যখন জমল ধুলো তানপুরায়

অমিতাভ মৈত্র

শুদ্ধ দেখতে দেখতে চার বছর কাটিয়ে দিল শিলিগুড়িতে। চাকরির সুবাদে প্রথম পাঁচ বছর কেটেছিল মেদিনীপুর শহরে। কলকাতায় ট্রান্সফারের ক্ষীণ আশা যে তখন ছিল না তা নয়। কিন্তু হয়নি। মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় প্রতি সপ্তাহে ফেরা এবং সোমবারে আবার গিয়ে অফিস করা যতটা সহজ ছিল, শিলিগুড়ি থেকে এই কাজটা তত সহজ নয়। ফলে বাড়ির সঙ্গে সেই যোগাযোগটা শিলিগুড়িতে এসে কমেছে। শুদ্ধর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলে আঠেরো আর মেয়ে চোদ্দো। কস্তুরীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিল শুভ্র সেই কবে। তখন শুদ্ধ আঠাশ আর কস্তুরী ছাব্বিশ। ইউনিভার্সিটিতে আলাপ হয়েছিল দুজনের। একান্তই মামুলি আলাপ ছিল সেটা। মামুলি হলে কী হবে কস্তুরীর সরল সৌন্দর্য আর কণ্ঠস্বর শুদ্ধকে সামান্য চঞ্চল করে তুলেছিল সেইদিন থেকে। মেয়েদের সঙ্গে নিজে থেকে গিয়ে আলাপ জমানোর ব্যাপারে শুদ্ধর দক্ষতা প্রায় ছিল না বললেই হয়। এ ব্যাপারে দক্ষতা যদি কারুর ছিল তো, সে সুশান্তর। সুশান্তর বান্ধবীর সংখ্যাই ছিল বেশি। সুশান্ত রাজনীতি আর সাহিত্যচর্চার বাইরে যে কোনও বিষয়ে খুব গভীরে না গিয়েও কথা বলে যেতে পারত হালকা মেজাজে। পাছে পিছিয়ে পড়তে হয়, তাই বাংলা খবরের কাগজকে যে ভরসা করা যায়, তা সুশান্তর কাছে পরীক্ষিত সত্য। বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান সুশান্ত বান্ধবীদের এবং নিজেকে খুশি রাখতে বাবাকে যথেষ্ট অশান্তিতে ফেলে রাখত তার কলকাতার হোস্টেলে অর্থকষ্টের বিস্তারিত বিবরণ প্রতি সপ্তাহে জানিয়ে। সুশান্ত ছিল শুদ্ধর গায়ে সেঁটে থাকা সঙ্গী। এমন প্রাণখোলা, মনখোলা বন্ধু শুদ্ধ আগে কখনও পায়নি। কফি হাউসে বন্ধু আর বান্ধবী জড়ো করে আড্ডা হত প্রায়ই। কস্তুরী মাঝে মাঝে থাকত সেই আড্ডায়। অনেকদিনই অকারণে চোখে চোখ পড়ত দুজনের। কস্তুরী চোখ নামিয়ে নিত।
অঘটনটা ঘটেছিল মধ্যমগ্রামে এক বাগানবাড়ির পিকনিকে। সেটা ছিল পঁচিশে ডিসেম্বর। কস্তুরী পিকনিকে আসতে পারেনি সেদিন। শুদ্ধ মনে মনে আহত হলেও কাউকে আগ্রহ দেখিয়ে কস্তুরীর কথা জিজ্ঞেস করতে বাধো বাধো ঠেকছিল। দুপুরের খাওয়াদাওয়া দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হবে সবাই জানত। তাই গানের আসর বসেছিল। মেয়েদের মধ্যে অনেকেরই চর্চা করা গলা। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে তেমন কেউ ছিল না। অবশেষে সুশান্ত অন্য এক পরিচয়ে পরিচিত করাল শুদ্ধকে। শুদ্ধ যে বাঁশি বাজায় এটা সবার কাছে ছিল গোপন। প্রচার করার কোনও কারণও আজ পর্যন্ত শুদ্ধ খুঁজে পায়নি। পিকনিকে বাঁশি সঙ্গে করে এনেছিল সুশান্তর একতরফা চাপে। শুদ্ধ পিকনিকে পরিচিত হল সখের বাঁশি বাজিয়ে হিসেবে। আড়বাঁশির সুরে সবাইকে হতবাক করে শুদ্ধ আসর শেষ করেছিল একঘণ্টা পরে। সুশান্ত বলেছিল, “বাড়িতে বসে কতবার তোর বাঁশি শুনেছি। কিন্তু আজকে শালা তোর ঠোঁটে কি মা সরস্বতী চুম্বন করেছিল? নইলে আজ এমন সুর বাজালি কী করে!”
