থামো, পরিযায়ী

জয়িতা সেনগুপ্ত

(১)

অনেকক্ষণ ধরে আস্তে আস্তে চলতে থাকা ঝিঁঝির ডাকটা হঠাৎই যেন গাঢ় হয়ে এল। বাংলোর হাতার বাইরের পিটিস আর ঝাঁটির ঝোপ জুড়ে আচমকাই সন্ধ্যাকালীন জলসা শুরু হল ওদের। সম্বিত ফিরে পেয়ে শুভ্র দেখল পশ্চিম আকাশের কোণ বরাবর কখন এসে সন্ধ্যাতারাটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। একে একে দৃশ্যমান হচ্ছে অন্যেরাও। নৈঃশব্দ কাঁপিয়ে যাওয়া টিটি পাখিটার টিটির টি-টি ছাপিয়ে ওর কানে এল মোটরবাইকের হর্ন আর গেট খোলার আওয়াজ। সমীর ফিরল লাপূরা বাজার থেকে।

“দাদা, কফিটা বারান্দায় দিতে বলি? একবার বাজারগুলো দেখে নেবেন নাকি?”
শুভ্র বাংলোর দিকে এগোল, অনেক কাজ এখন। কাল সকালে গেস্টরা এসে যাওয়ার আগে ঘরগুলোকে একবার ফাইনালি নিজেকে চেক করে নিতে হবে। নজর বুলিয়ে নিতে হবে আনাজপাতি, মশলার স্টকেও। যদিও সমীর আর ওর বউ দীপা খুবই মুন্সিয়ানায় এগুলো সামলে রাখে, তবুও ম্যানেজার হিসেবে সে-ই বা নিজের কাজে ফাঁকি কী করে দেয়।
কফি টেবিলের পাশের মেঝেতে আজকে বাজার থেকে আনা জিনিসগুলো সাজিয়ে রেখেছে সমীর। ওকে দেখে হেসে এগিয়ে এল।

“অনেক লম্বা লিস্ট দিয়েছেন দাদা, এত সব কিছু এনারা খাবেন?”

“খান বা না খান, ব্যবস্থার ত্রুটি রাখলে তো চলবে না? মালকিনের গেস্ট বলে কথা! রুষ্ট হলে তোমার আমার দুজনেরই গর্দান যাবে তো।”

“এবার বেশ অনেকদিন পর কেউ আসছে, না দাদা?”

“সে আর কী করা যাবে বলো। ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রাণের মায়া শঙ্খশুভ্র মিত্তির, সমীর-দীপা বাড়ুই এর নেই বলে কি আর কারও থাকবে না? মাওবাদীর ভূত তাড়া করে বেড়ায় এটা তো আর মিথ্যা নয়। যাক, দাও দেখি লিস্টটা।”

দুই রকমের রেড ওয়াইন, দুই রকম ফ্লেভারের ভডকা, বিয়ার, ব্লেন্ডেড স্কচ, ফ্রুটজুসের গোটা দশের টেট্রাপ্যাক, সোডা, চিজ, বাদাম, চিপস, কফি, বিস্কুট, ডালমুট, কাজু-– নাহ, সব ঠিকঠাক পাওয়া গেছে তাহলে।

“দেখলে, আগে থেকে বলা ছিল বলে সব কী রকম গুছিয়ে দিতে পেরেছে।”

“হ্যাঁ, দাদা, দোকানের ধরবাবুও তাই বলছিলেন। ম্যানেজমেন্ট পড়া লোক তোমাদের ম্যানেজারবাবু। কিচ্ছুটি ভুল হবার উপায় নেই।”

“কাল সকালে হেসালং-এ কে যাবে? সূরয? ছেড়ে দাও, আমি নিজেই যাব। গাড়িতে তেল আছে তো?”

“হ্যাঁ, দাদা”

“গুড। চলো ঘরগুলো একবার দেখে নি।”

ঘণ্টা চারেক পর, সব সেরে নিজের ঘরে ফিরল শুভ্র। অল্প শীত করছে বলে আলোয়ানটা গায়ে ফেলে ঘরের লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়াল সিগারেট ধরিয়ে। সাউন্ড সিস্টেমে শুরু হল মালকোষ। রাতের নিজস্ব সুরের সঙ্গে মালকোষের ধুন মিশে আচ্ছন্ন করতে লাগল ওর চেতনা। এই রাত, এই রাগ, এই নির্জনতা, এই টিটি পাখির ডাক, দেহাতি মেয়েদের শরীরের ভাঁজের মতো এই পাহাড়ের সারি– এই অনির্বচনীয় একাকিত্ব বাকি জীবন যেন এভাবেই থাকে ওর নিজের হয়ে। তারাভরা আকাশের দিকে প্রার্থনার ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে রইল শুভ্র, শঙ্খশুভ্র মিত্র, বিজনেস স্কুল টপার, পৃথিবী চষা সফল বাণিজ্যিক পরামর্শদাতা। এই মধ্যরাতের আকাশ, বনানী, পাহাড়ের বিশালতায় নিজের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম অস্তিত্বকে সমর্পণ করে কোন পূর্ণতা ও পেতে চায়, নিজের কাছেও রহস্যই ওর।

(২)

বাংলোতে পৌঁছবার আগেই গাড়িটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল আচমকা। ড্রাইভার এবং বাংলোর স্টাফ সমীর নামের ছেলেটি দুজনের মুখই দেখার মতো হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

“ম্যাডাম, বাংলো এখান থেকে পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিট। কিছু যদি মনে না করেন তো, এই পথটুকু হেঁটেই চলুন না। ভালোই লাগবে দেখবেন ম্যাডাম।”
ওদের কারোরই কোনও আপত্তি ছিল না, কিন্তু মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে তুলল সবাই।

“আপনাদের রাজত্বে এসেছি ভাই, মনে করেও তো কিছু উপায় নেই। যেভাবে নেবেন সেভাবেই যেতে হবে। ফিরে তো যেতে পারব না আর। অগত্যা… এই কই, নাম রে তোরা।”

সবাই ওরা একে একে নামল গাড়ি থেকে। ওরা মানে অর্চিতা, মধুরা, শ্রী, পৌলমী, গুঞ্জা আর বৃন্দা। কমলা গার্লস, ১৯৯০ সালের উচ্চমাধ্যমিক ব্যাচ। উচ্চমাধ্যমিকের আগে নিজেরা শপথ নিয়েছিল কেউ কাউকে ভুলবে না, যোগাযোগ রাখবেই। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইরকম শপথগুলোর যে পরিণতি হয়, সেটাই হয়েছিল। কলেজের চৌকাঠে পা দিয়ে আস্তে আস্তে যোগাযোগ ক্ষীণ হতে হতে একসময় একেবারেই নেই হয়ে গেল। কারণ অবশ্য একেকজনের একেক রকম– কলেজ আলাদা, শহর আলাদা আবার এক শহরে থেকেও হয়তো জাস্ট নতুন বন্ধুদের বৃত্তে মিশে যাওয়া। একমাত্র বৃন্দাই সকলের সঙ্গে অল্পস্বল্প হলেও যোগাযোগ রেখে গেছে। সবাইকে ফেসবুকে প্রোফাইল বানিয়ে যোগাযোগ করিয়েছে। গত একবছরে এরা আবার সেই স্কুল জীবনে ফিরে গেছে। একসাথে সিনেমা দেখা, শপিং, এর ওর বাড়িতে আড্ডা– হইহই করে চলছে সবকিছু। ওদের মধ্যে অর্চিতা আর পৌলমী কলকাতার বাইরে থাকে। তাই বলে আড্ডায় ছেদ পড়েনি। ছুটিছাটায় বাপের বাড়ি আসা আর স্কাইপের দৌলতে রি-ইউনিয়ন জমে গেছে। ওদের ছয়জনের এই কোর গ্রুপের বাইরের কিছু বন্ধুও এসেছে আস্তে আস্তে। সব মিলিয়ে এখন ওরা পুরনো সখ্যের মৌতাতে মশগুল। এবারের এই প্ল্যানটাও ওরই। বৃন্দার স্বামীর ক্লাব সূত্রে পরিচিত এক পার্শি দম্পতি এই বাংলোটির মালিক। ওরা কলকাতা থেকে রাঁচি এসেছে ট্রেনে, সেখান থেকে কেয়ার অফ শ্রীমান সমীর।

“এই যে ভাই, কী যেন নাম আপনার? জল-টল কেমন এখানে? মশা?” পাথুরে রাস্তায় নিজেকে সামলাতে অর্চিতা প্রশ্ন করল। “আমাকে সবাই মশা নিয়ে খুব সাবধান করেছে।”

“তোর বর তোকে তেল দিয়ে এত তোয়াজ করে রেখেছে, অর্চি ভয় নেই, মশা কামড়াতে গিয়ে পিছলে যাবে রে।” মধুরার কথার উত্তরে অর্চি ওর চুল ধরে এক টান দিল। সম্মিলিত হাসির ঝর্না ছড়িয়ে পড়ল নির্জন বুনো পথে।

“খুব খিদে পেয়ে গেছে, আশা করি খাবার রেডি পাবো?” বৃন্দা বলল।

“ওসব নিয়ে ভাববেন না ম্যাডাম। দাদা সকালে হাট থেকে টাটকা মাছ, মুরগি, আনাজ সব নিজে নিয়ে এসেছে। খুব নিঁখুত এই ব্যাপারে, দাদার আয়োজনে কমতি পাবেন না, দেখে নেবেন।”

“এই দাদাটি আবার কে রে বিন্দি?” গুঞ্জা কৌতুক মিশ্রিত চোখে।

“এখানকার ম্যানেজার, ইন্টারেস্টিং লোক নাকি, মরিয়মের কাছে শুনেছি। চল, কাল্টিভেট তো করবই, কীরম আয়োজন করেছে আমাদের জন্য একেবারে বুঝে শুনে নেব।” চোখ টিপে হাসল বৃন্দা এবং একে একে অন্যরাও।

“আসুন ম্যাডাম। এই দিকে।”

