ঠাউরুণ

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের উত্তরদিকের প্রতিবেশী পাড়ার গুন্ডার নাম রেগুলারলি খবরের কাগজে বেরোত, দক্ষিণের পাড়ার তেইশ হাত জগদ্ধাত্রী মূর্তি দেখতে ট্রেনে চড়ে লোক আসত, পশ্চিমদিকের পাড়ার একটা ছেলে একবার মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল বলে কাগজে তার নাম বেরিয়েছিল। উত্তরের পাড়ার গুন্ডার খবরের পাশের খোপেই।

আমাদের গর্ব করার মতো একমাত্র ছিলেন ঠাউরুন। আমাদের পাড়ার, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, সব পাড়ার, গোটা মিউনিসিপ্যালিটির প্রাচীনতম বাসিন্দা। ঠাউরুনের বয়স কত কেউ জানত না। ঠাউরুনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, সেই যে বছর মারাত্মক বন্যা হয়েছিল, সে বছর তিনি জন্মেছিলেন। কবেকার বন্যা, কোথাকার বন্যা, এসব ঠাউরুন বলেননি কখনও। সবাই ইচ্ছেমতো ঠাউরুনের একটা বয়স ঠাউরে নিয়েছিল। যুক্তিবাদীরা বলত, কত আর হবে, মেরেকেটে আশি। রোম্যান্টিকেরা বলত, “আশি! হেসেখেলে নিরানব্বই।” আর খবরের কাগজে কিংবা টিভি রেডিওতে চিন বা জাপানের কোনও দীর্ঘজীবী মানুষের প্রাচীনত্ব নিয়ে হইচই হতে শুনলে দু-দলই বলত, “একশো দুই? ফুঃ। আমাদের পাড়ায় একজন আছেন, গত বছর একশ পাঁচ পার করেছেন।”

একটা বিষয়ে সবাই একমত ছিল, ঠাউরুনের আগে আমাদের পাড়াটা ছিল না। বাঁশবাগান ছিল। আর সূর্য ডুবলে শেয়ালের ডাক। তারপর এলেন ঠাউরুন, সঙ্গে একখানা পিঁড়ি আর একখানা কাস্তে। দু-হাত বাই দেড় হাত কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি। আমরা যখন ঠাউরুনকে দেখেছি, তখন তাঁকে ভাঁজ করে ওই পিঁড়ির মধ্যে দিব্যি আঁটিয়ে দেওয়া যায়। এক কাঠের তৈরি পিঁড়ি, কোথাও কোনও জোড়াতাড়া নেই।

ঠাউরুনের পরে এসেছিল রিকশাস্ট্যান্ডের মোড়ের মাথার ঘোষেরা। তারা এসেছিল দলবল নিয়ে। কর্তা-গিন্নি, চার ছেলে, চারটে ছেলের বউ, পুজোপার্বণে তিন মেয়ে, মেয়ের জামাই আর আরও খানপাঁচেক কাচ্চাবাচ্চা।

যে সময়ের কথা, ততদিনে কর্তাগিন্নি মরে ভূত, সাত ভাইবোনের মধ্যে চারজন অকালপ্রয়াত, তাদের ঘরের তেরোজন নাতিনাতনি এদিক-সেদিক। অরিজিন্যাল ঘোষকর্তার সেজোছেলে সাতাত্তর ছুঁইছুঁই, বাড়িতে থাকলে বকে বকে সবার মাথা ধরিয়ে দেন আর দেখ না দেখ মিটসেফে রাখা মিষ্টি চুরি করে খান বলে বিকেলবেলা ঘুম থেকে ওঠামাত্র পায়ে মোজা, মাথায় মাংকিক্যাপ আর হাতে লাঠি ধরিয়ে বাড়ির লোক বুড়োকে রাস্তায় বার করে দিত। তরফদারের কাঠের গোলা ছিল মোড়ের মাথায়। গোলার বেঞ্চিতে বসে সেজো ঘোষ লোক ডেকে ডেকে গল্প করতেন। তাঁর কাছেই সবাই শুনেছিল, তিনি নাকি জন্মে ঠাউরুনের বর-টর ছেলেপুলে দেখেননি। এসে থেকে ওই থান শাড়ি, আর হাতের কাস্তে নিয়ে “মাগি বাঁশ কাটছে।”

রোদে-পাতা পিঁড়ির ওপর হাঁটু মুড়ে, হাঁটুর ওপর শিরাসর্বস্ব দুই হাতের পাতা রেখে বসে থাকতেন ঠাউরুন। পিঁড়ির পাশে ঠাউরুনের কাস্তে শুয়ে থাকত। বাঁশঝাড় কেটে আমাদের পাড়ার জন্ম দেওয়া সেই ঐতিহাসিক কাস্তে। এইরকম ঐতিহাসিক কাস্তের বিনয় দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম, একেবারেই সাধারণ দেখতে। তবে ভারী কাস্তেটা ঠাউরুন অবলীলায় তুলতে পারতেন। মাঝে মাঝে কাস্তেখানা তুলে পিঠ চুলকোতেন। প্রথম প্রথম সবাই শিউরে উঠত, তারপর বোঝা গেল কাস্তের ধার-টার বিশেষ বাকি নেই। “এত ভারী তোলো কী করে ঠাউরুন?” জানতে চাইলে ঠাউরুন হাসতেন। চোখ দুটো সুতোর মতো সরু হয়ে যেত, ঠোঁটজোড়া চাঁদের মতো বেঁকে যেত আর ভেতরের গোলাপি মাড়ির ভেতর খয়েররঙা জিভ নড়ে নড়ে হাসত। “তোদের ভারী লাগে, আমার লাগে না, কাস্তে আমার হাতে পোষ মেনে গেছে।”