ছাব্বিশ তারিখে সকালে পর পর দুটো ক্লাস সেরে শুদ্ধ যখন সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামছিল, তখন একটা বেজে গেছে। নিচে অপেক্ষারত একপাল বন্ধু ও বান্ধবী, সঙ্গে আছে আড্ডাসহ সিগারেটের তৃষ্ণা। সিঁড়ির কোণ থেকে এক বামাকণ্ঠ ভেসে এল ক্ষীণ স্বরে, “সকালে ক্লাস করেননি নাকি?” শুদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বরের উৎপত্তিস্থলে কস্তুরীকে দেখতে পেল।
শু- আমাকে বলছেন?
ক- আর কাকে বলব? ক্লাস বাঙ্ক করে বন্ধু, আড্ডা আর পরোপকার নিয়ে তো একজনই থাকে।
শু- এটা আমার নামে একটা মিথ্যে অপবাদ। সকালে পর পর দুটো ক্লাস করে এই সবে নিচে নামছিলাম।
ক- সত্যি নাকি? তাই সকালে ক্যান্টিনের আড্ডায় দেখিনি।
শু- এতেই বোঝা গেল আসল সত্যিটা কী।
ক- কোন সত্যিটা বোঝা গেল?
শু- সক্কালবেলা ক্লাস কেটে ক্যান্টিনে আড্ডাটা কে মারছিল।
ক- আপনি তো বেশ ঝগড়ুটে। আমি মোটেও ক্যান্টিনে যাইনি। আপনার খুব সুখ্যাতি শুনে দেখতে গিয়েছিলাম ক্যান্টিনে সকালবেলার আড্ডায় আপনাকে দেখা যায় কিনা। সুশান্ত, আশীষ সবাই খুঁজছিল আপনাকে।
শু- তাহলে স্বীকার করছেন তো, সুখ্যাতি আছে… ঝগড়ুটে বলে বদনাম নেই।
ক- আপনি কি খুব ডিবেটে পার্টিসিপেট করেন?
শু- কীসে আপনার এ কথা মনে হল?
ক- ডিবেটে অপর পক্ষ যা বলে সব কিছু মনে রাখতে হয়, নোট নেওয়া তো যায় না। কথার পিঠে কখন ঝগড়ুটে বলেছি, ঠিক মনে রেখে দিয়েছেন, ঝগড়ায় যাতে কোনোভাবেই আপনার হার না হয়।
শু- আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এই ডিবেটে হার মানছি, কিন্তু একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
ক- কী কথা?
শু- আমার কীসের এত সুখ্যাতি আপনি শুনলেন?
ক- ওমনি সুখ্যাতি শোনার জন্যে মন অস্থির হয়ে উঠলো। তাই হার মানতেও দেরি হল না।
কস্তুরীর মিষ্টি হাসি চোখ ভরে দেখছে শুদ্ধ। সময় কাটছে আনমনে।
ক- এ কী! হাঁ করে কী ভাবছেন?
এবার শুদ্ধর লজ্জা পাবার পালা।
শু- না… ভাবছিলাম… ও… হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
খিল খিল করে হাসছে কস্তুরী, শুদ্ধর ভুলে যাওয়া বোকা চাহনির দিকে তাকিয়ে। ক- আজ ক্যান্টিনে আপনাকে নিয়ে কি সুখ্যাতি হচ্ছিল তা বলতে পারি, কিন্তু একটা ছোট্ট শর্ত আছে।
শু- কী সেই শর্ত?
ক- আপনি শর্ত মানবেন এই কথাটা আগে দিতে হবে মশাই।
শু- এ কী রকম শর্ত, না জেনেই মেনে নিতে হবে?
ক- তাহলে শুনে কাজ নেই, শর্ত মানা যখন এতই কঠিন।
শু- আচ্ছা ঠিক আছে, আমি শর্তে রাজি। এবার বলবেন তো কী শুনেছেন?
কস্তুরী হঠাৎ কেমন ইতস্ততঃ করছে। কী একটা বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। মাঝে মাঝে চুরি করে শুদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিচ্ছে। একগুচ্ছ বেহায়া চুল চুলের বাঁধন না মেনে বাঁধনছেঁড়া এলোমেলো উড়ছে কস্তুরীর কপালে।
শু- কী হল? কী এত ভাবছেন?
কস্তুরী মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে ছিটেফোঁটা ঘাম জমছে।
শু- বলবেন না… কী শর্ত?
