ডানা

মাধুরী সেনগুপ্ত

ফড়িংটা কেমন যেন গোল গোল করে ঘুরছে! নাকি অর্ধবৃত্ত? আরও মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে পূর্ণিমা। এত দূর থেকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না যদিও, কিন্তু ঘুরপাকটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে ও। ‘চোখ আর মন দুটোকে মিলিয়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতেহ!’ একদিন বলেছিলেন বাংলার শিশির দিদিমণি। একটু আগেই টিফিনের পরে অঙ্ক ক্লাসে মায়া দিদিমণি অর্ধবৃত্ত আঁকা শেখাচ্ছিলেন। বৃত্ত আঁকা অনেক সোজা, একটা গোল্লা। স্কুলের মাঠে রঙ্গন ফুলের গাছটার সামনে যে ফাঁকা জায়গাটা আছে ওখানে ওরা প্রায়ই কাঠি দিয়ে গোল আঁকত, অঙ্ক ক্লাসে মায়াদি বল্লেন সেটাই নাকি বৃত্ত! পূর্ণিমার আবার দুপুরের মিড ডে মিলের ডিমটাকেও ওই গোল মতো লাগত এতদিন। এখন বোঝে ওটা ঠিক গোল নয়। তবে একটা জিনিস ওর খুব মজা লেগেছে, ডিমেরও পেট কেটে দিলে যেমন আধা হয়ে যায় বৃত্তেরও তাই! ভাবতে ভাবতেই ফড়িংটাকে আর দেখতে পেল না পূর্ণিমা। ভয়টা যেন হুট করেই ফিরে এল।

সেই ভয়টা নিয়েই বাকি ক্লাসগুলো শেষ করল পূর্ণিমা। বারবার বাঁ’দিকের জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকালেও আর খুঁজে পেল না কোথাও ফড়িংটাকে। তবে কি?

“পূর্ণিমা, হোমওয়ার্ক?”

হুঁশ ফিরল ইংরেজি দিদিমণির গলার আওয়াজে। কিন্তু উত্তর তো জানে না। গতকাল রাতে যখন অঙ্কের ঐকিক নিয়মের অনুশীলনী শেষ হল, তারপরেই বাবা এসে গেল, তারপর তো আর আলো পাওয়ার ব্যাপার নেই। কুপির শিশিটায় কালি পড়ে পড়ে কালো হয়ে গেছে এতটাই যে কুপির নিজের আলোতেও মাঝে মাঝে শিশিটা দেখা যায় না। দাদা আসে আরও কিছুটা পরে। তারপর দুপুরের জল ঢেলে রাখা ভাত, পেঁয়াজ আর নুন এই হল ওদের রাতের খাবার। কোনোদিন কপাল ভালো থাকলে আলুভর্তা অথবা আরও ভালো থাকলে কুচো মাছের ঝাল। ভাবা শেষ হওয়ার আগেই আবার প্রশ্ন, “হোমওয়ার্ক করে আসোনি?”

কী উত্তর দেবে বুঝে ওঠার আগেই ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার নিদান পায় সে। এই একটা ব্যাপারে ওর মহা সমস্যা। ক্লাসের বাইরে মানে ঠিক ওর বেঞ্চের উলটো দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে হবে। বারান্দায় দাঁড়ালে দুটো সমস্যা। পাশের ক্লাসের রুমকি বাড়ি গিয়েই ওর মাকে বলে দেবে পূর্ণিমা আজ পড়া পারেনি; আর দুই এই বারান্দা থেকে ওই গাছটা দেখা যায় না। পূর্ণিমা যেদিন প্রথম স্কুলে এসেছিল তখন জানত না গাছটার নাম। পরে জেনেছে গাছটার নাম রঙ্গন। গত বছরগুলোয় গাছটাও বেশ বেড়েছে তরতরিয়ে। হঠাৎ দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু পূর্ণিমা বুঝতে পারে, সেই গতবার স্কুলে পুজোর ছুটির আগে কোণের ডালটা থেকে ফুল পেড়ে নিয়ে গেছিল ও। একমাস পর স্কুল খোলার পর ও দেখেছিল, ডালটার পাশেই আরেকটা ছোট্ট ডাল। এখন তো গাছটা এতটাই বড় হয়ে গেছে, ক্লাসে ওর বেঞ্চের জানালাটা দিয়ে গোটা গাছটা দেখাই যায় না। আর এই ক্লাসের বাইরে থাকলে তো একটুও না। এমনি এই বারান্দা থেকে ওই গাছের পাশেই যে ঘাসের ঝোপটা আছে সেটাও দেখতে পাওয়া দুষ্কর। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া চিন্তাটা আবার ফেরত এল, “ফড়িংটা গেল কই?” চিন্তাটা আবার ঘুরপাক খেতে লাগল ওর মাথায়।