দরমার বাড়িতে ঠাউরুন একাই থাকতেন। কিন্তু শীতের দুপুরে আর হেমন্তের সন্ধেয়, বর্ষার বিকেলে আর গরমের রাতে ঠাউরুনের তকতকে উঠোনে মাদুর পেতে আড্ডা বসত। মূলত মহিলাদের, কিন্তু ঠাউরুন প্রগতিশীল ছিলেন, পুরুষেরা আড্ডায় যোগ দিতে এলে ফেরাতেন না। একটাই রুগ্ন চেয়ার ছিল, সে চেয়ারে কোনও মেয়ে বসে থাকলে তাকে নামিয়ে আগত পুরুষটিকে বসতে দিতেন।

জটলার মাঝখানে পিঁড়িতে স্থির হয়ে বসে থাকতেন ঠাউরুন, পাতলা সাদা চুলের ফাঁক দিয়ে দুপুরবিকেলের সূর্যের আলো মাথার ফর্সা চামড়ায় চিকচিক করত। পাখির মতো দেহটাকে জড়িয়ে থাকত সাদা থান। শীতের ক-মাস তার ওপর একটা ভুষি রঙের চাদর।
ঠাউরুন উবু হয়ে বসে থাকতেন, তাঁর চারপাশ দিয়ে গল্পেরা বইত। কখনও সোজা পথে, কখনও ঘুরে, এর-ওর শোবার ঘর রান্নাঘর পেরিয়ে, হাঁড়ির ঢাকনা তুলে, উঁকিঝুঁকি দিতে দিতে। ঠাউরুন শুনছেন কি না বোঝা যেত না। হাঁটু প্রায় ছুঁয়ে ফেলা চিবুক দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হত হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু সন্দেহ ভুল প্রমাণ হত যখনই গল্পে ভাটা পড়ত। গল্পে যোগ দেয় বলেই তো গল্প করার ক্ষমতা সবার সমান থাকে না, কেউ কেউ গল্প প্যাঁচে ফেলে দিয়ে আর বার করতে পারত না, তখন ঠাউরুন মাথা অল্প তুলে ছোট্ট একটুখানি ফোড়ন কাটতেন কিংবা সামান্য একটু পাদপূরণ করতেন, অমনি গল্প আবার গড়গড়িয়ে চলতে শুরু করত।

ঠাউরুন নিজেও মাঝে মাঝে গল্পের সুতো হাতে নিতেন, তবে তা সকলের সামনে, সবসময় নয়। বিকেল ফুরোলে ঠাউরুনের চাতাল ফাঁকা হয়ে যেত। উলের বলে কাঁটা গুঁজে, “চলি গো ঠাউরুন, কাল আসব” বলে আড্ডা যে যার বাড়ি ফিরে যেত, তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলে শাঁখ বাজিয়ে ছিটকিনি খুলে রান্নাঘরে ঢুকত। পাড়ার ভালো ছেলেরা ততক্ষণে হাত-পা ধুয়ে মায়ের আঁচলের তলায় বসে দুধমুড়ি খেয়ে পড়া শুরু করেছে। বখাটেরা তখনও কাদামাখা বল বগলে বাড়ি ফিরছে হেলেদুলে। ঠাউরুনের জমির কিনারায় আশশ্যাওড়ার ছায়ায় দাঁড়িয়ে চুপিচুপি বিড়ি টানার সময় কোনও কোনও দিন তারা গুনগুন শুনতে পেত। বিড়ির আলো পায়ে পিষে শ্যাওড়ার ছায়া থেকে উঁকি মেরে দেখত বারান্দায় পিঁড়ি পেতে বসে শাড়ির আঁচল নয়তো ভুষি চাদর নেড়ে মশা তাড়াচ্ছেন আর গান গাইছেন ঠাউরুন। পাশে নিচু সলতের হলুদ লন্ঠন।

বখাটেদের বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই, তারা মাঝে মাঝে ঠাউরুনের পাশে গিয়ে বসত। কোনও কোনও দিন, ইচ্ছে হলে, ঠাউরুন নিজের ছোটবেলার কথা বলতেন। বাড়ির পাশে পুকুরের কথা, পুকুরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া তালগাছ, যেটা ধরে হেঁটে যাওয়া যায় পুকুরের প্রায় মাঝখান পর্যন্ত, তারপর গাছ আঁকড়ে শুয়ে থাকা যায় জলের দিকে চেয়ে।

গল্পের মাঝখানে কবে, কোথায়, প্রশ্ন করলে ঠাউরুন উত্তর দিতেন না। ক্বচিৎ কদাচিৎ হয়তো বললেন, “সে অনেক দূর।” বা “বন্যার তিন বছর আগে” নয়তো “পাঁচ বছর পর।” রাত ঘন হত, লন্ঠনের চিমনির মুখে কালি জমত, বখাটেরা প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে, “আসি ঠাউরুন” বলে উঠে পড়ত। ঠাউরুন “যা” বা “আবার আসিস” কিছুই বলতেন না। গুনগুন করে আবার গান শুরু করতেন, নয়তো আঁচল নাড়াতে নাড়াতে উলটোদিকের বাড়ির ছাদের মাথায় চাঁদের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকতেন। কী ভাবতেন কে জানে। হয়তো সেই বন্যার কথা।

মোট কথা, এ পাড়ার সবার নাড়িনক্ষত্র ঠাউরুনের কণ্ঠস্থ থাকলেও ঠাউরুন সম্পর্কে পাড়ার লোকে জানত খালি পিঁড়ি, কাস্তে আর বন্যা।