কস্তুরী নিস্তব্ধতা ভাঙল।
ক- না থাক।
শু- কী থাকবে? শর্তটা একবার শুনি।
ক- না… আমার খুব বাজে লাগছে। আগে পিছে কিছু না ভেবে আপনাকে হঠাৎ এই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ডেকে বসলাম। আপনি কী ভাবছেন কে জানে।
শু- এখানে দাঁড়িয়ে আর বেশিক্ষণ যদি নিচু গলায় এইভাবে কথা বলি, তাহলে আমি তো ছার, গোটা ইউনিভার্সিটি চোখ চাওয়াচাওয়ি করে ভাববে। প্রত্যেক বন্ধুবান্ধব, অফিস কর্মচারী, প্রফেসর, লেকচারার এমনকী মেথররাও একটা করে রগরগে প্রেমের উপন্যাস লিখে ফেলবে আর তাতে আমি নায়ক… আপনি নায়িকা।
ক- ইস! কী যে বলেন।
শু- আমি অন্যায়টা কী বললাম। ওদের জায়গায় আপনি-আমি থাকলেও হরেদরে একই কাজ করতাম। এই রকমটাই হয়ে আসছে ম্যাডাম। তার চেয়ে একটা আইডিয়া মাথায় আসছে। অভয় দেন তো বলে ফেলি।
ক- এমন কী আইডিয়া যে শোনার জন্যে অভয় দিতে হবে?
শু- ওই যে, যে কারণে শর্তের কথাটা আপনি বলতে এতবার কিন্তু, যদি, আজ্ঞে আরও কত কী করছেন, আমারও ওই একই কারণে একটু নির্ভেজাল অভয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
ক- আচ্ছা, ঠিক আছে এক্কেবারে নির্ভেজাল অভয় না হয় দেওয়া গেল, এখন শুনি আইডিয়াটা কী।
শু- দাঁড়ান তাহলে একটু সাহস সঞ্চয় করে নিই। অনেকটা সাহস এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজে খরচা হয়ে গেল তো।
ক- ও, তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলে আপনার সময় বাজে নষ্ট হয়েছে? ঠিক আছে আমি তাহলে যাচ্ছি।
কস্তুরী মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল। শুদ্ধ অকস্মাৎ কস্তুরীর হাত টেনে ধরল।
ক- এ মা! কী করছেন। কেউ দেখলে কী ভাববে।
কস্তুরী কিন্তু হাত ছাড়াল না।
শু- আমি মাপ চাইছি। আমি আপনাকে আঘাত করার জন্যে এই কথা বলিনি। একটু মজা করেছি। বলুন মাপ করেছেন কিনা।
কস্তুরী একটা দুষ্টুমির হাসির রেখা মুখে এনে বলল, “মাপ করতে পারি যদি কোনও কথা না ঘুরিয়ে বলেন কী আইডিয়া আপনার মস্তিষ্কে ঘোরাফেরা করছিল।”
শু- এবারে আমি বেশ খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে ফেলেছি। ভেবে দেখলাম এই সাহসটুকুর সবটা এই বেলা কাজে লাগাতে না পারলে আবার বাজে খরচ হয়ে যাবে। এই বেলা কথাটা আমার বলে ফেলাই ভালো।
ক- আচ্ছা একটা কথা বলব?
শু- নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন।
ক- আপনি কি বাড়িতেও সবার সঙ্গে এই রকম ফাজলামি করেই সারাদিন কথা বলেন?