ক্লাস শেষে আবার ক্লাসে ঢুকল ও। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। পূর্ণিমার এই ক্লাসে একজনই বন্ধু আছে, নতুন ভর্তি হয়েছে মেয়েটি, বাবার চাকরিতে বদলির সুবাদে। ক্লাসের অন্য মেয়েদের মুখে শুনেছে মেঘসারির বাবা নাকি মস্ত সরকারি অফিসে কাজ করেন। তা সত্ত্বেও মেঘসারি যখন তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হল, শিক্ষিকা থেকে ছাত্রীকুল সবাই একটু অবাকই হয়েছিল। তা সেই মেয়ে ভর্তি হওয়া ইস্তক সবাইকে অবাকই করে চলেছে। পড়াশুনো থেকে আবৃত্তি, স্কুল ম্যাগাজিনে কবিতা লেখা থেকে কার্টুন আঁকা মেঘসারি মানেই স্কুলের শিক্ষিকাদের নয়নের মণি আর পূর্ণিমার প্রাণের সই।

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না, মেঘসারি আসার আগে অব্দি পূর্ণিমাই ছিল এই সব সেরার সেরা। তারপর হুট করেই পিছিয়ে পড়তে লাগল ও। প্রথম প্রথম শিক্ষিকারা অবাক হতেন, বকাঝকাও করতেন তারপর বয়ঃসন্ধির বিভ্রাট ভেবে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আর পূর্ণিমাও আজকাল স্কুলে আসে, ওই রঙ্গন ফুলের গাছটার তলায় বসে থাকে প্রায়ই, থোক থোক ফুলগুলো যেগুলো পড়ে গেছে সেগুলো হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে, নয়তো পাশের ঝোপেই নজর। এমনকী ক্লাস থেকেও৷ ফড়িং খোঁজে খালি! আর সবাই না জানলেও প্রাণের বন্ধু মেঘসারিকে বলেছিল একদিন, ও নাকি ফড়িং চিনতে পারে! একেকটা ফড়িং একেক রকম। একটা ফড়িং-এর সবুজ রঙ নাকি অন্যটার থেকে আলাদা। আবার কেউ বেশি ওপরে উড়তে পারে, কেউ অর্ধবৃত্তে ঘুরতে পারে। এই কথাগুলো যতবার মেঘসারিকে বলেছে, হো হো করে হেসে উঠেছে মেয়েটা! পূর্ণিমার আগে ভীষণ অস্বস্তি হত, আজকাল বিরক্তি লাগে, তারপর ধীরে ধীরে ভয়ের অনুভূতিটা জাঁকিয়ে বসে। পূর্ণিমার মনে হয় হাসলেই সবচে বীভৎস লাগে মেঘসারিকে।

প্রথম যেদিন দেখেছিল, হাসিটা মন্দ লাগেনি। ওরা দুই বন্ধুতে মিড ডে মিলের পরে বসেছিল রঙ্গন গাছটার তলায়। আকাশে সাদা মেঘ আর কালো মেঘ তুমুল চু কিতকিত খেলছিল তখন। এই মনে হচ্ছিল সাদা আকাশ, পরমুহূর্তেই আকাশ পাড়ায় লোডশেডিং! হালকা হালকা হাওয়াও শুরু হয়ে গেছিল তখন। তুমুল গল্পের মাঝেই হঠাৎ করে পূর্ণিমা বলে উঠেছিল, “চল, টিফিন তো শেষের মুখে, ক্লাসে ফিরি। বৃষ্টি হবে মনে হয়।” মেঘ ওর কথা কানেই তুলল না, চুপটি করে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। ঠিক সেই সময় পূর্ণিমার চোখ পড়েছিল ঘাসের আগায়। আর দেখতে পেয়েছিল ফড়িংটাকে। ও স্পষ্ট চিনতে পেরেছিল, একটু আগে যখন ওরা গল্প করছিল দু-বন্ধুতে, যেই ফড়িংটাকে দেখেছিল, এটা সেই ফড়িংটা নয়! সেকথা মেঘকে বলতেই প্রথম হেসেছিল ও, আর অবাক হয়ে পূর্ণিমা ভেবেছিল, মেঘসারির হাসিটাও এত সুন্দর! কিন্তু অবাক হওয়ার ঘোর কাটতে না কাটতেই উঠে গেছিল মেঘ, আর চোখের নিমেষে ফড়িংটাকে ধরে দু-আঙুলের চাপে পিষে মেরে ফেলেছিল! হাসতে হাসতেই! সেই প্রথম ভয় পাওয়া।