যতদিন না সেজো ঘোষের নাতি বুবকা বিলেত থেকে ডিগ্রি নিয়ে ফিরল।

* * *

বিলেত গেছিল যখন লিকপিকে রোগা, সাত চড়ে রা কাড়ে না। সারাদিন বন্ধ ঘরে বই মুখে করে বসে থেকে থেকে গায়ের রং ফ্যাটফেটে ফ্যাকাশে। স্পোর্টসের মাঠে, ডিফেন্স পার্টির টহলে, পুজোর চাঁদা তোলায় ও ছেলের কোনোদিনও টিকি দেখা যায়নি। বুবকার মা-জেঠিরা বলতেন, “আহা, ছেলের স্বাস্থ্য খারাপ।” পুরোটাই অজুহাত নাও হতে পারে। কারণ কাজের জায়গায় বুবকাকে দেখা না গেলেও সপ্তাহের এ মাথায় ও মাথায় বাপিদের বাড়ির লাগোয়া চিলতে ডিসপেনসারিতে মাথায় মাফলার জড়িয়ে বাড়ির কারও সঙ্গে বসে থাকতে দেখা যেত। সবাই ‘আহা উহু’ করত। বংশের একমাত্র ছেলে, সেও রোগাভোগা হল।

বিলেত থেকে ফেরার পর সেই বুবকাকে কেউ চিনতেই পারল না। একখানা লাল রঙের গাড়ি চলতে চলতে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল কাঠগোলার সামনে। গাড়ি তখন আমাদের ওদিকে আর অত দুর্লভ নয়, মাঝে মাঝে হুসহাস করে যায়, কিন্তু সেসব গাড়ি থেকে কেউ নেমে গোলার সরু বেঞ্চিতে বসে থাকা জনতার দিকে হাসিমুখে হাত নাড়েনি কখনও।

কাঠগোলার লোকজন হাঁ করে চোখে সানগ্লাস, মাথায় শার্লক টুপি, হাত নাড়া চেহারাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে লোকটা এগিয়ে এসে কালো চশমা খুলে বেঞ্চিতে বসে থাকা একজন বয়স্ক লোককে অতিকষ্টে ঝুঁকে প্রণামের ভঙ্গি করে জিজ্ঞাসা করল, “চিনতে পারছ না? আমি বুবকা।”

নাম শুনে যদি বা কিছু সন্দেহ বাকি ছিল, গলা শুনে মিটে গেল। চোদ্দো বছর বয়সে সেই যে বুবকার গলা ভেঙেছিল, আর জোড়া লাগেনি। তার আগে বুবকা ইন্দ্রাণীদির বাবার কাছে গান শিখতে যেত। ইন্দ্রাণীদির বাবা বলেছিলেন, “এখন ক-দিন থাক, জোড়া লাগলে আবার শুরু করা যাবেখন।” এই বলে ইমন না ভৈরব কী একটা রাগ অর্ধেক শিখিয়ে শেখানো বন্ধ করেছিলেন। তারপর বোঝা গেল, বুবকার গলা ভাঙাটা পার্মানেন্ট, ইমন না ভৈরব হাফ শেখা হয়েই রইল।

বাড়ি ফেরার তৃতীয় দিন সকালেবেলা রুটি খেতে খেতে মিহি গলায় বুবকা বলল, “বাই দ্য ওয়ে বাবা, থিংকিং অফ আস্কিং ইউ ওয়ান থিং বাট ফরগেটিং, আমাদের পাড়ায় মনোমোহিনী দেবী বলে কেউ আছে?”

“মনোমোহিনী দেবী?”
বুবকার বাবা, সেজো ঘোষের ছেলে মুখের ওপর থেকে খবরের কাগজ সরিয়ে ভুরু কুঁচকোলেন।
“আমাদের ফ্যামিলিতে তো…”
“না না ফ্যামিলিতে না। পাড়ায়। আশেপাশের পাড়াতেও হতে পারে।”

সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলেন বুবকার বাবা। ততক্ষণে বুবকার মা স্বামীর জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢুকেছেন। তিনিও বলতে পারলেন না।

“কুণ্ডুদের মায়ের নাম কী যেন একটা ম দিয়ে ছিল না? শ্রাদ্ধের কার্ডে লেখা ছিল?”

বুবকা আর্তনাদ করে উঠল, “ডেড?”

বুবকার মা কুণ্ডুবাড়িতে জিজ্ঞাসা করে জানলেন, ওঁদের মায়ের নাম ম দিয়েই ছিল বটে কিন্তু মনোমোহিনী নয়, মনোহরা। কুণ্ডুবাড়ির লোক দাশগুপ্তদের জিজ্ঞাসা করল, দাশগুপ্তরা মাইতিদের, মাইতিদের নাতি মহা পাকা, বারান্দার রেলিং ধরে ঝুলতে ঝুলতে পুকুরঘাটে স্নানরত লোকদের উদ্দেশে চেঁচাল, “তোমাদের বাড়িতে মনোমোহিনী দেবী বলে কেউ থাকে গো?” ঘাট থেকে খবর গেল শর্মার কাঠের গোলায়। গোলায় বসেছিলেন সেজো ঘোষ স্বয়ং। বিলেতফেরত নাতিকে একটা উচ্চারণের অযোগ্য গালি দিয়ে বুড়ো বললেন, “ছ্যামড়ার বুদ্ধিও যেমন, জানতে গেছে ওই ঢ্যামনাটার কাছে।” বলে নিজের ছেলের ঢ্যামনাত্ব নিয়ে হোহো করে হাসলেন, তারপর গলায় উঠে আসা শ্লেষ্মা থু থু করে ফেলে পাঞ্জাবির হাতায় ঠোঁট মুছে বললেন, “এত হল্লাহাটির কী আছে, মাগিকে জিজ্ঞাসা করলেই হয়। এ পাড়ার গোড়া থেকে যত লোকের যত হাঁড়ির খবর মাগির কাছে আছে।” বলে হাতের ছড়ি তুলে ঠাউরুনের বাড়ির দিকে নির্দেশ করলেন।

মাঘের রোদের আঁচে তখন পরচর্চা জমে উঠেছে। একটু আগে খাওয়া কমলালেবুর গন্ধ হাওয়ায়। এমন সময় লম্বা ছায়া পড়ল মাদুরের ওপর। কাঁপা কাঁপা হাতে চোখ আড়াল করে ঠাউরুন মুখ তুললেন। মিহি গলা বলে উঠল, “কী ঠাউরুন, কেমন আছ?”

