্ষণে বেহুলাকে সদ্য দোয়ানো কালি গাইয়ের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। বেহুলা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, দুলি তাকে নিজের কুটিরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়ে এল।
পরের ছ-মাস মনসার আস্তানায় লখিন্দরের চিকিৎসা চলল। একটা কুটিরে সারাদিন কেউ না কেউ তার সারা শরীরে লেপ লাগায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গা চিরে বিষ বের করে, জড়ি বুটি বেটে মাখিয়ে ক্ষতস্থান কলাপাতায় মুড়ে দেয়। লখিন্দরের গলার কাছে প্রাণটা ধুকপুক করে, জ্ঞান আর আসে না। মনসা নিজেই তার চিকিৎসা করে। অদ্ভুত সুগন্ধি ধুপ জ্বালিয়ে টানা টানা সুরে একঘেয়ে মন্ত্র পড়ে—
বিষহারী লো দয়া কর
নিথর দেহ জান দে
পাতার টোপ মাথায় মণি
অতল জল নিথর পানি

বেহুলার কিন্তু অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে গেছে। সে দুলি আর মুনিরার সাথে একই কুটিরে থাকে। কখনও চৈ চৈ করে হাঁসের পাল নিয়ে পুকুরে যায়, কখনও খালবিল থেকে আঁচলে ছেঁকে চুনো মাছ ধরে। বেদেরা যখন সাপের খেলা দেখায়, বেহুলা আর ভয়ে সিঁটকে যায় না। সে চোখ বড় বড় করে দেখে, সাপ রাখার টুকরি এগিয়ে দেয়। বেহুলার রঙ পুড়ে গেছে, খোলা চুলের আগাগুলো তেলের অভাবে মুখের চারপাশে সাপের ফণার মতো দোলে। বেহুলার মুখে হাসি, গলায় ভাটিয়ালি গান। সরলের কাছ থেকে বেহুলা শজারু, বেজি ধরার ফাঁদ পাততে শিখেছে, দুলি আর মুনিরার কাছ থেকে শিখেছে মেটে ইঁদুরের মাংস রাঁধার পদ্ধতি। প্রথম দিকে বেহুলা নিজেই দুটো ভাতে ভাত ফুটিয়ে খেত। কিশোরীর স্বাভাবিক কৌতূহলে খাদ্যে, বস্ত্রে ক্রমশ বেদেনিদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে প্রতিদিন। সরলের বাঁশিতে সাপুড়ের সুরে মিশে যায় অনেকটা চাঁদের আলো, ফুলের ঘ্রাণ আর বুঝি বা চোখের জল। মনসার কপালে ভাঁজ গভীর হয়। এ মনসা বুঝি বেদের দলের সর্দারনি মনসা নয়। সরলের মা মনসা, ছেলের বুকের ঝড় তুফান সে বিলক্ষণ বুঝতে পারে। লখিন্দরের আস্তে আস্তে দেহে বল ফিরছে, কিন্তু এখনও তার মাথা কাজ করে না। সে বেহুলাকে চিনতে পারে না, মনে করতে পারে না নিজের পরিচয়। দলের অন্যান্য বয়স্ক বেদেরা এবার অন্য জায়গার জন্য রওনা হতে উৎসুক। যাযাবর রক্তে জোয়ারের টান লেগেছে। দলের সর্দারনি বিষবৈদ্য মনসার জেদ রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে ঘরে ফেরাবে, তবে নতুন জায়গায় আস্তানা গাড়বে তারা।

দিন যায় মাস যায়। প্রায় ছ-মাস কেটে গেছে। গঙ্গায় যত জল গড়িয়েছে, তার চেয়ে বুঝি বেশি জল গড়িয়েছে লখিন্দরের মা সনকার চোখে। এর মধ্যে চাঁদ সদাগরের ঘরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। চিত্রার খাস দাসী মুখি জ্বরের ঘোরে সনকার দাসী পটলের মা-র কাছে কবুল করে বসে চাঁদ সদাগরের সাত ছেলের মৃত্য কোনও সাপ মারার অভিশাপের কারণে ঘটেনি। এ মৃত্যুস্রোত চাঁদ সদাগরের সম্পত্তি হাতাতে চিত্রা আর গদাধরের সংগঠিত হত্যালীলা। অর্থের লোভে মুখি এই পাপের ভাগীদার হয়েছে, তার পাপের কোনও শেষ নেই, সে আর প্রাণে বাঁচবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। পটলের মা সনকাকে গিয়ে এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের খবর দেয়। সনকার মুখে খবর পেয়ে চাঁদ সদাগর মেয়ে জামাইকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠান। বদ্ধ অর্গলের অন্তরালে কী কথা হয় কেউ জানে না। গদাধর, চিত্রা, জয়, বিজয় বজরায় করে বহুদূর ব্রহ্মদেশের পথে যাত্রা করে। জয় আর বিজয়— দুই বালকের জন্য বাড়িতে তবু যেটুকু আলো আর হাসি ছিল। এখন চাঁদ সদাগরের ঘর থেকে সেটুকুও গেছে। সনকা মৃতপ্রায় বিছানায় পড়ে থাকেন। ছয় বউ নীরবে ঘরের কাজ করে। চাঁদ সদাগর শুধু চিন্তা করেন কী উপায়? বংশরক্ষা করার জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন। প্রৌঢ় পাত্রের জন্য দিকে দিকে ঘটক ছোটে, সুলক্ষণা পাত্রী চাই। সনকা অশ্রুহীন চোখে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকেন। চাঁদের বিবাহের কথায় তাঁর মনোভাব বোঝা যায় না।