বড় লোহার গেটটা দিয়ে ঢুকে ওরা সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। মোরাম রাস্তা গেছে বাংলোর গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত। গাড়ি বারান্দার মাথায় মেরুন আর নীল কী একটা ফুলের ছাউনি। এপাশে ওপাশে কত গাছ, ওদের চেনার মধ্যে একমাত্র কিছু শাল আর নিমগাছ চোখে পড়ল। বাগানের দুইপাশে দেখা যাচ্ছে ধোঁয়া ধোঁয়া নীল পাহাড়ের ঢেউ। তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে কতগুলো পাখি উড়ে গেল এক গাছ থেকে অন্য দিকে। বাংলোর কম্পাউন্ডের সাদা কাঠের বেড়া ঘেঁষে সযত্নে লাগানো মরশুমি ফুলের গাছ, লতানো গোলাপ। লনে পাতা সাদা মার্বেল টপের টেবিল আর বেতের চেয়ার।

“নমস্কার, আসুন।” ওরা ঘুরে যাকে দেখল এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় সে মানানসই নয় একেবারেই। প্রায় ছ-ফুট লম্বা, সুঠাম, স্মার্ট এবং সুদর্শন– “শঙ্খশুভ্র মিত্র, এখানকার কেয়ারটেকার বলতে পারেন। আমি দুঃখিত ওভাবে গাড়িটা ব্রেকডাউন হল, তবে খুব দুঃখিতও নই, কারণ বনপাহাড়ের এক ঝলক যা পেয়ে গেলেন আপনারা এইটুকু হাঁটা পথে, নিশ্চিতভাবেই ভালো লেগেছে আপনাদের, আমি জানি।”

“বাবা রে, কথার কী ভাঁজ রে মধু।” পৌলমী ফিসফিস করে বলল মধুরাকে।

“আপনি তাহলে কি ইচ্ছা করেই ব্রেকডাউন করালেন নাকি? গেস্টদের এই স্পেশাল অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য?” খানিকটা তির্যক টানে কথাটা ছুঁড়ে দিল বৃন্দা।

“ছি ছি, কী যে বলেন। আরে আপনারা বাইরে কেন, আসুন। দীপা, ম্যাডামদের ঘর দেখিয়ে দাও আর খাবারের বন্দোবস্ত করো। ওঁদের খুব খিদে পেয়েছে অবশ্যই।”

যে যার মতো করে সবাই ওরা দেখল শুভ্রকে, তারপর বাংলোর ভিতর দিকে এগোল।

“আরে শ্রী, শ্রী কোথায় গেল?” অর্চিতার কথায় ওরা ফিরল আবার, ওদের দৃষ্টি গেল বাংলোর বাঁদিকের বাউন্ডারি ওয়ালের দিকে। ক্যামেরা হাতে শ্রী পাহাড়ের মুখোমুখি।

“ছবি তোলার অনেক সময় পাবি, শ্রী। এখন আয় তো।”

“আসছি,” বাংলোর দিকে ঘুরে শ্রীর চোখে পড়ল ম্যানেজার ব্যস্ত হয়ে গেছে মালির কাজের তদারকিতে।

তিনটে ঘরে ওদের ছয়জনের থাকার ব্যবস্থা। প্রতিটা ঘরের মধ্যে দরজা আছে, যেগুলো খুলে রাখলেই সব ঘর থেকে সব ঘরে যাওয়া যায়। মেহগনি কাঠের পালঙ্ক, কাঠের মেঝে আর দেওয়াল, দেওয়ালের কিছু অয়েল পেন্টিং, ঘরের কোণের ফায়ারপ্লেস, চেস্টউডের বেড সাইড টেবিল, ওয়ার্ড্রোব, বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না, মেঝেতে পা ডুবে যাওয়া কার্পেট– সর্বত্র পরিশীলিত রুচির ছাপ। ঠিক যতটা হওয়া দরকার, ততটাই। আতিশয্য বা অভাব, কোনোটাই নেই।

“এসব কার পছন্দ রে বিন্দি? মরিয়ম আর ওর বরের?” শ্রীর কথার জবাবে কাঁধ ঝাঁকাল বৃন্দা।

“মনে হয় না, শুনেছি সবই এই ম্যানেজারটিই দেখাশোনা করে।”

“ওর বউ-টউ নেই? এখানেই থাকে?” টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোতে বেরোতে গুঞ্জা জিজ্ঞেস করল।

“উফ, তোরা এমন ভাব করছিস যেন এই ম্যানেজার আমার সাত জন্মের পিরিতের লোক। আরে আমি অত থোড়াই জানি। যা না, জিজ্ঞেস কর।” বৃন্দা রেগেমেগে টয়লেটে ঢুকে গেল।

“দিলি তো রাগিয়ে?” নিজের ব্যাগ খুলতে খুলতে শ্রী গুঞ্জাকে বলল।

“থাম তো, না জেনে ও এসেছে নাকি? কেমন গিলছিল ছেলেটাকে চোখ দিয়ে, তুই তো দেখিসনি। বয়েস কেমন হবে বলতো আন্দাজ? আমাদেরই বয়সি, না রে?”

দরজায় নক করার শব্দে কথা থামাল ওরা। দীপা নামের মেয়েটি এসেছে। একহারা সুশ্রীহারা চেহারা, গায়ের রঙ যদিও বেশ কালো।

“আপনাদের খাবার রেডি দিদি। আসুন। দাদা বললো বাগানেই দিতে, ভালো লাগবে আপনাদের।”

“শোনো, তুমি এখানে কীভাবে এলে? তুমিই সমীরের বউ? আচ্ছা, তোমাদের এই দাদার বউ বাচ্চা নেই? আইবুড়ো নাকি?”

“দাদা একাই, ম্যাডাম। আপনারা আসুন, আমি যাই?”

“বাবা, দাদা দেখি একেবারে ম্যাজিক করে রেখেছে। দাদার কথায় সবার চোখ দিয়ে একেবারে ভক্তির বান ডেকেছে, খেয়াল করেছিস তোরা?” মধুরা হাসতে হাসতে বলে উঠল।

“এই বিন্দি, পলু তোরা আয়, আমরা বাইরে আছি রে। শ্রী, তুই ওদিকেরটায় যা না। সার চটপট, খিদে পায়নি নাকি?” অর্চিতা গুঞ্জা আর মধুরা বাগানের দিকে এগোল।

(৩)

বৃন্দা বসু, স্বামীর রিয়েল এস্টেট, এক্সপোর্টসহ আরও নানান ব্যবসা, দুই ছেলে। কলকাতায় তিনখানা বাড়ি, গাড়ি। পড়াশোনায় বরাবরের মিডিওকার বৃন্দা বন্ধুদের মধ্যে খুব পপুলার ওর ডানপিটে স্বভাব আর আদিরসের গল্পের অফুরান স্টকের জন্য। ছেলেরা বড় হয়ে যাওয়ার পর থেকে দুঃস্থ মেয়েদের জন্য তৈরি বেশ কয়েকটা এনজিও-র সঙ্গে ও যুক্ত। তবে ঠিক কীভাবে যুক্ত, সেটা বন্ধুরা বিস্তারিত জানে না।

অর্চিতা দত্তগুপ্ত, স্বামী ইন্ডিয়ান অয়েলের বড় কর্মকর্তা, একটাই মেয়ে। হলদিয়াতে বিশাল কোয়ার্টার। কলকাতাতে সল্টলেকে নিজেদের ফ্ল্যাট। অর্চিতা এক সময় থাঙ্কমণি কুট্টির স্কুলে নাচ শিখত। বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠান করতেও যেত। সেভাবেই একবার এক অনুষ্ঠানে ওকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় ওর শ্বশুরমশাই-এর। কলেজ শেষ হবার আগেই বিয়ে হয়ে যায় এবং যথারীতি নাচ এখন স্মৃতি হয়ে অ্যালবামের পাতায়।

মধুরা ব্যানার্জী, পড়াশুনায় অত্যন্ত ভালো, ফিজিক্সের অধ্যাপিকা কলকাতার এক কলেজে। স্বামীও একই কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক। চাকরি পাওয়ার পর আলাপ এবং তারপরে অঙ্ক ফিজিক্সের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মিষ্টি একটা সংসার– শাশুড়ি, শ্বশুর এবং ওদের দুটো যমজ মেয়ে। মধুরার নামের মতোই ওর স্বভাব খুব মিষ্টি, কখনও কারুর দোষ ও দেখতে পায় না। ওকে ভরসা করে কথা বলা যায়, তাই সবার খুব ভালোবাসার পাত্রী ও।

পৌলমী সাহা, আসানসোলে একান্নবর্তী পরিবারের মেজ বউ। আসানসোল শহরে ওদের পাঁচটা শাড়ির দোকান। অত্যন্ত অবস্থাপন্ন। কিন্তু একটাই দুঃখের, এত বছরেও মা হতে পারেনি। অনেক চিকিৎসা করিয়েও লাভ হয়নি, আপাতত প্রায় নিজের ওজনের সমান তাবিজ কবজ পরে ঘোরে। ছোটবেলা থেকে ওর আঁকার হাত খুব ভালো, এখন নিজেদের ব্যবসাতে অনেক শাড়ির ডিজাইন ও নিজে করে। সম্ভবত সন্তান না হবার কারণেই নানান কমপ্লেক্সের ডিপো হয়ে গেছে এবং সাঙ্ঘাতিক শুচিবায়ুগ্রস্ত।

শ্রী বসুঠাকুর, এই গ্রুপের মধ্যে সবচাইতে শান্ত, একটু নার্ভাস প্রকৃতির নরম সরম মেয়ে। মোটামুটি সবাই ওর ওপর গার্জেনগিরি ফলিয়ে আসে বরাবর। পড়াশুনাতে শ্রীও খুব ভালো ছিলো, কিন্তু একেবারেই কেরিয়ারমনস্ক ছিলো না। বিয়ে করেছিলো নিজের পছন্দে, দাদার বন্ধুকে। ব্যাংককর্মী স্বামীর সাথে হানিমুনে সিকিম গিয়ে ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে, নিজে ফিরলেও স্বামীকে ফেরাতে পারেনি। কমপেনসেশন গ্রাউন্ডে চাকরি পেয়েছে, কিন্তু সবসময় ডিপ্রেশনে থাকে। বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে সংসার, তাঁরা দিনরাত্তির শাপ-শাপান্ত করলেও বউমার উপর পুরোই নির্ভরশীল।