“কে? ঘোষেদের নাতি নাকি? কবে এলি?”

বিলিতি জুতোয় ভাঁজ ফেলে দু-পায়ের দশ আঙুলের ওপর ভর দিয়ে বসল বুবকা। দুই হাত আড়াআড়ি রাখল হাঁটুর ওপর।

“ঠাউরুন, মনোমোহিনী দেবী বলে এ তল্লাটে কখনও কেউ ছিল নাকি গো? জানো?”

এরপর এক-একজন এক-একরকম বলে। মিত্রপিসিমা, যিনি নিজের পায়ের কড়াকে ক্যান্সার বলে চালিয়েছিলেন তিনি বলেন, বুবকার কথা শুনে ঠাউরুনের শ্বাস উঠল, বুক চেপে ধরে তিনি গোঁ গোঁ করলেন। ঘোষদের ছাগল ফলন্ত কলাগাছ মুড়িয়ে খেয়ে গেছে বলে ঘোষেদের প্রতি যাদের জাতক্রোধ, সেই মজুমদারদের পুত্রবধূর মতে, ঠাউরুন মুখঝামটা দিয়ে বলেছিলেন, “তাতে তোর কী ডেঁপো ছেলে?” কিন্তু ঠাউরুনকে যারা চিনত, তারা জানত এগুলোর কোনোটাই সত্যি নয়। তারা জানত বুবকার প্রশ্ন শুনে ঠাউরুনের কী প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব।

ঠাউরুন দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকেছিলেন। তারপর হেসেছিলেন। যে হাসি আনন্দেরও হতে পারে, দুঃখেরও।

* * *

পিঁড়ি আর কাস্তে ছাড়া ঠাউরুনের যে একটা নামও আছে, এ খবরটা হজম করতেই লোকের সব বিস্ময় খরচ হয়ে গেল। তাই বুবকা যখন মনোমোহিনী দেবী ওরফে ঠাউরুনের ইতিহাস সাতকাহন করে বলল অত ধাক্কা লাগল না।
ক্লাবঘরে জটলা বসল সেদিন রাতেই। সিলিং থেকে ঝোলানো টিনের ঢাকনা দেওয়া বাল্বের হলুদ আলো-পড়া ক্যারামবোর্ডের চারপাশের আবছায়ায় চাদরমুড়ি দেওয়া ছায়া ছায়া শরীর। পুকুরের ঠান্ডা হাওয়া থেকে বাঁচার জন্য ক্লাবঘরের দরজায় ছিটকিনি তুলে দেওয়া হল, হাওয়ার ধাক্কায় সে দরজা মাঝে মাঝেই খটখট করে উঠতে লাগল।

বুবকা বলে চলল। গবেষণার কাজে বাংলাদেশের পুরোনো মামলা মোকদ্দমার নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে প্রথম মনোমোহিনী দেবীর খোঁজ পেয়েছে বুবকা। অধুনা বরিশালের কলসকাঠি গ্রামে নিশিকমল ভট্টাচার্য নামে পূজারী ব্রাহ্মণের মা-মরা মেয়ে ছিল মনোমোহিনী। সে আমলের নিয়ম মেনে রেখে তার আরও কয়েক গণ্ডা ভাইবোন ছিল, কিন্তু মনোমোহিনীর গল্পের জন্য তারা জরুরি নয়। জরুরি হল মনোমোহিনীর ছোট বোন সৌদামিনী। দু-বোনের বয়সের তফাত ছিল প্রায় চোদ্দো বছর। কলকাতা শহরের সফল এবং ব্যস্ত উকিল শ্রী তারকনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে মনোমোহিনী যখন গ্রাম ছেড়ে কলকাতা চলে এল, তখন সৌদামিনী টলমলিয়ে হাঁটে, আধো আধো কথা কয়। বাপের বাড়িতে থাকতে মনোমোহিনীর ইশকুলে-টিশকুলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি, দাদাদের পাশে বসে অক্ষরপরিচয় হয়েছিল কোনোমতে। তারকনাথ প্রচুর বই পড়তেন, স্ত্রীকে পড়তে উৎসাহ দিতেন, অ্যাংলো মেম রেখে দিলেন ইংরিজি শেখানোর জন্য। মনোমোহিনীর গেঁয়ো লজ্জা ভাঙিয়ে জুড়িগাড়িতে তাঁকে পাশে বসিয়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে বেরোতেন। এমন সময় খবর এল কলসকাঠিতে নিশিকমল দেহরক্ষা করেছেন। বাবার কাজে গ্রামে ফিরে গিয়ে মনোমোহিনী দেখল সৌদামিনী, সেই ছোট্ট সদুকে। সে তখন আর ছোট নেই, হাতেপায়ে চাউনিতে যৌবন মুচকি হাসছে। পিতৃমাতৃহীন বোনটির প্রতি গ্রামের মোড়ল-মোড়লীদের দৃষ্টি মনোমোহিনীর ভালো লাগল না। তার নিজের ছেলেমেয়ে নেই, হওয়ার আশাও নেই, “চল আমার সঙ্গে,” বলে সদুকে নিয়ে মনোমোহিনী চলে এল কলকাতা।