শু- ক্ষেপেছেন নাকি। আমার বাবা ভীষণ রাশভারী টাইপের লোক। এখনও একটা হাঁক দিলে আমার হাত-পা সটান সাইবেরিয়ায় চলে যায়। মা-র সঙ্গে অবশ্য এইসব চলে। আর চলে আমার ছোট বোনের সঙ্গে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি কিন্তু খুব গম্ভীর লোক। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সব গাম্ভীর্য আজ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। এখন আমি কেমন যেন লাগামছাড়া। তাই বলছিলাম,
আজ জলাঞ্জলি যাক না যত ক্লাসগুলো,
আড্ডার ডাকে না হয় দিলাম কানে তুলো,
কেটে পড়ি ফেলে ক্যান্টিনের ফসিলাইজড কচুরি
এ কোন সুবাসে মেতেছে শুদ্ধ যেন হাতছানি দিল কস্তুরী

ক- বাবা! মুখে মুখে একটা ছড়া বানিয়ে ফেললেন আমাকে নিয়ে। আপনি তো সাংঘাতিক লোক। বুঝলাম আপনার আইডিয়াটা। মতলবটাও খুব একটা সুবিধের ঠেকছে না।
কথা বলতে বলতে ওরা দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। কস্তুরীর সঙ্গে চোখাচোখি হ কয়েকজন বন্ধুর। এই সময় তাদের না এড়িয়ে পারল না কস্তুরী। শুদ্ধ জানত বন্ধু-বান্ধবের চোখ এড়িয়ে ইউনিভার্সিটি চত্বর থেকে কীভাবে পালাতে হবে। বড় রাস্তায় নেমে চৌরঙ্গীগামী একটা বেশ খালি ট্রামে উঠে পড়ল দুজনে। সামনের দিকে পাশাপাশি বসার একটা সিটে গিয়ে বসল। এখন কস্তুরীর শরীরের কোমল উষ্ণতা অনুভব করছে শুদ্ধ। এই প্রথম এক প্রাপ্তবয়স্কা সুন্দরী নারীর শরীরের স্পর্শে রোমাঞ্চিত হওয়া সময়টাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করতে মন চাইছে শুদ্ধর। এই ব্যাপারে কলকাতার ট্রাম, কলকাতার ট্র্যাফিক সিগনাল, ঠ্যালা গাড়ি, রিক্সা আর গাড়ির রাস্তায় প্রতি মুহূর্তের বিপদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মানুষের ঢলের দীর্ঘায়ু কামনা করল শুদ্ধ।
ক- আপনার সাহস প্রশংসনীয়।
শু- এতে আর সাহসের কী আছে, আমি তো আর খালি হাতে বাঘ মারতে যাচ্ছি না।
ক- কী করেন আপনি সারাদিন, ফাজলামি, আড্ডা আর পরোপকার বাদ দিয়ে?
শু- আর পড়াশুনো করি। আমার পরীক্ষার রেজাল্ট তার প্রমাণ।
ক- আর কিছু না?
শু- এই মরেছে! এখন তো আপনি আমাকে প্রায় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন শুরু করলেন। বাবার নাম কী, মার গেঁটে বাত আছে কিনা, কটা নাতিপুতি, শ্বশুরের বয়েস কত ইত্যাদি ইত্যাদি।
কস্তুরী খিলখিল করে হাসছিল। ক- কথায় আপনার সঙ্গে পারা কঠিন।
শু- ওইটুকুই আছে। ক- আর একটা গুণ আছে, যেটা কেন জানিনা আপনি লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে ভালোবাসেন। আর সেই কথাটাই বলার জন্যে আজ গায়ে পড়ে অসভ্যের মতো আলাপ করলাম। শু- ভাগ্যি আজ এতটা বেপরোয়া অসভ্য হয়েছিলেন, তাই সারা জীবন মনে রাখার মতো এমন একটা মিষ্টি, অভাবনীয় দুপুর আমি উপহার পেলাম অকস্মাৎ।
ক- সত্যি বলছ, শুদ্ধ?
শু- এর চেয়ে বড় সত্যি আমি কখনও বলিনি।
ক- অসতর্ক হয়ে তুমি বলে ফেললাম, কিছু মনে করবেন না।
শু- যেটা স্বাভাবিকভাবে আসতে চাইছে, তাকে আসতে না দেয়াটা নিজেকে ঠকানো। তাছাড়া…
ক- তাছাড়া কী? থামলেন কেন?
শু- আপনিও তো আবার কয়েক যোজন পিছিয়ে গিয়ে আপনি, আজ্ঞে শুরু করলেন। তাছাড়া বলতে গিয়েও একটা কথা বলতে সংকোচ হচ্ছিল… নির্ভয়ে বলব?
ক- ওহ! শুদ্ধ তুমি বড্ড ইনিয়েবিনিয়ে কথা ঘোরাও। বলো না প্লিজ, কী বলছিলে।
শু- আপনার মুখে ‘তুমি’ সম্বোধন আজকের উপহারের সঙ্গে অনবদ্য একটি বোনাস।
ক- মেয়েরা ওই রকমই। কিন্তু এখনও তুমি সংকোচের খোলস ছেড়ে বেরোতে পারোনি।
শু- বুঝতে পেরেছি কস্তুরী, তুমি কোন সংকোচের কথা বলছ। তুমিই বের করে আনলে আমাকে সেই খোলস ছেড়ে। এখন আর কেউই আমরা আপনি, আজ্ঞে করব না, তাই তো?