তারপর থেকে প্রায়ই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। পূর্ণিমা আজকাল ভুল করেও মেঘের সামনে ফড়িং-এর কথা তোলে না, ক্লাসের অন্য অনেকেই যখন মেঘকে হিংসে করে ওর নানাবিধ প্রতিভার জন্য, পূর্ণিমা তখন ভয় পায় ওর প্রিয় সইকে! বাকি সমস্তটা সময় একদম স্বাভাবিক; মেয়েটা ফড়িং দেখলেই ওরকম হয়ে যায় কেন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না ও।

ঠিক যেমন বুঝে উঠতে পারে না, ওদের বাড়ির লাইটই বা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন! বাবার জুটমিল বন্ধের কারণ বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি এখনও, এমনকী দাদার হঠাৎ পড়া ছেড়ে দেওয়ার কারণও না। তবু এতদিন ওর মনখারাপ করত আগের দিন স্কুলের হোমওয়ার্ক করে নিয়ে যেতে না পারার জন্য। এক তো কুপির আলোয় পড়ার অভ্যেস নেই, তারপর আবার একটা মোটে আলো। বাবা সেই কোন ভোরে বেরিয়ে যায়, ফেরার পর সেই আলোতেই খাওয়াদাওয়া। তারপর মায়ের বাকি কাজকম্ম, যা শেষ হতে হতে ওরা সবাই ঘুমের দেশে। এমনি করেই চলছিল। হঠাৎ ঝামেলাটা হল সেদিন বিকাশ কাকা আসায়। কী নাকি এক ভালো সম্বন্ধ আছে, পূর্ণিমার সাথে নাকি খুব মানাবে। প্রথমটায় মা তুমুল আপত্তি করলেও বাবার চোখ আর দাদার ভাতের হাঁড়ির খোঁটায় চুপ করে গেছে। ঠিক সেইদিন থেকে পূর্ণিমার ভয় পাওয়ার শুরু!

আজকেও স্কুল থেকে ফিরে এইসবই ভাবছিল পূর্ণিমা। সামনে ইতিহাস বইটা খোলা থাকলেও ফড়িং-এর মতোই ঘুরপাক খাচ্ছিল ভাবনাগুলো। সেইদিন রাতেও সব পড়া শেষ করতে পারল না ও। মনের আকাশে একরাশি অন্ধকার মেঘ নিয়ে খেতে গেল। খেতে বসেও সেই এক আলোচনা। আগামীকাল নাকি বাবা আর দাদা যাবে ছেলেটির বাড়িতে কথা বলতে। তারপর নাকি ওঁরাও আসবেন পূর্ণিমাকে দেখতে। পূর্ণিমা যথারীতি সবটা বুঝতে পারছে না, কিন্তু আবার কিছু একটা ফিরে ফিরে আসছে৷ শেষ হওয়া ভাতের থালা থেকে চুমুক দিয়ে পান্তার জলটুকু গিলে নেয় ও। তারপর সেই খালি পাতে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় স্কুলের মাঠটা, রঙ্গন গাছটা, মাটিতে কাঠি দিয়ে করা আঁকিবুঁকি, পাশের সবুজ ঘাসের ঝোপ। আর ফড়িংগুলো। এতক্ষণে পূর্ণিমা বুঝতে পারে আসলে ভয়টা আবার ফিরে আসছে। ঢোক গিলে মায়ের দিকে তাকায় ও। অনেকদিন পর মায়ের মুখটার দিকে ভালো করে তাকায়, কুপির আলো মায়ের মুখে কেমন একটা মাকড়সার জাল তৈরি করেছে যেন! বলিরেখার বয়স মায়ের হয়নি আর বলিরেখা বোঝার বয়স পূর্ণিমার হয়নি। ভয়ের ধুকপুকানিটা নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পূর্ণিমা দেখতে পায় মায়ের চোয়ালটা। কেবলমাত্র গোটা মুখের ওই অংশটাই বড় স্পষ্ট, ক্রমশ ওঠানামা করছে, মা খাচ্ছে। অথচ তা সত্ত্বেও পূর্ণিমার যেন মনে হয় মায়ের চোয়ালটা প্রত্যেক ওঠানামায় যেন শক্ত হয়ে যাচ্ছে। পূর্ণিমার মন শক্ত না, ও ভীতু। ও মনে ভয় আর হাতে এঁটো নিয়েই টিউবওয়েলের কাছে যায় হাত ধুতে।