গুঞ্জা দাস, এদের সকলের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে কমজোরি, কিন্তু চেহারার চটকে সব চাইতে বেশি। উচ্চমাধ্যমিকের পরই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল পাড়ার এক ছেলেকে। ওর স্বামীর কলকাতায় এজরা স্ট্রিটে ইলেক্ট্রিকাল জিনিসপত্রের দোকান। একটাই ছেলে নিয়ে গুঞ্জার সংসার দমদমে, বাড়িতে ওর একটা বিউটি পার্লার আছে। বর্তমানে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ধারায় অবস্থান সত্ত্বেও পুরনো বন্ধুতার হাওয়া এদের সবাইকে নতুন করে মাতিয়ে দিয়েছে। নিজের নিজের সংসার, কাজ, দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে এই খুশির দিনগুলোর দিকে ওরা সবাই-ই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিল।

বাগানের লনে ছাতার নিচে বড় টেবিল ঘিরে ছ-টা চেয়ার। ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধে ওদের খিদে প্রবল হয়ে উঠল। ঘন ডাল, পোস্তর বড়া, আচার আর বনমুরগির ঝাল-ঝাল ঝোলে জম্পেশ হল ওদের দুপুরের খাওয়া। খাওয়ার পরে এঁটো হাতেই জমে উঠল আড্ডা, ম্যানেজারকে আসতে দেখে ছেদ পড়ল।

“তারপর বলুন, খাওয়া বা ব্যবস্থায় কোনও অসুবিধা নেই তো ম্যাডাম?”

“নাহ, ব্যবস্থা ভালোই।” মুখে কপট গাম্ভীর্য এনে পৌলমী জবাব দিল। সঙ্গে সঙ্গে খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ল অন্য সবাই।
ম্যানেজারকে কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ করে সেই হাসি মিশে গেল বনপাহাড়িয়া রোদ্দুর আর বাতাসে। আমলকী গাছ থেকে একঝাঁক টিয়া সেই হাসির ছোঁয়া নিয়ে উড়ে গেল পুরনো গির্জার দিকে।
শুভ্র ওদের বিদায় জানিয়ে এগোল বাংলোর গেটের দিকে। মিসেস ক্যাথি ব্রিগাঞ্জার বেকারি থেকে কেক আর ম্যাক্রুনস আনতে হবে। এ কাজটা ও সমীর বা দীপার ওপর ছাড়ে না পারতপক্ষে। ব্রিগাঞ্জাদের বাড়ির রাস্তা, ওদের বাংলোটা আর সর্বোপরি ব্রিগাঞ্জা দম্পতির সঙ্গে আড্ডা সহযোগে কফি খেতে ও খুব পছন্দ করে।
শুভ্রর অপসৃয়মাণ চেহারার দিকে তাকিয়ে ওরা তখনও হেসে চলেছে।

“আমাদের মতই বয়েস হবে সিওর। উমম… মানতেই হবে, হ্যান্ডসাম আর সেক্সিও বটে।” গুঞ্জার কথায় আবার এক দমক হাসির রোল উঠল।

“খুব সাবধান, গুঞ্জা, তোর ইলেকট্রিকবাবু কিন্তু শক ট্রিটমেন্ট না দিয়ে ছাড়বে না।” অর্চিতার কথায় গুঞ্জা ওর পিঠে এক কিল বসিয়ে দিল।

দুপুরের রোদ পড়ে এল পাহাড়ের গায়ে। বাংলোর বাগানে ঝরা পাতার উপর দিয়ে নিঃশব্দে চলা গিরগিটিটা খানিক থমকে হুড়মুড় করে লেবু গাছের দিকে চলে গেল।
নিজেদের ঘরে আয়নার সামনে বসে দীপা কুঁচফুলের তেল মেখে যত্ন করে চুল বাঁধল, সিঁদুর পরল। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা বরের গায়ে চাদরটা হালকা করে টেনে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে দেখল দিদিরা সবাই যে যার ঘরে চলে গেছে। টুকরো টুকরো কথা আর হাসির শব্দ উড়ে উড়ে আসছে।
নিজের গ্রামে ছেড়ে আসা বন্ধুদের কথা ওর মনে পড়ল। কত্তদিন দেখা হয় না ওদের সঙ্গে, গল্প হয় না। ওর হঠাৎ ইচ্ছে করে ইছামতীর ধারে বুড়ো বটের ঝুরি দোল খেয়ে ঝপ্পাস করে জলে লাফ দিয়ে পড়তে। কী জানি আবার কবে সে কপাল হবে ওর। রান্নাঘরের দিকে পা চালাল দীপা। অনেক কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

(৪)

গির্জার দিকের রাস্তাটা ধরে বেশ খানিকটা হেঁটে ব্রিগাঞ্জাদের বাড়ির কাছে শুভ্র যখন পৌঁছাল, ঠিক তখনই পাহাড়ের পেছন থেকে একটা মেঘ উঠে এল। বেশ কিছু শুকনো শাল, মহুয়ার পাতা উড়িয়ে একটা বাতাসও এল তার সঙ্গে। রাস্তার বাঁকে একটু থেমে রইল শুভ্র। চারপাশের এই মোহময় নির্জনতায় ও যেন ক্রমশ বুঁদ হয়ে পড়ছে। কে ও, কী ও, এখানেই বা কেন আছে ও, এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছেই বড় দ্রুত ফিকে হয়ে আসছে। যেন এই ছোটনাগপুরের পাহাড়, কোলিয়াড়ি, এই চট্টি নদী, এই ডেগাডেগির ঘাট, এই টিটি পাখির ঝাঁকের মতোই আজীবন ও এখানেই থেকে চলেছে, জন্মান্তর ঘটে গেছে কত না।

এখানে এসো না তুমি, এসো না এই স্বপ্নের বধ্যভূমিতে… শঙ্খিনী নদীটার ঢেউয়ে কান পাতো, শোনো কারা ডাকে, বলে ফিরে যাও, ফিরে যাও হে নাগরিক জীব, এ পথ তোমার তো নয়… মায়ায় পোড়ো না আর আমাদেরও বেঁধো না মায়ায়…

“হ্যাল্লো, ইয়াং ম্যান। কতদিন পরে এই বুড়োবুড়ির খোঁজ নিতে এলে বলো তো?”
অশীতিপর মিস্টার ব্রিগাঞ্জার ডাকে চমকে উঠলো শুভ্র। “স্যরি, স্যরি আঙ্কল, সত্যি অনেকদিন আসা হয়নি। আসলে একটু ব্যস্তও ছিলাম মাঝে। ব্যস্ত থাকার অভ্যেসটা তো চলে গেছে, তাই অল্পেতেই এখন ওই যাকে বলে ব্যতিবস্ত হয়ে পড়ি। কফি খাব, চলো।” “ওহ, সার্টেইনলি, ডিয়ার। এসো, এসো। তোমার আন্টি অনেকক্ষণ ওয়েট করে আছে তোমার জন্য।”
জমাটি আড্ডা আর দুই রাউন্ড কফির শেষে কেকের প্যাকেট হাতে শুভ্র যখন বাংলোর পথ ধরল, তখন আর সেই সন্ধ্যার মেঘমালার ছিঁটেফোটাও নেই। শিরশিরে হাওয়ার সঙ্গে দূরে কোলিয়ারির বস্তি থেকে আসা ধোঁয়ার গন্ধ মাদলের বোল আর বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে ও বাড়ি ফিরল। বাড়ির কথায় নিজের মনে হাসি এল ওর। বাড়ি নয়, ঠিকানা। প্যাশনফ্লাওয়ার লজ, কঙ্কা, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ।

“নমস্কার, আমি শ্রী, শ্রী বসুঠাকুর। আচ্ছা, এখন একটু বাইরে যাওয়া যাবে, মিস্টার মিত্র?”

“আমাকে স্বচ্ছন্দে শুভ্র বলে ডাকতে পারেন ম্যাডাম। নেহাত নিজের বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া, নইলে মিস্টার মিত্তির বলতে বঙ্গভূমে একজনকেই মনে পড়ে আমার, প্রদোষচন্দ্র মিত্র।”

“হা হা, তা ঠিক, তবে এটা তো ছোটোনাগপুর, বঙ্গভূম আর কোথায় হল, বলুন?” শুভ্র লক্ষ করল শ্যামলা মেয়েটির গালে টোল পড়ল হাসতে গিয়ে।

“ঠিক, একদম ঠিক। কিন্তু বাইরে যেতে চাইছেন? এখন না গেলেই ভালো হয় বুঝলেন? রাস্তাঘাটে বিশেষ আলো-টালো তো নেই, সাপখোপ, তক্ষক, পোকামাকড়– আপনারা তো অভ্যস্ত নন। সবে তো এলেন, সব ঘোরা হয়ে যাবে, নিশ্চিন্তে থাকুন। তা আপনার বন্ধুরা কই? ঘরে বুঝি? চা দিয়েছে তো আপনাদের?”

“ওরা সবাই ঘুমিয়ে কাদা। আমার আবার যখন তখন ঘুম আসে না, তাই ভাবলাম একটু ঘুরে-টুরে বেড়াই। হ্যাঁ, চা দিয়েছে দীপা। চমৎকার দার্জিলিং চা। এই ইন্টিরিয়রে কোথায় পেলেন এই জিনিস?”

“পেতে চাইলে এখনও কিছু জিনিস পাওয়া যায় ম্যাডাম। এ তো সামান্য চা পাতা। তা আরেক কাপ চলবে নাকি?”