মাথা নাড়িয়ে, একটু লজ্জা মাখানো মুখে, সম্মতি জানাল কস্তুরী।
বৌবাজারের মোড়ে ট্রামটা দাঁড়িয়ে আছে ট্র্যাফিক সিগনালে। শহরের অবিশ্রান্ত কোলাহলে কস্তুরীর কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। কস্তুরী ঘাড় ঘুরিয়ে শুদ্ধর কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে কথা বলছিল। কস্তুরীর শরীরের আবেশমাখানো গন্ধে বিভোর হয়ে উঠল শুদ্ধর মন।
শু- কই বললে না তো, কী সুখ্যাতি শুনে আজ তুমি বেপরোয়া হয়ে উঠলে?
ক- এখনও কিন্তু বলোনি আমাকে, তুমি এত সুন্দর বাঁশি বাজাও। সেদিন পিকনিকে তোমার বাঁশি শুনে অর্পিতা বলছিল তোমার বাঁশির ওপর দখল নাকি রীতিমতো প্রশংসা আদায় করার মতো।
শু- আমি অ্যামেচার আর যারা শুনছিল তারাও একই গোত্রের। অতএব এই কমেন্টগুলোকে নিয়ে এত হৈ হৈ করার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
ক- মোটেই না মশাই। অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু অর্পিতা ছ-বছর ধরে বড় ওস্তাদের কাছে ক্ল্যাসিকাল শেখে। ওর কান আর বাকিদের কান এক নয়। তাছাড়া মানুষ যখন কোনও সুরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়, তখন সেই সুর তার হৃদয়কে স্পর্শ না করলে নির্ভেজাল প্রশংসা কখনও এমন স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আসে না।
শু- সত্যি বলছ?
ক- হ্যাঁ মশাই। তাই তোমার সঙ্গে আলাপ করতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সিঁড়ির কোণে। এখন বলো, আমাকে বাঁশি কবে শোনাবে।
শু- এমন জানলে তো আজকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম। কিন্তু বাঁশি তো গান নয়… শুধু সুর বাজে। তোমার কি ভাল লাগবে?
ক- আমাকে তুমি এতটা বেরসিক ভাবলে কেন? আচ্ছা ঠিক আছে। সত্যিই তো তুমি আমাকে আর কতটুকু চেনো। এই ভালো লাগা, না-লাগাগুলো বুঝতে আর একটু সময় দিতে হয়। জানি না, সেই সময় আমরা পাব কিনা।
শু- এ কথা বলছ কেন? পরস্পরকে জানতে বা সবটুকু বুঝতে অনেক সময় দিতে হয় এ কথা সত্যি, কিন্তু সময় পাব না কেন বলছ?
ক- এর উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। আজকে আমি এখন বাড়ি ফিরব।
কস্তুরীকে ট্যাক্সিতে ভবানীপুরে নামিয়ে শুদ্ধ বাড়ি ফিরল এক বাঁধনছেঁড়া মন নিয়ে। দোতলায় নিজের ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিতে দিতেই কস্তুরীকে ফোন করল।
শু- এই আমি শুদ্ধ বলছি। ক- বুঝতে পেরেছি মশাই। আশেপাশে মা, বাবা, বোন কেউই নেই মনে হচ্ছে?
শু- না, তেমন কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ কেউ উদয় হবেন না এমন গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে না।
ক- উদয় হলে কী করবে?
শু- সমস্যা এলে তখন ভাবা যাবে।
ক- বাড়িতে ঢুকেই ফোন কেন সেটা শুনি।
শু- খুব ইচ্ছে করছিল তাই। অসুবিধে থাকলে কেটে দিতে পারি।
ক- এই না না, কেটে দিও না। মোবাইলে এই প্রথম তোমার গলা শুনছি। কেমন ভারী ভারী লাগছে গলাটা।
শু- আচ্ছা কস্তুরী, তুমি আবৃত্তি করেছ কখনও?
ক- হঠাৎ এই প্রশ্ন?
শু- তোমার কণ্ঠস্বরে কী একটা আছে। কেমন যেন আবেশ জড়ানো। নেশা ধরিয়ে দেয়।
ক- বাবা! এমন সার্টিফিকেট আমাকে কেউ কখন দেয়নি। আসলে, তোমার মনটা এখন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। তাই আমার কণ্ঠস্বর তোমার কানে আবেশ ধরাচ্ছে।
শু- সত্যি বলছি। তুমি যদি গায়িকা হও, আমি আশ্চর্য হব না। আমি স্বীকার করছি, আমার প্রথম প্রেমিকা… তোমার কণ্ঠস্বর।
ক- সে কী! আজকেই তো প্রথম সেইভাবে আলাপ হল। আমার কণ্ঠস্বর শুনলে কখন?