আজ সকাল সকাল স্কুলে চলে এসেছে পূর্ণিমা, অন্যদিনের থেকে বেশ কিছুটা আগেই। চোখে মুখে আগের রাতের জেগে থাকার ক্লান্তিটা আছে। এসে ও ক্লাসে যায়নি। বসে আছে ওর সবচে প্রিয় জায়গাটায়। রঙ্গন গাছের তলায়, পাশের ঝোপটায় আজ একটাও ফড়িং নেই, তবু পূর্ণিমার গতকাল রাতের ভয়ভাবটা অনেকটাই কেটে গেছে। কাল সারারাত প্রায় জেগেই ছিল ও, রান্নাঘরে মায়ের খুটখাট আওয়াজ শুনলেও চরম অভিমানে মায়ের কাছে যায়নি ও। তারপর কখন চোখটা লেগে গেছে খেয়াল করেনি। হঠাৎ ঘুমটা ভাঙল যখন তখুনি দেখেছিল জোনাকিটাকে, সারা ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছিল আলো হয়ে। পূর্ণিমা ততক্ষণে জানে ওকে কী করতে হবে। একটু আগে দেখা স্বপ্নটাকেই তখন জোনাকি মনে হচ্ছিল ওর। জোনাকির কথা ভাবতে ভাবতেই স্কুলের সাইকেল স্ট্যান্ডটার দিকে চোখ পড়ে ওর। নাহ, মেঘের লেডিবার্ড এখনও আসেনি। প্রার্থনার ঘণ্টা পড়ার প্রায় মুখে মুখে ঝড়ের গতিতে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে ঢোকে মেঘ। দুই বন্ধু অন্য দিনের মতোই একসাথে প্রার্থনার লাইনে দাঁড়িয়ে চোখ বোজে। পূর্ণিমার মনে এখন আর ভয়টা নেই।

প্রথম পাঁচটা ক্লাস যেন আর শেষই হতে চায় না। সেই কখন প্রথম পিরিয়ডের ফাঁকে মেঘকে বলেছিল ও, “তোর সাথে জরুরি কথা আছে।” তারপর থেকে দুই বন্ধুই উতলা হয়ে আছে, কিন্তু পূর্ণিমার এক গোঁ, টিফিনের আগে কিছুতেই সব কথা খুলে বলবে না সে। এর মাঝে বেশ কয়েকবার বাঁদিকের জানলা দিয়ে রঙ্গন গাছ আর পাশের ঝোপটা দেখে নিয়েছে ও। আজ ঝোপে ক-টা নতুন ফড়িংও দেখেছে, তবে সে কথা মেঘকে বলেনি। কোনোমতে পাঁচটা ক্লাস শেষ হতেই ওরা ছুট লাগাল খাওয়ার জায়গায়, কিন্তু খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই কীসের যেন আওয়াজ! হাত ধুয়ে একচ্ছুটে স্কুলের গেটের কাছে গিয়ে দেখে একটা অদ্ভুত গাড়ি ঢুকছে স্কুলের গেট দিয়ে। এরকম গাড়ি ওরা আগে দেখেনি, স্কুলের দিদিদের কাছেই শুনল ওদের স্কুল চত্বরের বাউন্ডারি ঘেঁষা বেশ কয়েকটা বড় গাছ আর রঙ্গন গাছটাও নাকি কেটে ফেলা হবে, আর ওই জায়গাটায় নাকি প্রাথমিক বিভাগের নতুন ভবন তৈরি হবে এমনটাই নির্দেশিকা। পূর্ণিমার মনে হল রাতের জোনাকিটা ভোরবেলায় হারিয়ে গেল! ওর চারপাশটা হু হু করতে লাগল। মেঘের বহু সাধাসাধিতেও কিছুতেই জরুরি কথাকটা আর বলতে পারল না ও। ভয়টা আবার ফিরে আসতে লাগল।