বারান্দায় কোণের দিকে একটু এগোনোর সাথে সাথেই ঘর থেকে ভেসে এল বৃন্দার গলা।

“শ্রী, শ্রী-ই-ই জলদি আয়, আমরা বসছি।”

“ওরা উঠে পড়েছে, না গেলে আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে নেবে, জানেন।”

শ্রী-র কাঁচুমাঁচু মুখ দেখে হাসি পেল শুভ্রর, “নিশ্চয়ই, আসুন। ডিনারের সময় দেখা হবে।” টানা বারান্দার অন্য কোণে নিজের ঘরের দিকে ফিরল শুভ্র।

“শুনুন, একটা কথা।” ফিরে তাকাতে শ্রী হাসল, “শ্রী তো একটা ছোট্ট শব্দ, ম্যাডাম অনেক বড়। অকারণ ঝামেলা নেবেন না, বুঝলেন?” হেসে ফেলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল আবার।

কার্পেটের উপর পা ছড়িয়ে বসেছে গুঞ্জা, পৌলমী, মধুরা আর বৃন্দা। ভারী শরীর নিয়ে মাটিতে বসার রিস্ক নেয়নি অর্চিতা। পাশের বেতের সোফাতে আধশোয়া সে। শ্রীকে দেখে সবাই হইহই করে উঠল।

“ছিলি কোথায় রে? একটুও ঘুমাসনি, না?” মধুরা বলল। “সবার সঙ্গে থাক না, কী খালি ছিটকে বেড়াস।”

“আচ্ছা দিদিমণি, আপনার আদেশ শিরোধার্য। কোত্থাও যাবো না আর একা।” মধুরার পাশে বসে পড়ল শ্রী।

কাটগ্লাসের পাত্রে ড্রিঙ্কস তৈরিতে ব্যস্ত বৃন্দা। গুঞ্জা একটা কাচের বোলের মধ্যে বাদামের সঙ্গে মশলা মিশিয়ে ঝাঁকিয়ে চলেছে। পৌলমী আর অর্চিতা মোবাইলে কিছুর একটা ছবি দেখতে মশগুল। মধুরা উঠে ঘরের বড় লাইটটা নিভিয়ে দিল। হাল্কা সোনালি আলোটা ঘরে নেশার পরিবেশ এনে দিল নিমেষেই।

“শ্রী, নিবি তো? এরা কিন্তু সব রকম ব্যবস্থাই রেখেছে। আমিও তো এনেছি, সিঙ্গল মল্ট। হাবি দুবাই গেল লাস্ট মান্থ, তখন নিয়ে এসেছে, টেস্ট করে বলিস তোরা।” বৃন্দার কথায় পৌলমী আর অর্চিতা চোখ চাওয়াচাওয়ি করল।

“সেটা পরে হবে, এখন এটা নে। আমাকে কিন্তু কেউ এনে টেনে দেয়নি। আমাদের এতদিনের কাঙ্খিত একটা ছুটির জন্য আমি নিজেই দোকানে গিয়ে কিনে এনেছি, পলাশকেও আনতে বলিনি।” বৃন্দার দিকে একটা ব্রাউন রঙের পেপারব্যাগ এগিয়ে দিল মধুরা।
সক্কলে ঝুঁকে পড়লো ওরা এবং প্যাকেট থেকে জিনিসটা বার করে তুলে ধরল বৃন্দা, “হিয়ার কামজ, শ্যাম্পেন, ওড ট্যু আওয়ার মাচ অ্যাওয়েটেড বনভ্রমণ।”
সবার হাততালির মাঝে শ্রী বলে উঠল, “ঘোষণাটা আরেকটু ভালো হতে পারত কিন্তু বৃন্দাদেবী, শ্যাম্পেন না বলে একে যদি তুমি শ্যঁপ্যাঁ বলে ডাকতে।” হেসে উঠে ওকে সমর্থন করল মধুরা।

“উরিহ শালা, তুই এত কিছু জানিস কী করে রে পুচকি? লেবু জলের বাইরে গেছিস কোনোদিন?” শ্রীর গাল টিপে দিল গুঞ্জা।
আরেক প্রস্থ হাসির রোলের সাথে খোলা হল শ্যাম্পেন। নিজেদের পছন্দমতো অল্প বেশি যে যা পারল, নিল। হাতে ঘুরতে থাকল বৃন্দার তৈরি করে রাখা ড্রিংকসের গ্লাস, গুঞ্জার বানানো বাদামের চাট এবং দীপার গুছিয়ে দেওয়া আরও নানান ভাজাভুজি।
ঘরের বাইরের নীরব প্রকৃতি কান পাতল ওদের কথায়, ঝিঁঝির দল কনসার্ট থামাল। চট্টিনদীর বুক থেকে উঠে আসা হাওয়াটা প্রতিদিনের মতো আজও প্যাশনফ্লাওয়ারের বাগানে বেড়াতে এসে আটকেই গেল ইউক্যালিপ্টাস, সবেদা আর লিচুগাছের ডালে।

“মনে আছে পলু, সেই অরিন্দমের কথা? তোর পিছনে ঘুরে বেচারার স্লিপ ডিসক হয়ে গেছিল।” গুঞ্জার কথায় তাল দিল অর্চিতা, “বাবা, মনে থাকবে না ওর? কত্তদিন বাড়িতে আটকে ছিল পলু। কাকুর যা কড়া শাসন ছিল, আর দাদারও, বাবা রে। সব এক-একজন আর্মি জেনারেল ছিল যেন।”

“আমার কপালই অমনি। তখনও বাড়ি ভর্তি সব হিটলার, এখনও তাই। অথচ ওই সময়েই গুঞ্জা তো কতকিছু করে ফেলেছিস বল?” চোখ টিপে হাসল পৌলমী।

“প্রতি শনিবার স্কুল থেকে বেরিয়ে রাধামাধব মন্দিরের পিছনের ঘাটে গিয়ে কী করতিস রে গুঞ্জা?” অর্চিতা অনেক কষ্ট করে নিজেকে টেনে তুলতে তুলতে প্রশ্ন করল।

“কী করতাম, দেখবি? আয় তাহলে তোকে দেখাই এখন কী করতাম।” গ্লাস হাতে গিয়ে ওর উপরে ঝুঁকে পড়ল গুঞ্জা।

“এই কী যা-তা করছিস রে তোরা, ম্যানেজার দেখলে আর রাতে ঘুম হবে না তার।” বৃন্দা নতুন গ্লাস বানিয়ে আনল। “সেই সন্দীপকে মনে আছে তোদের? আরে ওই যে ডাক্তারবাবুর ছেলে। খুব পছন্দ করত আমাকে, পাত্তা না পেয়ে আজেবাজে কথা রটিয়েছিল। সে তো এখন বারুইপুরে আমাদের তৈরি একটা এম আই জি প্রজেক্টের ফ্ল্যাট কিনেছে ছশ স্কোয়ার ফিটের। কোন ওষুধ কোম্পানির ফেরিওয়ালা। এসেছিল আমার বরের অফিসে, ভেবেছিল যদি কিছু বেশি ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় আমার নাম করলে। হা হা, আমিও তেমন, ওকে বলে দিয়েছি, পারলে আরও কিছু হিডন কস্ট ঢুকিয়ে দাও। হা হা।”

“ইশ, কী রে তুই বৃন্দা, এসব করে নাকি? সে কোন কালের কোন ছেলেমানুষি, তার রাগ এতদিন পুষে রাখে কেউ? একটু যদি হেল্প করতিসও, কী হত এমন?” মধুরা বলল।

“বিজনেস এটা বুঝলি, এখানে অত মানবিকতা দেখাতে গেলে চলে না সোনা। এই শ্রী, ঘুমিয়ে পড়লি তুই? কী নিলি গ্লাসে তো পড়েই থাকল। এই ডাক তো ওটাকে।” দরজায় মৃদু শব্দে থেমে গেল গেল বৃন্দা। পৌলমী দরজা খুলে দেখল।

“দিদি, অনেক রাত হল। আপনাদের খাবার দেওয়ার কথা জিজ্ঞেস করতে বললো দাদা।”

“তোমার দাদাকে একটু কম চিন্তা করতে বোলো। উনি আমাদের গার্জেন তো নন, ডিসগাস্টিং।” হিসহিস করে বলে উঠল বৃন্দা।

“যাহ, এমন বলিস না। সত্যিই তো অনেক রাত হয়েছে। আমরা না খেলে ওরাই বা সব সারবে কখন?” মধুরা সামাল দিল। “যাও, তুমি খাবার সাজাও, আমরা আসছি।”

“আমি মরিয়মের কাছে রিপোর্ট করব, ব্লাডি ম্যানেজার। কায়দা বেশি যত।” বৃন্দার রাগ ওর নেশার মাত্রা বুঝিয়ে দিতে লাগল।

ওকে শান্ত করে, শ্রীকে ঘুম থেকে তুলে অন্যদের নিয়ে খাবার ঘরে এল গুঞ্জা আর মধুরা।
নরম রুটি, ফুলকপির তরকারি, স্যালাড আর ডিমের ডালনায় খুব ভালো করে রাতের খাবার সেরে আবার নিজেদের ঘরে ফিরল ওরা। জলপ্রপাতের মতো ঘুম নেমে আসছে সবার। অগত্যা যে যার বিছানায়।
বালিশে মুখ গুঁজে শ্রী শুনতে পেল মন্দ্র কণ্ঠে, “সে সুর বাহিয়া ভেসে আসে কার সুদূর বিরহবিধুর হিয়ার অজানা বেদনা, সাগরবেলার অধীর-বায়ে বনের ছায়ে…”