শু- আমার চোখ এবং কান তোমাকে ধাওয়া করে বেড়ায় সারাদিন। আমার সঙ্গে আগে তোমার কথা হয়নি ঠিকই, তাতে তোমাকে দেখা বা কণ্ঠস্বর শোনা আটকাবে কে।
ক- আমি বিশ্বাসই করি না। আজ ডেকে আলাপ না করলে কোনোদিনই তুমি নিজে এসে আলাপ করতে না। আমি তোমাকে চিনেছিলাম আর সেই জন্যেই তো…
শু- সেই জন্যেই তো কী?
কস্তুরী চুপ করে আছে। সময় কাটছে। শু- কী হল? চুপ করে আছো যে।
ক- কিছু না।
শু- কিছু না মানে? ‘সেই জন্যেই তো’ বলে থেমে গেলে কেন? বলবে না?
ক- আমার লজ্জা করছে, শুদ্ধ।
শু- লজ্জা করলে শুনব কী করে?
ক- এরপরে যেদিন আজকের মতো তোমাকে একা পাব, সেদিন বলব।
শু- যাহ! আপাতত সবটা তাহলে হিমঘরে চলে গেল। এত আমের অমন প্লাস্টিক চাটনিতে কড়া চিরেতার জল ঢাললে কস্তুরী। এরই মধ্যে মা আবার ডেকে যাচ্ছে একটানা। আসছি মা। কস্তুরী তোমাকে কলব্যাক করছি একটু পরেই। চলে যেও না কোথাও।
নিচের তলায় শুদ্ধর মা, অপর্ণার গলা শোনা গেল।
অপর্ণা- কী হলো কী তোর, ডেকে সাড়া পাচ্ছি না? বাড়িতে ঢুকেই টেলিফোনে মজে আছিস, ব্যাপারটা কী?
শু- কী আবার। কথা বলছিলাম সুশান্তর সঙ্গে।
অ- সুশান্তর সঙ্গে, এত নিচু গলায়, ফিসফিস করে। ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম… হুঁশ ছিল না তোর। কী ব্যাপার?
শু- ব্যাপার আবার কী।
অ- কিছু না হলেই ভালো। খাবারটা ঠান্ডা হয়ে গেল তো। খেয়ে নে।
সেদিন আর তেমন করে শুদ্ধ কস্তুরীর সঙ্গে কথা বলতে পারল না। দিনের কাজ সেরে এই সময়টা মা এসে বসেন শুদ্ধর কাছে। সঙ্গে থাকে শুদ্ধর বোন। দাদার সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা বেশ গভীর। শুদ্ধ একবার শুধু কস্তুরীকে জানাতে পেরেছিল সংক্ষেপে ঘরের পরিবেশ কথা বলার পক্ষে কতটা পরিপন্থী। মেসেঞ্জারে কয়েকবার কথোপকথন চালাবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তাতেও মা রেগে যাচ্ছিলেন।
অ- কী তখন থেকে মোবাইলে উটখুট করছিস বল তো? যা বলছি তাতেই হুঁ, হ্যাঁ উত্তর দিচ্ছিস। মন কোথায় পড়ে আছে তোর। তখন থেকে মোবাইলে টুং করে বেজে উঠছে আর কী সব খুট খুট করে যাচ্ছিস।
অগত্যা মন টেলিফোনের দিকে পড়ে থাকলেও সেদিনের মতো কস্তুরীর কণ্ঠস্বর শোনার বাসনাকে দমিয়ে রাখতে হল।
পরের দিন ওরা যে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে দেখা করবে সেটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল। আজ শুদ্ধ সঙ্গে বাঁশি আনতে ভোলেনি। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল লেকের দিকে। এখনও লেকে বিকেলের ভিড় শুরু হয়নি। স্বাস্থ্য সচেতন পুরুষ ও মহিলারা হাঁটাহাঁটি, দৌড়, নানা অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, সমবেত এবং পরিমিত অট্টহাস্য ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো প্রধানত সকালে সেরে লেককে দুপুর থেকে খানিকটা মুক্তি দেন শুদ্ধ আর কস্তুরীদের একান্ত নিরালায় মুখোমুখি বসার জন্যে। বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছিল। ধূসর মেঘের ছায়া নামছে লেকের জলে। গাছের পাতায় আর ডালে এক কোমল অস্থিরতা। পাখিদের ঘরে ফেরার ডাকাডাকির সঙ্গে মিলেমিশে গেল আজকের বাঁশিতে বাজা সুর। শুদ্ধর বাঁশি গেয়ে চলেছে ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে…’ এমন একটা পড়ন্ত বিকেলের জন্যে প্রস্তুত ছিল না কস্তুরী। ছিটেফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল। হাতটা রাখতে ইচ্ছে করছে ওর শুদ্ধর হাতে, কিন্তু উপায় নেই। শুদ্ধর দু-হাতের আঙুল তখন বৃষ্টিভেজা বিকেলের সুর বুনে চলেছে বাঁশিতে। কস্তুরী একদৃষ্টে তাকিয়েছিল বংশীবাদকের দিকে… ভাবছিল বাঁশি হাতে শুদ্ধ এক আলাদা মানুষ, তার মনে তখন বোধ হয় নেই দিনান্তের মন খারাপ করা বৃষ্টি, নেই লেকের জলে ঘনিয়ে আসা মেঘের ছায়া, নেই পাখিদের বাসায় ফেরার কোলাহল বা কস্তুরীর কোমল কোনও উষ্ণ ছোঁয়া। আছে সুরের ঘাটে ঘাটে পৌঁছতে পারার এক বাঁধনছেঁড়া উন্মাদনা। বাঁশি বাজানো শেষ করে শুদ্ধ তাকিয়ে আছে কস্তুরীর দিকে।
ক- কী দেখছ অমন করে?