সপ্তম পিরিয়ড যখন প্রায় শেষের মুখে পূর্ণিমা ঠিক করল ওকে আজ কথাগুলো বলতেই হবে মেঘকে। যে করেই হোক। ছুটির পর মেঘকে বলতেই সে মেয়েও রাজি। পূর্ণিমাকে বলল, “শোন তুই নাবালিকা, তুই না চাইলে কেউ তোকে জোর করে বিয়ে দিতে পারেন না। কাকুও না। আমি বাবাকে বলব, বাবা বুঝিয়ে দেবেন কাকুকে।”

এই ক-টা কথা বলেই লেডিবার্ডের প্যাডেলে চাপ দিল মেঘ। পূর্ণিমা পিছন ফিরে ওই অদ্ভুত গাড়িটার দিকে তাকিয়ে হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে। ভয়টা নেই এখন আর। তবু রঙ্গন গাছটা কাটা যাবে ভাবলেই চোখে জল এসে যাচ্ছে ওর।

ঠিক যেমন এই মুহূর্তে একচোখ জল নিয়ে বসে আছে ও। মেঘ চলে গেছে মিনিট কুড়ি হল, বাবাও বেরিয়ে গেছে মিনিট দশেক আগে। কিন্তু পূর্ণিমা বসে আছে চারপাশে অমাবস্যার তুমুল অন্ধকার নিয়ে। মা যথারীতি রান্নাঘরে, কুপিটাও এই ঘরে নেই। আকাশে চাঁদটাও ভগ্নাংশ হয়ে আছে। পূর্ণিমার নিজেকে ওই ডানা পিষে মেরে দেওয়া ফড়িংটার মতো লাগছে! মেঘ যখন একটু আগে প্রথমবারের মতো এল বাড়িতে, ও ভীষণ আনন্দ পেয়েছিল। ওর প্রাণের সই, কেবলমাত্র ওর জন্য এসেছে ওদের বাড়িতে ভাবলেই বুকের ভেতর ফড়িং এর ছটফটানিটা টের পাচ্ছিল ও। কিন্তু মেঘের সঙ্গে আরও কাউকে আশা করেছিল পূর্ণিমা, “কাকু কই?”

ওর প্রশ্নের উত্তর দেয়নি মেঘ। পালটা প্রশ্ন করেছিল, “আমার কাকু কই?”

পূর্ণিমার বাবা তখন সবে হাতমুখ ধুয়ে বসেছেন, পূর্ণিমা জানত বাবা আজ কাজে যাবেন না, ওঁদের বাড়ি যাবেন। তাই তাড়াতাড়ি ফেরার কথা। সেই কারণেই এত পড়িমরি করে মেঘকে জানানো। কিন্তু বাবার মুখ দেখে মনে হল না খুব একটা খুশি হয়েছেন, হাজার হোক আতিথেয়তারও একটা বাজারদর আছে! কিন্তু বাবাকে অবাক করে ঢিপ করে একটা প্রণাম করল মেঘ। মানুষটা খানিক অপ্রস্তুত হয়েই বললেন, “ঘরে এসো।”