“ছেলেটা বেশ অন্যরকম, মানতেই হবে রে শ্রী।” মুখে ক্রিম মাখতে মাখতে বলল মধুরা।

“দেবব্রত বিশ্বাসের গান অনীকের খুব প্রিয় ছিল, জানিস।” টেবলল্যাম্পের আলো নিভিয়ে পাশ ফিরে শুল শ্রী।
বাইরের নিস্তব্ধ রাত কেঁপে গেল সকরুণ বেণুর সুরে যেন এ চরাচরের কত না বিজন হৃদয়ের অশ্রুত রাগিনী পাড়ি জমাল আকাশপারে তারার রাজ্যের দিকে পরিযায়ী স্বপ্নের খোঁজে।
কখনও শুনেছ কি নীরবের ধ্বনি, শিহরন লেগেছে কখনও একা আনমনে, বনছোঁয়া ঘুম কভু জড়িয়েছে দু-বাহুর ঘেরে? যদি তা না পাও তবে, ফিরে যাও, ফিরে যাও হে নাগরিক জীব, এ জগৎ তোমার তো নয়।
গান শেষ হলে বেতের চেয়ারটা নিয়ে কিছুক্ষণ জানলার পাশে বসে রইল শুভ্র। পাহাড়ের মাথায় আকাশ লাল হয়ে আছে, বৃষ্টি আসবে হয়তো। বাউন্ডারি বেড়ার বাইরে থেকে হঠাৎই একটা খাপু পাখি ডাকতে শুরু করল, খাপু-খাপু-খাপু-খাপু। একটা সাদা পেঁচা উড়ে এসে বসল ওর জানলার সামনে বড় চাঁর গাছটার ডালে। শুভ্রর মনে হল শরীর এবার বিছানা চাইছে। শুয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। জানলার বাইরে একা রাত জেগে থাকল মৌটুসী পাখির বাসায় বাচ্চাদের ঘুম এনে দিতে, আলো হয়ে ফুটে থাকা লাল-সাদা ঘাসফুলের এইটুক্কুনি বুকে মধু জাগাতে; নালার মধ্যে দিয়ে শুকনো পাতা মাড়িয়ে শিকার খুঁজে ফেরা শিয়ালের সাথে আর কুলি বস্তিতে জ্বলতে থাকা মশালশিখায়।

(৫)

“ব্রিটিশদের বিখ্যাত উন্নাসিকতা ও বিদ্বেষ ক্ষুব্ধ করে তুলছিল এদেশে বাস করা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের। এরকমই এক সময়ে আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকলাস্কি ছোটনাগপুর অঞ্চলের এক নাগবংশী রাজার কাছ থেকে দশ হাজার একর জমি লিজ নিলেন। নিয়ে এলেন ভাই-বন্ধু-স্বজনদের, তৈরি হল কলোনাইজেশন সোশ্যাইটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড, সালটা ছিল ১৯৩৩। পাট্টার মাধ্যমে জমি বিলিবন্টন হল। অসাধারণ উর্বরা জমি, যে ফসলই লাগানো হোক, ফলন প্রচুর, চমৎকার আবহাওয়া, সর্বোপরি ইংরেজদের দুচ্ছাই সহ্য করা নেই, তাই আস্তে আস্তে তৈরি হল ইংল্যান্ডের বাইরে এক লিটল ইংল্যান্ড। মিস্টার ম্যাকলাস্কির অকালপ্রয়াণের পর এই শহরের নাম হলো ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। ১৯৪০ সাল নাগাদ এখানে প্রায় শ-তিনেক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার বাস করতেন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ধনী। এঁরা এখানে ইংল্যান্ডের ধাঁচেই বাংলো বানালেন, বাগান বানালেন। এরকমই একটাতে আপনারা এবার অতিথি।” একটানা বলে একটু জল খেল শুভ্র। সকালের হালকা রোদ্দুর গায়ে মেখে মেয়েদের দল এসেছে ডেগাডুগি, মরিয়মের নির্দেশ মতো শুভ্রকেই গাইড হতে হয়েছে এদের।

“এই শুনছিস তোরা, ইতিহাসের ক্লাস হয়ে গেলে এদিকে আসিস। খাবারদাবারগুলো আনা হয়েছে, গতি কর এগুলোর।” স্বর উঁচু করে ডাকল বৃন্দা। গলা নামিয়ে বলল, “অসহ্য লাগছে ছেলেটাকে আমার। এই গুঞ্জা আর পলুকে দেখ একেবারে সেঁটে আছে যেন।”

“ও মা, তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন, বিন্দি? ভদ্রলোক কী সুন্দরভাবে বলছেন, দিব্যি তো লাগছে শুনতে।” হাঁটুর উপর মুখ রেখে একটু দূরে শুভ্র, গুঞ্জা আর পৌলমীর দিকে তাকিয়ে বলল শ্রী।

“এই তুই থাম তো। এসব এখন সার্চ করলে পেতে এক সেকেন্ডও লাগে না। যত চালবাজি।”

“হা হা, কিন্তু বিন্দি, ও কী বলছে যে ও ম্যাকলাস্কি সাহেবের নাতির নাতি। ও নিজেও হয়তো গুগল করেই জেনেছে বা এখানকার লোকাল লোকদের কাছে থেকে। চালবাজি কীসের দেখলি তুই আবার?” পাঁউরুটিতে পেয়ারার জ্যাম লাগাতে লাগাতে বলল মধুরা।

“বাবাহ, তোরা সবাই দেখি এক্কেবারে এর প্রেমে পড়ে গেলি। ভালো, বসে বসে লেকচার শোন, আমি দেখি আবার অর্চি মুটি কোথায় গেল। কোন সাঁওতালি আবার কী করে দেবে, তখন আরেক ম্যাও সামলাও। অর্চি-ই-ই, কোথায় গেলি মা জননী আমার?” বৃন্দা অনতিদূরের জঙ্গলের দিকে এগোল।

“এর মিডল-এজ ক্রাইসিস শুরু হয়ে গেছে মনে হয় রে, মধু। সবসময় কেমন খিটখিট করছে দেখ।” বৃন্দার যাওয়া দেখতে দেখতে বলল শ্রী।

“শুনলে না, তোমাকে দেবে এক্কেবারে, হি হি। যা, ডাক ওদের।”

শতরঞ্চি ছেড়ে উঠল শ্রী, খালি পায়েই এগোল ওদের দিকে। “বাকি গল্পটা খেতে খেতে শুনবি আয়। শুভ্র, আপনিও আসুন, প্লিজ।”

“আমি কিন্তু ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়েছি।”

“আরে এক কাপ কফি অন্তত খান। ভয় নেই আমরা কিছু মিশিয়ে বশীকরণ করে দেব না।” মুখ টিপে হেসে বলল পৌলমী।

“অভয় দিচ্ছেন যখন, তাহলে বসি, করুন কফি।”

“হা হা, আপনি কিন্তু খুব সুন্দর করে কথা বলেন।” মধুরার কথায় একটু লাজুক হাসল শুভ্র।

“দেবব্রত বিশ্বাস শুনতে ভালো লাগে আপনার?” কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে শুভ্রুকে জিজ্ঞাসা করল শ্রী।

“কিছু জিনিস, ম্যাডাম ভালোলাগা ছাপিয়ে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বুঝলেন। সেরকমই বলতে পারেন। নিন, আপনারা সেরে নিন, আমি ওদিকটায় আছি।” কফি হাতে নিয়ে নদীর দিকে কিছুটা নেমে গেল শুভ্র।

সামনের ঝোপের দিক থেকে বেরিয়ে এল অর্চিতা আর বৃন্দা, “উফ, এই অর্চিকে নিয়ে আর পারা যাবে না। আগের জন্মে মালটা নির্ঘাত ছাগল ছিল। যেখানে যাবে, গাছ-গাছালি জড়িবুটি নিয়ে পড়বে।” হাঁফাতে হাঁফাতে বলল বৃন্দা।
শতরঞ্চির উপর ধপাস করে শরীর ফেলে দিল অর্চিতা, “আরে এগুলোকে নিশিন্দা বলে। বেটে বড়ি করে খেলে টামি ফ্যাট ঝরে যায়।”

“আচ্ছা, আচ্ছা, তুই খাস’খন। এখন ঠিক কর, নাহলে আমাদের এতজন প্লাস আরেকজনের নজরে তোর অন্যকিছু ঝরে যাবে।” অর্চিতার খসে পড়া আঁচল আর বিভাজিকার দিকে ইশারা করে বলল পৌলমী।
হাসির রোলে একটু বিরক্তই লাগল শুভ্রর। কোনও কোনও সময় প্রকৃতির কাছে এসে যে একটু চুপ করে থাকতে হয়, একথা অধিকাংশ মানুষই কেন কে জানে, বোঝে না। আবার পরক্ষণেই মনে হল, শহুরে জীবনে হয়তো এই হাসি এদের কাছে অধরা থাকে। থাক, হাসুক, বলুক কথা।
“১৯৪৭-এর পর ব্রিটিশরা এদেশ থেকে চলে গেল যখন, তখন এঁরাও দোটানায় পড়লেন। অনেকেই এখানে থাকাটা আর নিরাপদ মনে না করে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে লাগলেন। এভাবেই আস্তে আস্তে এখানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারের সংখ্যা খুবই কমে গেল, যাঁরা থেকে গেলেন, তাঁদেরও নতুন প্রজন্ম এখানে না থেকে বাইরে চলে যাওয়াই পছন্দ করলেন। বাংলোগুলি হস্তান্তরিত হল অভিজাত বাঙালিদের কাছে। কালক্রমে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা জাতীয় আবশ্যিক পরিকাঠামোর অভাবে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ একটা দুঃস্থ বসতি হয়ে গেল। সামান্য ক-জন পুরোনো অধিবাসী নিয়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ ভাঙা স্বপ্নের ইতিহাসের একটি নিদর্শন হয়ে রইল।” শুভ্রর কথায় কথায় ওরা এসে পৌঁছাল রেলস্টেশনে।
ছোট্ট, নির্জন রেলস্টেশন। শাল, মহুয়ার পাতায় ছেয়ে আছে। ওদের খুব ভালো লাগলো জায়গাটা।

“রেললাইনগুলো দেখ, কী পরিষ্কার! শুয়ে থাকা যাবে।” মধুরার ডাকে ওরা সবাই রেললাইনে নামল। বেশ কিছুক্ষণ রেললাইন ধরে হাঁটাহাঁটি করল। রেললাইনের পাশের নানা রঙের ল্যান্টেনার ঝোপ থেকে ফুল তুলে এ ওর মাথায় লাগাল। শ্রী সকলের ছবি তুলল। শুভ্রর কাছে অনুরোধ এল গ্রুপ ছবি তুলে দেওয়ার।
কিছুক্ষণ পরে রেলস্টেশনের একটামাত্র ঝুপড়ি দোকানের পাশে একটা বেঞ্চে সবাই বসল ওরা চা খেতে।