শু- তোমাকে।
ক- আমাকে তো কতবার দেখলে এই দুদিনে।
শু- তোমার চোখে আর কণ্ঠস্বরে কী একটা মাদকতা আছে কস্তুরী। প্রথম যেদিন তোমাকে আমি দেখেছিলাম সেইদিন তোমার চাহনি আমাকে কেমন চঞ্চল করে তুলেছিল। তারপর কফি হাউসে একদিন এলে সুশান্তর সঙ্গে। একদল চেনা অচেনা মানুষের মধ্যে থেকে তোমাকে দেখলাম, পরে শুনলাম তোমার সেই নেশা ধরানো কণ্ঠস্বর।
দুজনে দুজনের চোখে চোখ রেখে কেটে গেল কিছু সময়।
ক- এবার চোখটা সরাও লক্ষীটি।
চোখ না সরিয়েই শুদ্ধ বলল।
শু- সরাতে পারি কিন্তু এই কথাটা আর একবার বলতে হবে।
ক- কোন কথাটা?
শু- এই যে… এক্ষুনি চোখ সরাবার কথা বললে। ওই কথাটা যেমন করে বললে, ঠিক সেই রকম করে আর একবার বলো।
ক- কেন?
শু- আমার ভীযণ ভাল লাগলো শুনতে। কী মিষ্টি করে বললে তুমি, লক্ষীটি।
ক- এতক্ষণ একটানা আমাকে দেখেও তোমার আশ মিটছে না?
শু- না, সত্যিই মিটছে না। কই বাঁশি শুনে ভালো-খারাপ কিছু বললে না তো?
ক- বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আর যেভাবে বলা যায় সেটা এইখানে বসে বলতে পারব না।
কস্তুরীর কণ্ঠে আজ কী ভর করেছে শুদ্ধ জানে না। আবেশ জড়ানো কণ্ঠস্বর যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে শুদ্ধকে।
শু- বৃষ্টি নেমেছে, কেউ কোথাও নেই কস্তুরী। লক্ষীটি বলো।
কস্তুরী শুদ্ধর হাতটা ধরে তুলে নিল। বৃষ্টিভাঙা ধোঁয়াশার আড়ালে কস্তুরীর কোমল ঠোঁটের দীর্ঘ স্পর্শে রোমাঞ্চিত হচ্ছিল শুদ্ধর হাত, শরীর… মন।
শিলিগুড়ির একচিলতে শোবার ঘরের জানলা দিয়ে ঝিরঝিরে হাওয়ায় কেবলই এইসব কথা ভাবছিল শুদ্ধ। মাঠ পেরিয়ে দূরের রাস্তাটা বাঁক নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে একপাল গাছের আড়ালে। নিঃস্তব্ধ শীতের শুরু থেকে প্রায়ই, এই জানলা দিয়েই দেখা যায় সাদা বরফে মাথা মুড়ি দিয়ে যেন আকাশে ভেসে আছে… কাঞ্চনজঙ্ঘা। সরু রেলের পথ ধরে ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে মুখ ঢেকে খেলনা ট্রেন দিনে কয়েকবার ডাকতে ডাকতে চলে যায় অনেক দূরে… ট্রেন চলে গেলে আবার সেই নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে শুধু অচেনা কোনও পাখির একটানা অলস ডাকে ফিরে আসে ফেলে আসা অনেকটা সময়। আজ বড্ড সেই কস্তুরীর কথা মনে পড়ছে শুদ্ধর, যে কস্তুরী ইউনিভার্সিটির সিঁড়ির কোণ থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল, “সকালে ক্লাস করেননি নাকি?” বিয়ের আগে প্রথমদিন চৌরঙ্গীর ভিড়ে কত ছেলেমানুষি গল্প। কস্তুরীর একটু ছোঁয়া পেতে কত চাতুরি। বাঁশি শুনিয়ে যে প্রাপ্তি ঘটেছিল লেকে তার নরম উষ্ণ ছোঁয়ায় আজও সিক্ত আছে শুদ্ধর হাত।
কস্তুরী একদিন বলেছিল, “তুমি তো ভগবান বিশ্বাস করো না, তাই না?”