ঘরেই এসেছিল মেঘ। তারপর পূর্ণিমার যাবতীয় স্বপ্নে বৃষ্টি নামিয়ে চলেও গেছে। পূর্ণিমা অবাক হয়ে শুনছিল মেঘ আর বাবার কথোপকথন। কী অবলীলায় মিথ্যে বলে মেয়েটা। হাসতে হাসতে। উফ্ সেই বীভৎস হাসি! ঠিক যখন মেঘ বাবাকে বলল, পূর্ণিমা নাকি বাড়ি থেকে পালাবে বলে আজ স্কুলে তার কাছে সাহায্য চেয়েছে আর তাই পূর্ণিমার পরিবারকে সতর্ক করতেই মেঘের এই বাড়িতে আসা, তখন মেঘ হাসছিল। ওই কুপির আলোতেও পূর্ণিমা স্পষ্ট দেখেছে গজদাঁতে পড়ে আলোগুলো ছিটকে যাচ্ছে। ঠিক যেভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছিল পূর্ণিমার স্বপ্নগুলো, আরও পড়ার, বড় হওয়ার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। মেঘ চলে যাওয়ার পর বাবা নিদান দিয়েছে বিয়ে পর্যন্ত পূর্ণিমার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ, স্কুল বন্ধ। তারপর বাবাও বেরিয়ে গেছে। মা যথারীতি রান্নাঘরে। পূর্ণিমা বসে আছে। আজ আর ওর ভয় লাগছে না, তবে নিজেকে মৃত ফড়িংটার থেকে আলাদাও করতে পারছে না। পূর্ণিমা হঠাৎ অঙ্ক খাতাটা খুঁজতে লাগল, অন্ধকারে পাওয়া সমস্যা। তবু বড়রাস্তায় কেন যেন অনেক আলো দিয়ে সাজিয়েছে, সেই আলো আজ ঘরে ঢুকছে। খাতা বের করে ঐকিক নিয়মের অনুশীলনী কষতে থাকে ও। অন্ধকারে প্রায় কিছুই দেখা যায় না, ও দেখতেও পায় না কখন যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মা। চোখের ওপর চাপ দিয়ে জোর করে অঙ্ক কষতে গিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে থাকে। বেশ খানিকক্ষণ পর পূর্ণিমা বোঝে ঐকিক নিয়ম আজও মেঘসারির থেকে পূর্ণিমা ভালো করে, বোঝে ফড়িং-এর মতোই ওর সব ইচ্ছেকে ডানা চেপে মেরে দিল ওর প্রিয় সই, তার অনেক পরে পূর্ণিমা বোঝে ও আসলে কাঁদছে। ওর জামা ভিজে গেছে, ক্যালেন্ডারের উল্টো সাদা পিঠ ওর অঙ্ক খাতা সব ভিজে গেছে! ভেজা খাতা নিয়েই কখন ঘুমিয়ে গেছে ও জানে না, কেউ ডাকেনি ওকে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই ও দেখল সেই রঙ্গন গাছটা, আর ঠিক তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল একটা আওয়াজে।

অনেকক্ষণ এপাশ করে চোখটা অন্ধকারে খানিক সইয়ে আসার পরেও ও ঠাওর করতে পারল না কত রাত হল। কিন্তু পাশে মা-ও নেই। খানিক ভয় করলেও আওয়াজটা কোথা থেকে আসছে বুঝতে পারল না ও। তবু খাট থেমে নামতে গিয়েও ঠান্ডা মেঝেতে পায়ের পাতাটুকু লাগতেই কেমন শিউরে উঠল ও। মনে পড়ল এবার কালীপুজোর পর থেকেই ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়তে আরম্ভ করেছে। ক-দিন আগের বৃষ্টিটা আরও ঠান্ডা বাড়িয়েছে। তারপরেই মনে পড়ল পরশু ওকে দেখতে আসার কথা, পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়ে গেলে হয়তো ডিসেম্বরেই… অথচ ডিসেম্বরে ওর বার্ষিক পরীক্ষা। ভাবনাটা শেষ হওয়ার আগেই আবার আওয়াজটা। এবার খানিক ঠাওর করতে পারল ও। মনে হচ্ছে রান্নাঘরের দিক থেকেই! পা টিপে রান্নাঘরের দিকে এগোয় ও, দরজা বন্ধ। জানালা দিয়ে হৈমন্তী হাওয়া একটা ভয়ের ঝাপ্টা মেরে যায়, তবু চোখ বন্ধ করে রান্নাঘরের দরজায় ধাক্কা দেয় পূর্ণিমা।

ভেজানো দরজা সহজেই খুলে যায়, আর পূর্ণিমা দেখতে পায় চোয়ালটা। যথারীতি সেই চেনা ভঙ্গী, সেই তেরছা আলো, সেই শক্ত চোয়াল। তফাত শুধু এটুকুই, অন্যদিন ভাত চেবানোর সময় মায়ের চোয়ালটা ওঠানামা করে, আজ স্থির। আলোছায়ায় স্পষ্ট বোঝা না গেলেও পূর্ণিমা দেখে ওর মা কিছু লিখছে, যে মা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছে কোনোমতে, সে এই মাঝরাত্তিরে কী করছে? আরও দু-পা টিপে মায়ের দিকে এগিয়ে যায় ও, মায়ের চারপাশে ছড়ানো ছিটানো সব বই, ভীষণ চেনা, এইসব ওর নিজের বই, গতবছরের। আর মা অঙ্ক করছে। এতদিন ও জানত ওর পুরনো বই সব মা জমিয়ে রাখে স্মৃতি হিসাবে। বাবা বহুবার কিলোদরে কাগজ বিক্রি করে দিতে চাইলেও মায়ের তুমুল জেদেই এতদিন পারেনি। কিন্তু সেইগুলো যে এইকাজে লাগে বুঝতেও পারেনি পূর্ণিমা। মা টের পায়নি ও এসে দাঁড়িয়েছে। দূর থেকে মা আর চারপাশে ছড়ানো ছিটানো বইগুলোকে হঠাৎ করেই রঙ্গন গাছটার মতো লাগতে লাগল ওর, আর চারপাশের বইগুলোকে থোকা ফুলগুলোর মতো।