“এই দোকানটার সুবলদার। আজ সুবলদা নেই, মনে হয় হাটে গেছে। বৌদি আছে, বৌদি এনাদের একটু গরম শিঙাড়া আর জিলিপি খাওয়াবেন নাকি?” শুভ্রর কথায় হাসিমুখে সম্মতি জানালেন দোকানের মালকিন।
ওদের ওখানে ছেড়ে শুভ্র এল স্টেশনের অন্য দিকটায়। জনমানবহীন পথ স্টেশন থেকে বেরিয়ে চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। এই রাস্তাটা খুব প্রিয় শুভ্রর। দিনের বেলাতেও ঝিঁঝির ডাক আসছে সামনের ঝোপঝাড় থেকে। ঝুরো শালফুলে ঢাকা স্টেশনের বেঞ্চে বসে একটা সিগারেট ধরাল শুভ্র। পাশের ঝোপ আলো করে ফুটে থাকা বনচলিতার ঝিম ধরা গন্ধ, শাল আর চিরঞ্জীর জঙ্গলের থেকে আসা বাতাস আর ওই ঝিঁঝির ডাক– থেমে থাকা সময়ের আচ্ছন্নতা বুঁদ করে ফেলছিল ওকে।
পিয়ালের পাতাঝরা পথ, তোমাকে কি ডেকেছে সুদূরে? ধরা দিও না, দিও না হে… ওই পথ প্রহেলিকা… কোথা থেকে হারাবে কোথায়… সঞ্চয়ী পালকে দেবে আকাশের ঘ্রাণ… কী হবে তোমার, বলো, তবে…

“এবার তো ছ্যাঁকা লাগবে।” চমকে উঠে শুভ্র দেখল, বৃন্দা, হাতে একটা শালপাতায় শিঙাড়া আর জিলিপি, “নিন ধরুন।”

“ধন্যবাদ, এর কোনও দরকার ছিল না ম্যাডাম।”

“বৃন্দা, আমার নাম বৃন্দা।” শুভ্রর পাশে বসে পড়ল ও। “কতদিন আছেন এখানে?”

“বছর তিনেক। এখন তো মনে হয় জন্ম জন্মান্তর থেকে।”

“তার আগে?”

“অনেক জায়গায়।” হেসে উঠে পড়ল শুভ্র, “আমি পরিযায়ী মানুষ। চলুন এবার এগোনো যাক।”

“ওহ, আমার কোম্পানি পছন্দ হল না, তাই তো? অন্যদের সঙ্গে তো দিব্যি গল্প করছিলেন।”

“আপনারা সবাই আমাদের অতিথি। ওরকম আলাদা ভাবার কোনও কারণ নেই, প্লিজ। আসুন।”
স্টেশন থেকে বেরিয়ে ওরা দেখল সেন্ট জন চার্চ, ডন বস্কো স্কুল, সমন্বিত মন্দির-মসজিদ আর গুরুদুয়ারা এবং জাগৃতি। এখানকার সাধারণ মানুষদের শিক্ষা ও পরিবেশসচেনতার জন্য তৈরি এই জায়গার পরিবেশ ওদের মুগ্ধ করল।

“এবার কোথায় যাব আমরা?” জিপে উঠতে উঠতে প্রশ্ন করল পৌলমী।

“এখানকার কিছু সুন্দর বাংলো দেখবেন?”

“অন্যের বাড়ি দেখে কী করব? তার থেকে ফিরে যাই। লাল-লাল ধুলোতে চুলগুলো কী হয়ে গেছে। শ্যাম্পু করতে হবে।” অর্চিতা বলে উঠল। কিন্তু অন্য সকলের সমস্বরে আপত্তির কারণে ওরা চলল বাংলো দেখতে।
পটার সাহেবের বাংলো, মিলার সাহেবের বাংলো, পারকিনস সাহেবের বাংলো এবং গর্ডন সাহেবের বাংলো দেখে ওরা ফিরল যখন, সকলেরই খিদেতে পেট চুঁই চুঁই করছে।
বিকালে আবার বেরোনোর ইচ্ছে কিনা জানতে চাওয়ায় দল ভাগ হয়ে গেল। শেষ অবধি শুভ্রর প্রস্তাবে ঠিক হল বাংলোতেই ব্যবস্থা হবে বনফায়ার আর আদিবাসী নাচের। ওদের বাংলোয় রেখে শুভ্র আবার বেরোল সেসবের আয়োজনে।

(৬)

খাওয়াদাওয়ার পর একটু গড়িয়ে শ্রী বেরোল ক্যামেরা নিয়ে। বাংলার আশেপাশের গাছপালা, ফুলের ঝোপ, কাঠবেড়ালির ছবি তুলতে তুলতে ওর খেয়াল হল ও চলে এসেছে বাংলোর এক্কেবারে পিছনের দিকটায়। এদিকে রয়েছে কুয়োতলা, রান্নাঘর এবং তার লাগোয়া সমীর-দীপার থাকার জায়গা। টানা লম্বা বারান্দার একদিকে কাঠকুটো রাখা রয়েছে সম্ভবত ওই বনফায়ারের জন্যই। বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা আসতে গিয়ে ওর পা থমকে গেল। বারান্দার কোণের দিকের সমীর-দীপার ঘরের বাইরে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে পৌলমী। ওর লাল হয়ে যাওয়া মুখে ঘাম, নিঃশ্বাসের সঙ্গে ঘনঘন ওঠা পড়া করা বুক এবং পুরো শরীরের ভঙ্গিমায় যা বোঝার বুঝতে অসুবিধা হল না শ্রীর। কী করবে, ওকে ডাকবে নাকি চুপচাপ চলে যাবে এসব ভাবতে ভাবতেই পৌলমী চোখ ফিরিয়ে দেখে ফেলল ওকে। কাছে এসে একটা অদ্ভুত রকমের আমিষ হাসি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে বললো, “জানলা খুলেই…”

“ঘরে চল, পলু।” ওকে ডেকে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল শ্রী।

“যাচ্ছি, যাচ্ছি, তুই যা।” বলে আবার পিছন ফিরল পৌলমী।
ঘরে ফিরে শ্রী দেখল বিছানা দখল, মধুরা আর অর্চিতা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পাশের সোফায় গুঞ্জা শুয়ে শুয়ে নেলপলিশ রিমুভ করছে।

“ছবি হল?”

“হ্যাঁ, মেটে খরগোশ দেখলাম জানিস? বাগানের পিছনে গর্ত আছে। তুই দেখেছিস কখনও?”

“নাহ, দেখিনি। তা আর কীসের ছবি তুললি? কীসের বলব না কার বলব?”

“সে তো আপনার মুখ ম্যাডাম, যা খুশি বলবেন। আমার কান, যা ইচ্ছে হবে না শুনব না।”

“আরিব্বাস, অনেক কথা শিখেছে তো আমাদের পুঁচকি! তা, হ্যাঁ রে, তুই এভাবেই থাকবি? ওই বুড়োবুড়ির বাতের ওষুধ, ডালকোলাক্স আর ইনহেলার কিনবি আর গালাগালি শুনবি? নতুন কিছু ভাববি না?”

“অন্তত এঁরা যতদিন আছেন, ততদিন তো নয় রে। আমি ছাড়া এঁদের আর কেউ নেই। আর বকাবকি করলেও ওঁরা কিন্তু আমাকে ভালোওবাসেন। আমারও তো বাবা-মা চলে যাওয়ার পরে সেভাবে কোথাও যাওয়ার নেই।”

“কিন্তু বয়েসটা কী থেমে থাকবে? নিজের যত্নও তো করিস না। স্কিনে পুরো ট্যান পড়ে গেছে। শোন, মাসে দুটো রবিবার আমার পার্লারে আসবি, আমি ঠিক করে দেব। মাসাজও করিয়ে দেব, একটা নেপালি মেয়ে আছে, দারুণ করে।”

“হুম, দেখি। বিন্দি কই রে?”

“ওই ঘরে, একা একটা বিছানা নিয়ে ঘুমাচ্ছে।” মুখ বেঁকিয়ে বলল গুঞ্জা।

“তা তোরা কেউ যাস নি কেন? ও কি বারণ করেছে?” শ্রী হেসে বলল।

“আরে ওর সাথে শোয়ার রিস্ক আছে, জড়িয়ে-টড়িয়ে ধরে। ওর ব্যাপার-স্যাপার একটু অন্যদিকে টার্ন নিচ্ছে মনে হয়। অর্চি বলছিল। পলু আমার সাথে শুয়েছিল, আমি উঠে দেখি নেই। ভাবলাম এ ঘরে আছে, তাই এলাম।”

“আমিও একটু বেরিয়েছিলাম। দীপাকে ডেকে চা দিতে বলে এলাম।” পৌলমী ঢুকে শ্রীর দিয়ে তাকিয়ে আবার সেই হাসিটা হাসল।
শ্রী জানলার ধারে এসে দেখল অন্ধকার হয়ে আসছে। বাইরে বাগানে শুভ্র বনফায়ারের তদারকি করছে। মধুরা এসে ওকে চায়ের কাপ দিয়ে গেল।
নিজের ঘরে ঢুকে ইজিচেয়ারে একটু শুল শুভ্র। অনেকদিন পর আজ বেশ খাটনি গেল সারাদিন। একটু গরম জলে স্নান করে নিলে ভালো হত, কিন্তু আলসেমি করে আর উঠল না। প্রতিদিনের মতো আজও সূর্য পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে নামল, সন্ধ্যাতারা ফুটল, জোনাকির আলোয় ম্যাকলাস্কিগঞ্জে সন্ধ্যা এল শুভ্রর চোখে অসময়ের ঘুম নিয়ে।
বাংলোর বাগানে বনফায়ার শুরু হল। মাদল আর আদিবাসী মেয়েদের ঝুমুরের শব্দে নিঃস্তব্ধ রাতের শিরায় যেন অনেকদিন পরে উষ্ণ রক্তসঞ্চালন হল। ঝিঁঝির ডাক ঘন হল, ওদের হাতে হাতে কাচের গ্লাসের সোনালি রঙ ছলকাল। চড় চড় করে পুড়ল শুকনো কাঠ-পাতা।

“বুকগুলো দেখছিস এদের, কী দারুণ শেপ! আর আমাদের কী অবস্থা, ইশ।” আক্ষেপ ঝরে পড়ল অর্চিতার।

“দিনরাত বর নিয়ে পড়ে থাকলে ওই হবে। একটু পরপুরুষ সঙ্গও কর, বুঝলি?” বৃন্দা চোখ টিপল।