তারকনাথ মনোমোহিনীর সংসারে নতুন হাওয়া বইল। দুজনের মধ্যে ভাব কম ছিল না, কিন্তু অভ্যেসের শ্যাওলা তো পড়েই। সদু এসে সেসব ভাসিয়ে দিল। তারকনাথ তাকে কলেজে ভরতি করে দিলেন। স্বামী বোন সকালে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর মনোমোহিনী সারাদিন টুকটাক ঘরের কাজ করত, না করলেও কিছু আসত যেত না, দাসদাসী ছিল। দুপুরে খেয়ে উঠে খাটের ওপর উবু হয়ে শুয়ে শুয়ে নাটক-নভেল পড়ত। বিকেলে মেমসাহেব আসতেন। মনোমোহিনীকে তিনি ভালোবাসতেন, প্রতিদিনই হাতে বানানো কেক, বিলিতি পিঠে নিয়ে আসতেন। কখনও কখনও পড়া চলাকালীন সৌদামিনী ফিরে আসত, তখন দুই বোনে মেমসাহেবের গলা জড়িয়ে ধরে বিলেতের মেমের ছোটবেলার গল্প শুনতে শুনতে কেক খেত। সৌদামিনী কলেজের বন্ধুদের কাছ থেকে নিত্যনতুন খোঁপার কায়দা শিখে আসত, দিদির চুল বেঁধে নিজের চুল বাঁধত। সৌদামিনী বোনকে বাহারি কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরিয়ে দিত, তারপর দুই বোনে তারকনাথের অপেক্ষা করত। তারকনাথ ফিরলে তিনজন গাড়ি চেপে বেড়াতে বেরোত। তিনজনের সংসারে সুখ অঢেল ছিল, দুই বোনে সদ্ভাব ছিল, তারকনাথের চরিত্রদোষ ছিল না। অন্তত পাড়াপড়শির জবানবন্দিতে তেমন কিছু জানা যায়নি।

গোলযোগের প্রথম আঁচ পাওয়া গেল যে দিন সকালে প্রতিবেশীর হাফপ্যান্ট পরা ছেলে দৌড়তে দৌড়তে থানায় এসে খবর দিল, তারকনাথ উকিলের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। পুলিশ গিয়ে দেখল বাড়ি বিধ্বস্ত, ঘরের ভেতর রক্তের সমুদ্রে ভাসন্ত তিনটি দেহ, পুরুষটির বুকে ধারালো অস্ত্রের অগুনতি কোপ, একটি নারীর মুণ্ড ধড় থেকে প্রায় আলাদা, অন্য নারীটির মাথা ফাটা, কানের লতি ছিঁড়ে গয়না নিয়ে গেছে ডাকাতে। প্রথম দর্শনে তিনটিকেই মৃতদেহ মনে হয়েছিল, নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একটি দেহ কঁকিয়ে উঠল।

আছে আছে, প্রাণ আছে!

মৃতদেহ দুটো ডোমের কাঁধের লাঠি থেকে বস্তার দোলনায় দুলতে দুলতে মর্গে গেল, প্রাণওয়ালা দেহটা পুলিশের অ্যাম্বুলেন্সে চেপে হাসপাতালে। সেখানে বিলেতফেরত ডাক্তার মনোমোহিনীর ছেঁড়া লতি, ফাটা মাথা সেলাই করে দিলেন। কড়া ঘুমের ওষুধের ডোজ দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন। পুলিশকে বললেন, এখন অপেক্ষা করতে হবে, তোমাদের তদন্তের জন্য আমি আমার পেশেন্টের প্রাণসংশয় হতে দিতে পারি না। প্রায় বারো-চোদ্দো ঘণ্টা পর গাঢ় ঘুম থেকে জেগে, শ্রীমতী মনোমোহিনী দেবী, হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে প্রায় অশ্রুত কিন্তু স্পষ্ট জবানিতে গত রাতের ঘটনাক্রমের বর্ণনা দিলেন।

* * *

আত্মীয়ের বাড়িতে পুজোয় গিয়েছিলেন মনোমোহিনী। রাত হলে আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে যাওয়ার কথা ছিল, রাত হয়েওছিল, কিন্তু মনোমোহিনীর অচেনা বিছানায় ঘুম হয় না। বাড়ির সামনে তাঁকে নামিয়ে দিয়ে আত্মীয়ের গাড়ি চলে গেল। ল্যাম্পপোস্টের ধোঁয়া ধোঁয়া আলোয় বাগান পেরিয়ে দরজার সামনে পৌঁছলেন মনোমোহিনী। চাবি বার করার আগেই সন্দেহ হয়েছিল। দরজা খোলা, চিলতে ফাঁক দিয়ে বাড়ির ভেতর প্রাণের সাড়া স্পষ্ট পাওয়া যাচ্ছে। কে জেগে এত রাতে? সদু রাত ন-টা বাজতে না বাজতে ঢুলতে থাকে, তারকনাথ আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ। কোনও আচম্বিত অতিথি?

হাসপাতালের বেডে শোয়া মনোমোহিনী চোখ বুজলেন। কপালের শিরা দপদপ করছে। মনোমোহিনী দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে, মকরমুখো বালা ছুঁয়ে আছে পালিশ-করা সেগুনকাঠের পোক্ত পাল্লা। অল্প ঠেলতে পাল্লা ফাঁক হল। এক পা সদর দরজার চৌকাঠে রেখে কয়েক মুহূর্ত থমকালেন মনোমোহিনী। এ অন্ধকারটা যেন কেমন, অন্যদিনের মতো নয়। এ যেন কিছু একটা লুকোতে চাইছে, কী যেন একটা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েও পারছে না। মনোমোহিনীকে বলছে, পালাও পালাও, আর এক পা-ও বাড়িয়ো না।

সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করে পা বাড়ালেন মনোমোহিনী। আর দরজার আড়াল থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে তাঁর মুখ চেপে ধরল। শরীরের পেছনে সেঁটে গেল একটা পুরুষের শরীর, তারকনাথ নয়, এর সারা শরীরে ঘাম আর দিশি মদের গন্ধ। মরা গাছের ছালের মতো রুক্ষ, ফাটা চামড়া চেপে বসল মনোমোহিনীর নাকমুখের ওপর, তীক্ষ্ণ নখ গালের চামড়ায় বিঁধে গেল, পাঁজরের খাঁচা থেকে হুহু করে বাতাস বেরিয়ে যেতে লাগল। মনোমোহিনী হাতটা সরানোর চেষ্টা করলেন, লোকটা মনোমোহিনীর হাত মুচড়ে নিয়ে গেল শরীরের পেছন দিকে, মনোমোহিনীর গোঙানি থাবার আড়ালে চাপা পড়ে রইল।

ফুসফুস যখন পাঁজর ফাটিয়ে বেরিয়ে পড়ার উপক্রম, মুখের ওপর থেকে হাতটা সরে গেল। ঝড়ের মতো অনেকটা হাওয়া একধাক্কায় ঢুকে পড়ে জ্বালিয়ে দিল বুক। কাশিতে ভেঙে যেতে যেতে মনোমোহিনী চিনতে পারলেন, তাঁর শোবার ঘর। বিছানা উলটোনো, স্বামীর পড়ার টেবিলের লন্ঠনের কাচ চূর্ণবিচূর্ণ, আলমারির দরজা হাট করে খোলা। ওই আলমারির ভেতর তাঁর বাপের বাড়ি থেকে আনা যৎসামান্য আর স্বামীর দেওয়া প্রচুর গয়না। সব মিলিয়ে চল্লিশ ভরি।

চুলের গোছায় হ্যাঁচকা টানে গয়না থেকে মন উঠে এল মনোমোহিনীর। টানের চোটে টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে উলটে পড়লেন আর সেই অবস্থাতেই মেঝের ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে কেউ টানতে টানতে নিয়ে চলল ঘরের কোণে। জলের ওপার থেকে ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলেন আরও একজোড়া লোমশ পা ঘরের অন্য কোণে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের সরে যাওয়া আঁচলের প্রতি সচেতন হলেন মনোমোহিনী। মাথা থেকে সরে হাত নেমে এল বুকের ওপর। হা হা করে হাসল কেউ।

ঘরের কোণে ছেঁড়া পুতুলের মতো মনোমোহিনী আছড়ে পড়লেন, কিন্তু শক্ত মেঝেতে নয়, মনোমোহিনীর শরীরের নিচে আরও একটা শরীর। তখনও উষ্ণ। থাবা টান মেরে খুলে নিল সাতলহরী হার, কানের লতি ছিঁড়ে নিল কানপাশা। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য গালির সঙ্গে প্রচণ্ড আঘাত নেমে এল কপালের বাঁদিকে।

আলো নিভে গেল।

* * *

এতক্ষণ ধরে গল্প বলে বুবকার গলা শুকনো, শ্রোতাদেরও গলা খটখটে। ক্লাবের কোণে স্টিলের গ্লাস চাপা দেওয়া কুঁজো রাখা ছিল, কেউ কেউ উঠে গিয়ে জল খেল।

তারপর?

বুবকা বলল, “তারপর আবার কী। পরদিন সকালে প্রতিবেশীদের কেউ একটা গোটা ঘটনাটা আবিষ্কার করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে দেখে সারা ঘরের মেঝেতে, দেওয়ালে রক্ত শুকিয়ে বাদামি, তিনটে বডির দুটো অলরেডি শক্ত কাঠ, একটা মিরাকুলাসলি তখনও অ্যালাইভ।”

তারপর?

তারপর হাসপাতাল, মর্গ, থানাপুলিশ। মনোমোহিনী দেবীর জবানি অনুসারে প্রায় চল্লিশ ভরি গয়না লুঠ হয়েছিল সে রাতে। সেসব আর পাওয়া যায়নি। আলমারিতে শুধু রাখা ছিল একটা দলিল, রিটায়ার করে শহরে থাকবেন না বলে ধ্যাদ্ধেড়ে বাঁশবনের মধ্যে একফালি জমি কিনে রেখেছিলেন তারকনাথ। পুলিশের হাঙ্গামা শেষ হলে সেই দলিলখানা নিয়ে শহর ছাড়লেন মনোমোহিনী দেবী।

দলিলে পাড়ার নাম লেখা ছিল না, খালি একটা জেনারেল লোকেশন, গঙ্গার পশ্চিম পার, বাঁশবন আর পানের বরজের কথা লেখা ছিল। “অ্যান্ড আই রিমেম্বারড দাদু টেলিং মি আমাদের প্লটটা ওয়ান্স আপঅন আ টাইম পানের বরজ ছিল, সো…” গাট ফিলিং-এর ওপর ভরসা করে বুবকা খোঁজ শুরু করল। আর পৌঁছল এসে ঠাউরুনে।

* * *

বুবকার গল্প শোনার পর থেকে সবাই ঠাউরুনকে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করল। রোজকার গল্পের আসর আগের মতোই বসল, কিন্তু কার বর বাইরে সংসার করে, কে শাশুড়িকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না, ডাকাতের হাতে মাথা ফাটানো আর স্বামীবোনকে হারানোর পাশে মারাত্মক জোলো ঠেকতে লাগল।

লোকের একটু অভিমানও হল। আমরা কি তোমার পর, ঠাউরুন? এতবড় একটা ট্র্যাজেডির হিরোইন যে তুমি নিজে, সেটা তুমি আমাদের কাছে লুকিয়ে রেখেছ? যারা সদ্য সাইকোলজি পড়েছিল তারা বলল, আহা, ঠাউরুনকে দোষ দিয়ো না। হয়তো উনি নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন। মানবমনের জটিলতার তল তো জানো না, ‘কোপিং মেকানিজম’ হিসেবে গোটা পর্বটার ওপর ঠাউরুনের মন হয়তো পর্দা টেনে দিয়েছিল।