একদিন খুব ভোরে লখিন্দরের স্মৃতি খানিকটা হলেও ফিরে এল। সে পাতার বিছানায় উঠে বসে পাশে বসে থাকা যুবককে জিজ্ঞাসা করল, “আমি কোথায়?”
মনসা খবর শুনে শয্যার পাশে এসে বসল এবং আরও কিছু শক্তিবর্ধক লতাপাতার নির্যাস তাকে খাইয়ে দিল। লখিন্দরের গ্রামের নাম, বাপের নাম সবই মনে পড়ে, শুধু মনে পড়ে না স্ত্রী বেহুলাকে। লখিন্দর বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়। মনসা তাকে ঘরে ফেরা অনুমতি দিয়ে বেহুলাকে নিজের কুটিরে ডেকে পাঠাল। বেহুলাকে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “হ্যাঁ লা মেয়ে, তোর সোয়ামি তো ঘরকে ফিরবে, তুর মনে কী আছে?”
বেহুলা এই প্রশ্নটা ঠিক আশা করেনি। সে অবাক বিস্ময়ে তার কাঁচের মতো চোখ তুলে মনসার দিকে তাকাল।
এবার বেহুলাকে বুঝিয়ে বলে, “দ্যাখ মেয়ে, আমরা খুব নিচু জাতের মানুষ। গত ছ-মাস তুই আমাদের ভাত-জল খেছিস, তোর স্বামী বেটাছেলে পুরুষমানুষ। অর কুনও দোষ লাগবে না। কিন্তু তুকে আর তোর শ্বশুরঘরে লিবে না। তোর স্বামী ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাক, তুই আমাদের সাথে থেকে চল কেনে।”
বেহুলা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। একদিকে সরলের বাঁশিতে বাজা সহজিয়া গানের সুরের জাদুটান তার মনের মধ্যে নতুন স্বপ্নের জাল বুনে চলে। অন্যদিকে যুগযুগান্তর ধরে রক্তে মিশে থাকা স্বামী-শ্বশুরের ভিটের প্রতি আনুগত্য তাকে বড় নাজেহাল করে তোলে। কোথায় যেন একটা বউ কথা কও পাখি ডাকছে, বুনো ফুলের গন্ধ মিশে আছে হাওয়ায়। অনেকক্ষণ বসে থাকে বেহুলা, কাপড়ের খুঁটটা চেবায় অন্যমনস্কের মতো। তারপর নিশ্বাস ফেলে মন স্থির করে বলে, “আমাকে আমার শ্বশুরের ঘরেই পাঠিয়ে দাও মাসি, আমার কপালে যা আছে তা-ই হবে।”
মনসা উঠে দাঁড়াল। ওদের যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। গম্ভীর গলায় বলল, “ঠিক আছে, তবে তাই হোক। কাল তুদের খুব ভোরে রওনা হতি হবে। তুরা গরুর গাড়িতে যাবি, পায়ে হেঁটে তুদের সাথে সরল, তারক আর ভীমা যাবে। স্বামীর অষুধগুলো বুঝে লে।”
পরের দিন একমাথা ঘোমটা টেনে বেহুলা, আর দুর্বল শরীর লখিন্দর গরুর গাড়িতে বেদেদের আস্তানা ছেড়ে ঘরের পথে রওনা হল। বেহুলার দু-চোখ বেয়ে জল নেমে এসে তার বুকের কাপড় ভিজিয়ে দিচ্ছে। বেদের দলের মেয়েদেরও চোখে জল।
গভীর রাতে লখিন্দরদের গরুর গাড়ি চাঁদ সদাগরের ফটক পার করল। কড়কড় করে লোহার সিংদরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে গেল সরল আর তার দুই সহচর। তারা কিন্তু ফিরে গেল না, গ্রামের ঠিক বাইরে মাঠের ধারে তারা তাঁবু খাটাল।