“তুই করছিস বুঝি?” অর্চিতা বুঝতে পারল বৃন্দার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।

ওদিকে মধুরা আর গুঞ্জা মেয়েগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কী সুন্দর নাচছে। ওরা নাচ জানল কোথা থেকে কে জানে। নাচের কথা ভাবলে ওর এখন মনে হয় গতজন্মের কথা।
পৌলমীকে দেখা গেল দীপার সঙ্গে কোনও গভীর আলোচনায় মত্ত। শ্রী মাদলের তালে মৃদু হাততালি দিচ্ছে আগুনের কাছে দাঁড়িয়ে। বৃন্দাকে ছেড়ে অর্চিতা ওদের কাছে গেল। মধুরা ইশারায় ওকে ডাকল নাচার জন্য। ও শ্রীকে জোর করে টেনে নিয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিল।

“তুমি খুনি, তুমি খুনি… আমার মেয়েটাকে শেষ করেছ তুমি, ইচ্ছে করে, আমি জানি, ইচ্ছে করে। অ্যাক্সিডেন্ট হল, তোমার কিছু হল না, যমের অরুচি তুমি, আমার মেয়েটা মরে গেল? কেন, কেন, কেন করলে তুমি এটা বলো বলো বলো…” চমকে ঘুম ভাঙে শুভ্রর। আবার এই দুঃস্বপ্ন। উফ্, এর থেকে কি আর পরিত্রাণ নেই? আজ এতগুলো দিন পুরোনো জীননের থেকে দূরে থেকেও এই স্বপ্ন ওকে তাড়া করে ফেরে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সিয়াটেলেই সেটল করে গেছিল শুভ্র। একা, বিন্দাস জীবন। বিয়ে করার কোনো প্ল্যানও ছিল না, কোনো মেয়েও কোনোদিন আসেনি জীবনে। তবে অলক্ষে কে কলকাঠি নাড়ে তো কিছুই বোঝা যায় না। সহকর্মী বন্ধু প্রবালের আকস্মিক ধরা পড়ল ব্রেন ক্যান্সার, এমনই স্টেজ যে ওদেশের ডাক্তারও জবাব দিয়ে দিলেন। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ জীবনের দিশা পালটে দিল শুভ্রর। বিদেশ-বিভুঁইতে দিশাহারা প্রবালের ওর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মৌসুমীকে বিয়ে করার প্রস্তাব, তাকে ডিভোর্স দেওয়া, নিজে উপস্থিত থেকে শুভ্রর সঙ্গে মৌসুমীর রেজিস্ট্রি ম্যারেজ, প্রবালের মৃত্যু, মিষ্টির জন্ম, একটু একটু করে বড় হওয়া– সব যেন ঝড়ের বেগে ঘটে গেল। মৌসুমী ওকে কখনোই অ্যাক্সেপ্ট করেনি, শুধুমাত্র একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট যেটা না হলে ও আর ওর বাচ্চাটা অসুবিধায় পড়ত, সেই হিসেবেই দেখে এসেছে। শুভ্রর আকর্ষণ ছিল মিষ্টি– আঙুল ধরে ওকে হাঁটতে শেখানো, উইক-এন্ড-এ বাড়ির সামনে দুজনে মিলে খেলা, কাছের লেকে ফিশিং করতে যাওয়া, ছোট্ট মেয়েটার বাপি-বাপি ডাকে ওর মনে হত জীবন থেকে আর কিছু চাওয়ার নেই যেন। হঠাৎ একদিন মৌসুমীর মনে হল মিষ্টি ওর থেকে শুভ্রকে বেশি পছন্দ করছে, তারপর থেকে ও মিষ্টির ব্যাপারে খুব সচেতন হয়ে গেল। শুভ্রর কাছে মিষ্টিকে বেশি যেতে দিত না বা মিষ্টির কাজ কিছু শুভ্রকে করতে দিত না। শুভ্র, মিষ্টি দুজনেই এর প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু সেই থেকে নানান অশান্তির সূত্রপাত ছাড়া আর কিছু হয়নি। এরকমই একটা টালমাটালের দিনে মৌসুমি গেছিল একটু দূরের বাজারে, মিষ্টি এসে তার বাপির কাছে আবদার করে চুপি চুপি একটা ড্রাইভে ঘুরে আসার। শুভ্রও কালবিলম্ব না করে গাড়ি বের করে বেরিয়ে পড়ে। এরপর সেই চরম বিপর্যয়, অ্যাক্সিডেন্ট, মিষ্টির চলে যাওয়া– এক চূড়ান্ত অভিযোগ, অপমানের মুখে খাড়া করে দিল শুভ্রকে। মৌসুমী সরাসরি শুভ্রকে অভিযুক্ত করে, তারপর নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশ কেস, চাকরি যাওয়া, বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ড। দেশে ফিরে আসে শুভ্র। আর তারপরই যোগাযোগ হয় সরফরাজ আর মরিয়মের সাথে। ম্যাকলাস্কিগঞ্জে ওদের বাংলোর দেখাশোনা করে এখানেই থেকে যাওয়ার প্রস্তাব ও প্রায় লুফেই নেয়। কিন্তু এখনও ওকে তাড়া করে বেড়ায় মিষ্টির নিথর মুখ, মৌসুমীর উদ্যত আঙুল।
ইজিচেয়ার থেকে উঠে চোখেমুখে জল দিয়ে বারান্দায় এসে শুভ্র দেখল বনফায়ার প্রায় শেষের মুখে। আগুনের তাপে ওদের সকলের মুখ অন্যরকম লাগছে। যদিও খুব একটা শোভন হবে না, কিন্তু তবুও আজ আর ওদের সঙ্গ দিতে ইচ্ছা করল না ওর। সমীরকে ডেকে এক কাপ কফি দিতে বলে স্নান করতে গেল ও। বেরিয়ে কফি নিয়ে নিজের বারান্দাতেই বসল ও। শরীর মনে বড্ড অবসন্ন লাগছে ওর। এরকম ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ও বরাবর উপশম চেয়ে এসেছে রাতের কাছে, নির্জনতার কাছে। প্রেয়সীর মতো এ যেন ওকে ঘিরে রাখে, নির্জনতার স্তনসন্ধিতে মুখ রেখে নিজেকে শান্ত করে শুভ্র।

(৭)

বনফায়ারের পর ঘরে ফিরে ওরা দেখল বৃন্দা একা বসে আছে, একহাতে গ্লাস, অন্যহাতে সিগারেট। “এসেছিস তোরা। উফ্‌, এই মেয়েগুলোর গায়ের যা গন্ধ, তোরা আবার নাচ করতে লাগলি, মাইরি।” ওর চোখ-মুখ অস্বাভাবিক। গুঞ্জা আর পৌলমীরও প্রায় একই অবস্থা, মধুরা আর শ্রী ওদের ধরে ধরে এনেছে। অর্চিতা একটু কম বেসামাল। সে নিজেই আসতে পেরেছে।
ওদের বসিয়ে দিয়ে মধুরা বলল, “কতবার বললাম, বুঝে খা, যা নিতে পারবি না, খাস না, শুনলি না।”

“আহ, তোর দিদিমণিগিরি তোর কাছে রাখ তো। আমরা তোর কলেজের খুকি নই।” গুঞ্জা বলে উঠল।

“ঠিক ঠিক, মাল খাব বলেই এসেছি এখানে, খাব না? তোদের মতো ন্যাকাপনা আমার পোষায় না।” পৌলমী সোফার উপর নিজের শরীর ছেড়ে দিল।

“এই বিন্দি, কাউন্টার দে।” বলে অর্চিতা ওর পাশে গিয়ে বসল।

“কাউন্টার খাবি, কেন? আস্তই খা তুই। কত বড় অফিসারের বউ, অন্যের এঁটো কাউন্টার খাবি কেন? নিজে এক প্যাকেট কিনেও তো আনতে পারতি। সত্যি চিরকালের কিপটে থেকে গেলি তুই।” বৃন্দা জড়ানো গলায় বলল।

“আমি কিপটে? তা ঠিক, তোর মতো লোক দেখানো কাজ করি না বলে আমি যদি কিপটে হই তো তাই সই।” অর্চিতার মুখে বিদ্রুপের হাসি।

“বিন্দি, তুই ব্যবস্থা করেছিস বলে এমন বলছিস কেন? আমরা সবাই তো সমান কন্ট্রিবিউট করেছি। তুই একা তো করিসনি।” গুঞ্জা বৃন্দার সামনে এসে বলল।

“তা করেছিস, তবে তোর টাকাটা বার করতে আমার গাড়ির তেল আর ফোনের বিল প্রায় ওই কন্ট্রিবিউশানের মতোই পড়ে গেছে।” বৃন্দা উত্তর দিল।

“তোরা এসব কী শুরু করলি, অসভ্যের মতো ঝগড়া? প্লিজ থাম।” শ্রী একটু গলা তুলে বলল।

“এই আরেক গার্জেন এলেন।” পৌলমী বলে উঠল, “বেশ করেছে গুঞ্জা, অত কীসের দেমাক রে বৃন্দা? টাকা কি তোর একারই আছে, একবার আমার ওখানে এসে দেখিস আমার তোর থেকে কিছু কম নেই। তোর মতো শো অফ করার রুচি নেই আমাদের।”

“হ্যাঁ, জানি তো, তোর অনেক টাকা আছে, ইম্পোটেন্ট বর আছে, প্রক্সি দেওয়া ভাসুর আছে, সব জানি। আমার হাজব্যান্ডের আসানসোলে অনেক চেনাশোনা আছে। সবই জানি।” বৃন্দা শ্লেষ মিশ্রিত গলায় উত্তর দিল।

“আমার অসহ্য লাগছে তোদের এই নোংরামো। আমি বাইরে যাচ্ছি।” বলে দরজার দিকে পা বাড়াল শ্রী।

“হ্যাঁ, আমরা তো নোংরাই। তুই, যা ওই নিমাইচাঁদের সাথে ঢলাঢলি করগে।” পৌলমী হা হা করে হেসে বলল।
মাথায় আগুন জ্বলে গেল শ্রীর, “পলু, এত বিশ্রী কথা তোর মুখে মানায় না, কী করছিলি দুপুরবেলা দীপাদের ঘরের বাইরে, বলব আমি?”