এই যুক্তিটার মধ্যে খানিকটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে। সত্যিই ঠাউরুন তাঁর জীবনের ওই পর্বটার কথা মনে করেননি বহুদিন। আজকাল কত কিছু মনে থাকে না। ঘোষেদের নাতিকেও তো তিনি চিনতে পারেননি। তার ওপর রোদ এসে চোখে পড়েছিল। ঠাউরুন? ঠাউরুন? ফালি বাঁশের মতো চেরা গলা শুনেও বুঝতে পারেননি, হাতের পাতা দিয়ে চোখের ওপর ছায়া তৈরি করে চোখ সরু করতে প্রথমেই নজরে পড়ল নাকখানা। সরু হয়ে শুরু হয়ে মাঝখানটা ফুলে উঠে আবার শেষে সরু হয়ে গেছে। ঘোষেদের গোটা বংশের নাক ওরকম। তারপর চেরা গলা আর ফোলা নাক, দুই আর দুইয়ে যোগ করে চার হল। কতদিন দেখেননি ছেলেটাকে, কোথায় গেছিলা, কোথায় গেছিলা বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন, ছেলেটাও কী যেন জিজ্ঞাসা করছিল, দুদিকের প্রশ্ন ধাক্কা খেয়ে কারোরই আর উত্তর দেওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে ঠাউরুন ক্ষান্ত দিলেন আর ছেলেটার প্রশ্নটা তাঁর কানে ঢুকল।

মনোমোহিনী দেবী কে?
একমুহূর্তের জন্য ঠাউরুনও ভেবেছিলেন, মনোমোহিনী দেবী কে? নামটা শোনা শোনা লাগে যেন?

তারপরই সব ফিরে এল। যুগযুগান্ত পার করে ঠাউরুন নিজেকে আবার আবিষ্কার করলেন বন্ধ দরজার সামনে, মকরমুখো বালা ছুঁয়ে আছে চকচকে কালো পালিশের সেগুনকাঠের পোক্ত পাল্লা। রাস্তায় গাড়ির চাকার আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার পর চারদিক আবার নিস্তব্ধ। দরজাটা খোলা। ভেতরের অন্ধকারটা যেন কেমন, অন্যদিনের মতো নয়। যেন তাঁকে সাবধান করছে, আর এগিয়ো না। ফিরে যাও ভালো চাও তো।

মনোমোহিনী চৌকাঠ পেরোলেন। সদর ঘর অন্ধকার। কিন্তু তাঁদের শোওয়ার ঘরের আধভেজানো পাল্লার ওপাশে মৃদু আলোর আভাস। একবার যেন গলার আওয়াজ এল? তাঁর আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ স্বামী, এখনও জেগে? নাকি…

ঘরের কোণে কী চিকচিক করছে? জানালা দিয়ে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোয় শুয়ে থাকা কাস্তেটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। মালি এসেছিল বাগানের কাজ করতে, ঠিক জায়গায় না রেখে চলে গেছে।

কাস্তে আঁকড়ে মনোমোহিনী শোবার ঘরের দিকে। গলার স্বর এখন স্পষ্ট, চাপা হাসিও নির্ভুল। দম বন্ধ করে দরজা ঠেললেন মনোমোহিনী।

দৃশ্যটার মানে বুঝতেই সময় লেগে গেল খানিকক্ষণ। ততক্ষণে তাঁর বিছানার ওপরের ছায়া ভেঙে আলাদা আলাদা দুটো মানুষের অবয়ব নিয়েছে।

মনোমোহিনীর চেনা মানুষ।

হাতের কাস্তেটা ভীষণ ভারী লেগেছিল মনোমোহিনীর।

* * *

কেউ কি ‘মনো!’ বলে ডেকেছিল? ‘দিদি!’ বলে কেঁদেছিল? কাঁদলেও মনোমোহিনী শুনতে পাননি। যখন চেতনা ফিরেছিল, সারা ঘরে রক্ত, বিছানায় রক্ত, তাঁর হাতে, মুখে, চুলে রক্ত। কাস্তে থেকে টপটপ রক্ত ঝরছে। খালি মনোমোহিনীর মাথার ভেতরটা খটখটে শুকনো। ঠান্ডা।

ঘুরে ঘুরে সারাবাড়ি লন্ডভন্ড করতে, আসবাবপত্র টেনে টেনে ফেলতে রাত প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু আলমারি খুলে গয়না ছুড়ে ফেলা বাড়ির পেছনের আধবোজা জলায়, আর ছ-মাসের মধ্যে যেখানে তিনমহলা বাড়ি উঠবে। নিজের গায়ের গয়নার কথাও ভোলেননি মনোমোহিনী। গলার হার ফেলেছিলেন, টান মেরে ছিঁড়েছিলেন কানপাশা।

তারপর মন শক্ত করে দাঁড়িয়ে, কাস্তের ফলাটা দু-হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে হাতলের দিকটা দিয়ে নিজের কপাল ফাটিয়ে অজ্ঞান হয়ে এলিয়ে পড়েছিলেন স্বামী আর সৌদামিনীর মৃতদেহের ওপর।

* * *

ভয় কি একেবারে পাননি ঠাউরুন? পেয়েছিলেন, কিন্তু অনেক পরে। যখন তাঁর কোলে বাচ্চা ছেড়ে মায়েরা নিশ্চিন্তে চলে যেত, নিজেদের গভীরগোপন দুঃখের কথা মন খুলে বলে হালকা হত, শুভকাজে ডাকত। ঠাউরুন রুদ্ধশ্বাস হয়ে থাকতেন, এই বুঝি তাঁর খোলস ছিঁড়ে মনোমোহিনী এসে সামনে দাঁড়ায়।

দাঁড়ায়নি। অপেক্ষা করে করে ঠাউরুনের নিজের মন থেকেও ভয় কেটে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, সেই একরাতে তাঁর ভেতরের সমস্ত বিষ বেরিয়ে গেছে।