চাঁদের বাড়িতে তখন যথার্থই চাঁদের হাট। কোথায় গেল সনকার অচৈতন্য দশা, কোথায় গেল চাঁদ সদাগরের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাড়িতে সবাই খুশি, সবাই আনন্দের বানে ভাসছে। কবিরাজ বৈদ্যরাজ এসে লখিন্দরের ভগ্ন স্বাস্থ্যের চিকিৎসা শুশ্রূষা করছেন। ছয় বউদি ঘড়ি ঘড়ি পথ্য, লেপ, অনুপানের ব্যবস্থা করছে। বাড়িতে পুরোহিতরা যাগযজ্ঞ করছেন অষ্টপ্রহর। এর মধ্যে বেহুলা কেমন আছে? না, সে এখনও অন্দরমহলে জায়গা পায়নি। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের নির্দেশে অন্দরমহলের উঠোনে ছোট শিব মন্দিরটির গায়ে একটা খড়ের কুটিরে তার ঠাঁই হয়েছে। তার প্রায়শ্চিত্ত চলছে প্রতিদিন। বেহুলা মেয়েমানুষ হয়ে ঘরের বাইরে রাতের পর রাত কাটিয়েছে, নিচু জাতের হাতে খেয়েছে, তাকে ঘরে তোলায় মত নেই তার শ্বশুরের। খড়ের ঘরে প্রায়শ্চিত্তের দিন গুনছে বেহুলা, বাড়ির দেওয়ালের বাইরে ইতিউতি ঘুরছে সরল আর তার দুই সহচর। বড়বাড়ির ঠাকুর, চাকর, মালীদের সাথে ভাব জমাচ্ছে আর খবর সংগ্রহ করছে। লখিন্দরের কাছে মনসার কথা শুনে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ চাঁদ সদাগর গ্রামের হাটে মনসার নামে একটা অশ্বত্থ গাছের তলা বাঁধিয়ে দিয়েছেন। ক্রমে গ্রামের মেয়েরা সেই গাছের ডালে নুড়ি পাথর বেঁধে মনসার নামে মানত শুরু করল। বেহুলার কিন্তু পাপ আর কাটে না।
সে এক অমাবস্যার রাত। অন্ধকার রাতের সঙ্গে গা মিলিয়ে একটা লোক বেহুলার খড়ের ঘরে বাইরে থেকে চকমকি পাথর ঠুকে আগুন ধরিয়ে দিল। সাধারণ মানুষ বেহুলার যতই প্রশংসা করুক, তার কলঙ্ক ঘোচার নয়। চাঁদ সদাগর ছেলের আবার বিয়ে দেবেন, এই বউকে ঘরে তুলবেন না। দেখতে দেখতে দাউ দাউ করে খোড়ো ঘর জ্বলে উঠল। বেহুলা ঘুম ভেঙে জেগে বসেছে, ধোঁয়ায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। পাঁচিল সংলগ্ন দেওয়ালের নিচ থেকে সিঁধ কেটে উঠে এল সরল। প্রায় অচৈতন্য বেহুলাকে গর্ত দিয়ে টেনে সুড়ঙ্গপথে চাঁদের বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে নিয়ে আসে সে। বাইরে অপেক্ষা করছিল তার দুই সঙ্গী। বেহুলাকে পিঠে ফেলে ছুটতে ছুটতে তারা নদীর ধারে এসে পৌঁছয়। দ্রুতগামী ছিপ নৌকা আগে থেকেই ঘাটে বাঁধা ছিল। বেহুলাকে নিয়ে তারা রওনা হয় বেদেদের ডেরায়।
বহুদর্শী চাঁদ সদাগর পোড়া ঘরে সুড়ঙ্গপথ দেখে যা বোঝার বুঝে যান। বেহুলার আর খোঁজখবর করেন না তিনি। লোকে জানল বেহুলা মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিল। প্রদীপের আগুনে থেকে আঁচলে আগুন লেগে পুড়ে মারা গেছে।
লোকের চোখে মৃতা বেহুলা মনসার ঘরে ধনেশ পাখির পালকের মালা পরে চিবুকে উল্কি কেটে সরল বেদের বউ হয়ে যাযাবর বেদের জীবনে মিশে যায় ক্রমে।
বেহুলা লখিন্দরের গল্প লোকের মুখে উপকথা ছাড়িয়ে ব্রত কথায় ঠাঁই পায়। ভাঙাচোরা কুঁড়ের ভাঙা চাল দিয়ে চাঁদের আলো এসে ঘুমন্ত সরল আর বেহুলার মুখে আলোর গল্প, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার গল্প আঁকে।

3 comments on “

বেহুলা আর সরল বেদের গল্প

শ্রীময়ী চক্রবর্ত্তী

  1. বাঃ বেশ লাগল, একটু অন্য ভাবনায় লেখা।

  2. অন্য এক বেহুলার আখ্যান শোণালেন শ্রীময়ী যা তার নামের মতোই। লেখিকাকে অভিনব্দন জানাচ্ছি, উপাখ্যানের দূরত্বকে এমন সহজ অথচ জোরালো আঙ্গিকে পরিবর্তন করেছেন আধুনিকতা আর ছোট গল্প- দুইয়েরই মান বজায় রেখে। এই লেখাটি অত্যন্ত আধুনিক কিন্তু প্রথাশীল ভালোবাসার গল্প হিসেবে দেখছি। যা সকলের উপরে ভালোবাসারই জয়গান গায়। অদ্ভুত লেখা। পরম অনুভুতির লেখা। শ্রীময়ীর লেখার অপেক্ষায় থাকবো।

Leave a Reply to জয়িতা

Your email address will not be published. Required fields are marked *