“হ্যাঁ, বল না, বেশ করেছি, ওদের সেক্স করা দেখেছি। পোয়াতি মেয়ে কী করে সেক্স করে দেখেছি, বেশ করেছি।” হিসহিসিয়ে বলল পৌলমী।

“ছিঃ পলু, এই তোর রুচি?” হেসে বলল বৃন্দা, “এই রুচির আবার বড়াই, মাই ফুট।”

“আরে ও তো শুধু দেখেছে, তোর মতো তো এনজিও-র নাম নিয়ে মধুচক্র চালায় না, বা জিগোলো ডেকে হোটেলে তোলে না, বিন্দি। শোন তোর খবরও সব জানা আমার। মুখ খোলাস না।” গুঞ্জার কথা শেষ হতেই সপাটে ওর গালে একটা চড় কষাল বৃন্দা, “ইয়্যু বিচ, চার মাস আগে নেওয়া টাকাটা কলকাতায় গিয়েই ফেরত দিবি আর কোনোদিন গা দেখানো ব্লাউজ পরে আমার বরের অফিসে গেছিস শুনলে দেখিস কী করি।”

“তা তোর বর, ওর গা দেখেই বা কেন? তোর সব কিছু কি অন্যে খেয়ে ফেলেছে? পরপুরুষ?” অর্চিতা হেসে উঠে বলল।

মধুরা চোখ বন্ধ করে বসেছিল এতক্ষণ। এবার বলল, “আমার অবাক লাগছে, এই ছুটি কাটানোর জন্য আমরা এলাম এখানে? শ্রী তুই ডিনার করবি? গেলে চল, আমি যাচ্ছি।” ও বেরিয়ে গেল। শ্রীও গেল ওর সঙ্গে।
“সব বেইমানের দল, আমার তোদের সাথে প্রোগ্রাম করাই ভুল হয়েছে। তোদের সাথে আমার আর লেভেল মেলে না, সব কুয়োর ব্যাঙ।” বৃন্দাও বাইরে বেরিয়ে এসে বারান্দার অন্য দিকে হাঁটা লাগাল।
একটা চড়া গন্ধ হঠাৎই নাকে এসে লাগল শুভ্রর। ঘাড় ঘুরিয়ে এক ছায়াশরীর দেখতে পেল ও, বৃন্দা। “এই যে মিস্টার ম্যানেজার, আপনার এই চাকরগুলোকে বলুন তো স্কচ দিতে আর চিকেন নাগেটস করে দিতে বলুন।”
শুভ্র দেখল বিস্রস্ত কাপড়ের আঁচল মাটিতে, হাতে গ্লাস, বৃন্দার পা টলছে। যে কোনও সময়ে কাপড়ে পা আটকে পড়ে যেতে পারে সে। ওর হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে টেবিলের উপর রেখে ওকে চেয়ারে বসাল শুভ্র। ওর উদ্ধত বুক ছুঁয়ে গেল শুভ্রর শরীর, মুখের কাছে মুখ এনে বৃন্দা বলল, “এক পেগ, আর এক পেগ, প্লিজ, দিতে বলো, প্লিজ বলো।”
“আপনি যথেষ্ট নিয়েছেন ম্যাডাম, আর নয়। তাছাড়া ওরা কিচেন বন্ধও করে দিয়েছে। চলুন আমি আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”

“কল মি বৃন্দা, বৃ-ন্দা, কি সেক্সি নাম না আমার? প্লিজ একটা পেগ অ্যারেঞ্জ করে দাও।” শুভ্রর জামা খামচে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল বৃন্দা, হাতটা টেনে নিজের বুকের উপর ধরল, “দেখো কেমন অস্থির লাগছে, খুব অস্থির, প্লিজ হেল্প মি, প্লিজ।”

নিজেকে ছিটকে সরিয়ে আনল শুভ্র। কী করা উচিত বুঝেও উঠতে পারছে না।

“আপনার কাছে স্যরি বলা ছাড়া কোনও উপায় নেই, শুভ্র। আমাকে একটু হেল্প করো সমীর প্লিজ, আমি ওকে ঘরে নিয়ে যাই।” মধুরার গলা শোনা গেল। শুভ্র দেখল একমুখ বর্ষার মেঘ নিয়ে সমীর এসেছে মধুরার সাথে।

চোখের ইশারায় সমীরকে অনুমতি দিল শুভ্র, দুজনে মিলে ধরে ধরে বৃন্দাকে ঘরের দিকে নিয়ে গেল ওরা।
নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল শুভ্র। এই কয়েক বছরে অনেক ট্যুরিস্টই এসেছে এখানে। হনিমুন কাপল ছাড়াও দলবাঁধা কলেজ পড়ুয়ার দল, ছোট-বড় ফ্যামিলি বা অফিস কলিগরা নিজেদের স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে, প্রবাসী ছেলে-মেয়ের রিটায়ার্ড বাবা-মা, মাওবাদী নিয়ে স্টোরি করতে আসা সাংবাদিক, ফোটোগ্রাফার। কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা ওর আগে কখনও হয়নি। হঠাৎ করে বড্ড বিরক্তি লাগল ওর। মিউজিক সিস্টেমে তিলক কমোদ চালাল ও, সেতারের ধ্বনি নিজের বোধের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্তর দিয়ে শুষে নিতে লাগল। ওর চোখের পাতায় ঘুমের আদর নিয়ে রাত বৃষ্টি নামাল।
নিজেদের ঘরে এলোমেলো ঘুমিয়ে থাকল মেয়েরা। বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে মধুরা জানলায় এসে দেখল বাগানের মাঝখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে শ্রী, চোখ বন্ধ করে সুগভীর আশ্লেষে যেন বৃষ্টির সাথে নিজের শরীর মিশিয়ে দিতে চাইছে। ওকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না মধুরা।

সকাল থেকে সকলের মুখ থমথমে। যে যার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে যতটা সম্ভব কম কথা বলে। ব্রেকফাস্ট করে আজ ওদের বেরোতে হবে রাঁচীর দিকে। সমীর গেছে ড্রাইভারকে নিয়ে গাড়িটা আর একবার ভালো করে দেখিয়ে নেওয়ার জন্য। আজ সকালে রোদ্দুর নেই, কিন্তু একটা মিষ্টি জলজ হাওয়া চলছে বাগান ভরে। সে হাওয়ায় ভর করে সারা বাগানময় উড়ছে শালমঞ্জরী, শুকনো পাতা, পাখির বাসার খড়। নিজের বারান্দা থেকে শুভ্র দেখতে পেল পাহাড়ের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে শ্রী। লেবুফুল রঙের আঁচল উড়ছে নিশানের মতো। কোথাও কি কিছু চিনচিনে ব্যথা লাগল ওর? শুভ্র বুঝতে পারল না। দু-দিনের আলাপে এটাই মনে হয়েছে এই মেয়েটি ওর মতোই কোনও গোপন ক্ষত বুকে নিয়ে চলে। বাগানে নেমে কিছুটা হাঁটতেই ফিরে তাকাল শ্রী, হাত নেড়ে ডাকল ওর দিকে। কাছে এসে শুভ্র ওর চোখে কান্নার ঘ্রাণ পেল, ভাবল একবার জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু না, যে ব্যথা একান্তই নিজের, তা নিজেরই থাকা ভালো।

“কালকের ঘটনায় কিছু মনে করবেন না প্লিজ, আমরা সবাই কিন্তু একরকম নই।”

“এটা নিয়ে এত চিন্তার কিছু নেই, আপনারা নিরাপদে নিজের নিজের বাড়ি ফিরুন।” হেসে বলল শুভ্র।

“আবার আসতে বলবেন না?”

“বলব না।”

“কেন?”

“কারণ, আমি জানি আপনি আবার আসবেন। এই জঙ্গল পাহাড়ের প্রেমে পড়েছেন আপনি।”

“আর? আর কিছু নয়?”

“আরও যা কিছু, তা তো জীবনের ছোটখাট সঞ্চয়, জমিয়ে রাখা ভালো, শীতের দিনের রসদের মতো।”

“নাহ, কথায় আপনার সঙ্গে আমি পারব না। এটা রাখুন।” একটা কার্ড দিল শ্রী ওর হাতে। “ফোন নম্বর আর অফিসের ঠিকানা দিলাম। হারাতে না চাইলে কতকিছুই তো থাকে, তাই না? আসি, ভালো থাকবেন।”

“আপনিও ভালো থাকবেন, আর হাসলে আপনার বাঁ গালে টোল পড়ে, মনে রাখবেন।”

শ্রীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে কার্ডটা বুক পকেটে রাখল শুভ্র। অলস পায়ে গেটের দিকে এগোল। গাড়িতে মালপত্র উঠে গেছে সবার। যাত্রীরাও বসে আছে নিঃস্পন্দ পুতুলের মতো। ওকে দেখে নেমে এল মধুরা।
“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে শুভ্র। এত সুন্দর ব্যবস্থা, এত আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য। আমি আমার মেয়েদের আর তাদের বাবাকে নিয়ে আবার আসবো ওদের শীতের ছুটির সময়।”
“অবশ্যই আসবেন,” হাতজোড় করে নমস্কার করে বিদায় জানাল শুভ্র। লাল ধুলো উড়িয়ে জিপ মিলিয়ে গেল রাস্তার বাঁকে।

নিষেধ শোনোনি তুমি, সাবধানে হাঁটোনি তো পথ… কাঁটায় কি জড়িয়েছে পা? আর পথ নাই ফিরিবার, এ অরণ্য ডোবাবে তোমায়, এ পাহাড়, এই ভেজা হাওয়া– এই মরণ আর আজ থেকে জীবন তোমার… থামো, পরিযায়ী, দেখো উঠোনে পড়েছে সোনা রোদ…
বুকপকেটের উপর হাত দিল শুভ্র, লম্বা পায়ে এগোলো বাংলোর দিকে। ঘর রেডি করতে হবে আবার, গেস্ট আসার কথা আছে সামনেই।