* * *

বুবকা যখন ক্লাবঘরে পাড়ার লোকদের মনোমোহিনী দেবীর রোমহর্ষক আখ্যান শোনাচ্ছিল, ঠাউরুন বাড়ির দাওয়ায় বসে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। লন্ঠন নিভে গেছে অনেকক্ষণ। অনেক রাতে গাঙ্গুলিদের ছাদের রেলিং-এর ওপর চাঁদ উঠল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ঠাউরুন অনেক চেষ্টা করলেন, স্বামীর মুখ, সদুর টলটলে মুখখানাও স্পষ্ট মনে পড়ল না।

* * *

আরও বছর দু-এক বাদে, সেই ভীষণ বন্যার কে জানে কত বছর পর, ঠাউরুন মারা গেলেন। বন্যা না হলেও সে বছর রেকর্ড বর্ষা হয়েছিল। কাগজে, রেডিওতে দূরদূরান্তের বন্যার খবর আসছিল সকালবিকেল। বৃষ্টির চোটে বাসট্রেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ঠাউরুন যেদিন মারা গেলেন, টানা তিনদিন বর্ষার পর রোদ উঠেছিল সকালে। ঠাউরুনের পিঁড়ি ফের দেখা গেল চাতালে। পিঁড়ির ওপরে ঠাউরুন বসে আছেন। মাথা বুকের ওপর ঝোঁকা। পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে সেনকাকিমা, “কী ঠাউরুন, কেমন বৃষ্টি হল?” হেঁকে সাড়া না পেয়ে ভাবলেন, বুড়ির কানটা গেছে। কাকুকে অফিসে, মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে আবার যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন কাকিমা, তখনও ঠাউরুন একইভাবে পিঁড়ির ওপর বসে আছেন। একটা বিশ্রী চিন্তা বুকের ভেতর ধাক্কা মারল, কাকিমা মুহূর্তে সেটাকে বিদায় করলেন। গলায় ভরপুর সাহস নিয়ে ‘ঠাউরুন’, ‘ঠাউরুন’ ডাকতে ডাকতে এগোলেন, ঠাউরুন মাথা তুললেন না। “ঠাউরুন?” হাত বাড়িয়ে কাকিমা ছুঁলেন ঠাউরুনের কাঁধ, ঠাউরুন টলে পিঁড়ির ওপর পড়ে গেলেন।

পুকুরধারের বটগাছের তলায় চাঁদা তোলা খাটে ঠাউরুনকে শোয়ানো হয়েছিল। মিউনিসিপ্যালিটির প্রাচীনতম বাসিন্দার দেহাবসানে এমএলএ এসেছিলেন ঠাউরুনের পায়ে মালা দিতে। মাঠের প্রান্তে দূরে ভিড় করেছিল আশেপাশের পাড়ার লোক। ঠাউরুনের পায়ে ফুলের মালা পরিয়ে এমএলএ স্যালুট করে দাঁড়ালেন। পুকুরের হাওয়ায় তাঁর সাদা ধপধপে ধুতির প্রান্ত অল্প অল্প উড়তে লাগল। পুকুরঘাটের জল স্থির হয়ে রইল, টুপটাপ বটের পাতা ঝরে পড়ল ঠাউরুনের চাদরঢাকা শরীরের ওপর, চোখের জলের মতো।

আমাদের অনেকেরই সেই প্রথম শ্মশানদর্শন। আমাদের মধ্যে সাহসী যারা, তারা চিতা সাজাল, লাঠি উঁচিয়ে পাশে দাঁড়াল, অনেক সময় পুড়তে পুড়তে মড়া স্প্রিং-এর মতো ছিটকে উঠে বসে, ঠাউরুনও যদি বসেন, তখন বাড়ি মেরে শোয়াবে বলে। ঠাউরুন ওসব কিছুই করলেন না, লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপচাপ পুড়লেন। অভিজ্ঞ লোকেরা বলল, তাড়াতাড়িই মিটে গেল, অবশ্য বুড়ির শরীরে হাড় ছাড়া তো কিছু ছিল না।

ঠাউরুন তাঁর বাড়িখানা দিয়ে গিয়েছিলেন পাড়ার লাইব্রেরিকে। সে বছরই সরকারি অনুদান পাশ হল, ঠাউরুনের দরমার বাড়ির জায়গায় লাইব্রেরির নতুন ঘর উঠল, নতুন শেলফে, নতুন বই সাজল সারি সারি। লাইব্রেরির দরজার ওপর সাদা বর্ডার দেওয়া কালো বোর্ডে সোনালি রঙে লেখা হল ‘ঠাউরুন স্মৃতি পাঠাগার’। দু-একজন বলেছিল, ‘মনোমোহিনী স্মৃতি পাঠাগার লিখলে..’ বাকিদের দৃষ্টির সামনে তাদের বাক্য আর শেষ হল না। নামের পাশে ব্র্যাকেটে ঠাউরুনের জন্ম মৃত্যুর সাল লেখার আইডিয়াটা মন্দ ছিল না, কিন্তু বন্যার সালটা কারও জানা ছিল না বলে সেটা লেখা গেল না।


‘ফিরে পড়া গল্প’ বিভাগে প্রকাশিত গল্প সংকলন থেকে গল্প তুলে আনছি আমরা। সম্পাদকের পছন্দ অনুসারে সৃষ্টি-র এই সংখ্যায় রইল কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘নয়’ গল্প সংকলন থেকে একটি গল্প। বইটি অনলাইন অর্ডার করা যাবে এখানে

4 comments on “

ঠাউরুণ

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

  1. ভীষণ ভাল গল্প। সম্পাদককে ধন্যবাদ এমন একটি গল্প পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। লেখিকাকে অভিনন্দন ।

Leave a Reply to সই

Your email address will not be published. Required fields are marked *