“এদিকে আয়।” ঘাড় না ঘুরিয়েই মা ডাকল ওকে।

তুমুল চমকের ঘোর কাটিয়ে পূর্ণিমা এখন দাঁড়িয়ে আছে ওর প্রধান শিক্ষিকার ঘরে। দিদিমণি মোবাইলে কাকে যেন ফোন করছেন, আর মুখে হাসি। কিন্তু এ কী! আরও চমক বাকি ছিল?! পরদা সরিয়ে কারা ঢুকছে ঘরে? বাবা আর দাদা না? ও কী! সঙ্গে পুলিশ কেন? তারপরের ঘটনা ঘটল খুব দ্রুত। বড়দিদিমণির মৃদু কিন্তু স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া কিশোরী পূর্ণিমার কিছুতেই এখন বিয়ে দেওয়া চলবে না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত ও যতদিন চায় ওকে পড়তে দিতে হবে। পুলিশকাকুর কড়া চাহনির সামনে বাবা, দাদার পালটে যাওয়া মুখ চোখ আর মুচলেকায় সই! সবটাই ঘটল হু হু করে। সব মিটে যাওয়ার পর বড়দি আলাদা করে ধন্যবাদ দিলেন ওর মাকে। চুড়ি, টিপ কিনতে যাওয়ার নাম করে মা যদি না আজ ওকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসতেন, পূর্ণিমা এতক্ষণে শাড়ি পরে পাত্রপক্ষের সামনে বসে থাকত। হুঁশ ফিরল মায়ের গলার আওয়াজে, “দিদি, খুব অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় পড়াশুনা শেষ করতে পারিনি। মেয়েটার স্বপ্নের ডানা ছাঁটি কী করে?”

এই প্রথম পূর্ণিমা দেখল ওর মায়ের শক্ত চোয়ালটা ছাড়াও আরও একটা জিনিস এতদিন ও খেয়াল করেনি। কথাগুলো বলার সময় মায়ের চোখ দুটো তিরতির করে কাঁপছে।

পূর্ণিমার হঠাৎ মনে হল মায়ের চোখ দুটো যেন দুটো ফড়িং… একটু আগের চোখের সঙ্গে এই চোখের কোনও মিল নেই। সে ফড়িংচোখ আর এই চোখে বিস্তর ফারাক। কাল রাতে কুপির আলোয় দেখা চোখ আর এই চোখ একদম এক। হুবহু একই রকম।

বড়দির ঘর থেকে বেরোনোর সময় আবার মায়ের চোখের দিকে তাকাল ও। তারপর সেই রঙ্গন গাছটার দিকে। অবাক কাণ্ড গাছটা কাটা হয়নি। পাশেই ঘাসের ঝোপে আবার অনেকগুলো ফড়িং উড়ছে।

মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসার সময় ওর মনে হল, ফড়িংগুলো থেকেই যাবে, ডানাসমেত… অন্তত যতদিন রঙ্গন গাছটা রয়েছে।

9 comments on “

ডানা

মাধুরী সেনগুপ্ত

  1. চমৎকার! এক কথায় চমৎকার! ইমেজারি, কল্পনা, স্বপ্ন সব মিলিয়ে ভারি সুন্দর লেখা।

    1. দিনটা ম্যাচ করে যাবে, লেখার সময়ে ভাবিইনি। কালকেও বুঝিনি। অনেক ধন্যবাদ 😊

  2. দারুণ। কিছু গল্প দাগ কেটে যায়।

Leave a Reply to বাসব সেন

Your email address will not be published. Required fields are marked *