শু- বিশ্বাস করার পিছনে কোনও যুক্তি খুঁজে পাইনি, কিন্তু বিশ্বাস না করার পিছনে যুক্তিটা অনেক শক্তিশালী।
ক- অত তর্কে আমি তোমার সঙ্গে পারব না। কিন্তু আমাকে একটা কথা দাও শুদ্ধ।
শু- কী এমন কথা যা তোমার মনে হচ্ছে আমি নাও রাখতে পারি?
ক- বিয়ের পরে আমাকে একটু পুজো করতে বাধা দিও না লক্ষ্মীটি।
শু- সে কী! তুমি পুজো করলে আমি বাধা দেবার কে। আমার মা-ও তো পুজো করেন।
কস্তুরী খুশী হয়ে আদর করেছিল শুদ্ধর গাল টিপে।
কস্তুরীর মা ও বাবা এক বছরের ব্যবধানে মারা যান। তখন শুদ্ধ সবে ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পার হয়ে পি এইচ ডি-র জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল। পি এইচ ডি করা আর হয়নি। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসতে হল… চাকরিটা খুব প্রয়োজন ছিল শুদ্ধর। পরীক্ষায় রেজাল্ট হল খুব ভালো। সরকারি চাকরির সূত্রে প্রথমেই যেতে হল মেদিনীপুর। এক বছরের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল ওদের। প্রথম প্রথম কিছুদিন কস্তুরী মেদিনীপুরে শুদ্ধর কাছে থাকত। কিন্তু কস্তুরীর ভাইয়ের জন্যে কস্তুরীকে কলকাতায় ফিরে আসতে হত। কস্তুরীর ভাই সন্তু তখনও স্কুলে পড়ছে, কিন্তু বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তার দৈনন্দিন অনেক কিছুই কস্তুরীকে সামলাতে হত। তার অর্থনৈতিক অনেক সমস্যাই শুদ্ধকে মেটাতে হত। কস্তুরী সংসারে খুব ব্যস্ত থাকে। সপ্তাহখানেক আগে ফোন করেছিল, ছেলেমেয়ের রেজাল্টের খবর জানাতে। ভাইয়ের চাকরির ইন্টারভিউ আর তার প্রেমিকার সঙ্গে মনোমালিন্য এবং শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ির দীর্ঘ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনতে হয়েছিল শুদ্ধকে।
শুদ্ধ বলেছিল, “জানো কস্তুরী আমাকে যে ছেলেটি রোজ এখানে খবরের কাগজ দিয়ে যায়, মাঝে মাঝে সে নাকি আমার বাঁশি বাজানো শুনেছে আড়াল থেকে। এই ছেলেটিও বাঁশি বাজায়। ওর বাঁশি শুনে আমি একটা পাহাড়ি সুর ওর কাছে শিখেছি। কী সুন্দর যে সেই সুর তোমাকে বলে বোঝাবার ভাষা নেই আমার। তুমি এখানে এলে তোমাকে শোনাব।
কস্তুরী বলেছিল, “হ্যাঁ শুনিও। আর তোমাকে বলেছিলাম না, কাউকে বলে কয়ে সন্তুর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দাও না গো। তোমার তো কত জানাশোনা আছে। কত লোকের তো কত কী করে দিচ্ছ। সন্তুর চাকরিটা হলেই একটা ভালো মেয়ে দেখে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেব। আগের মেয়েটা কি পাজি একবার দেখলে তো?”
শুদ্ধ আর কথা বাড়ায়নি।
অনেকদিন হল শুদ্ধ কলকাতা যায়নি। ক-দিন ধরেই ওর পড়ার ঘরটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। পড়ার টেবিলটা ঘরের এককোণে পড়ে থাকত। বই আর খাতায় এলোমেলো স্তূপ হয়ে উঠলেই মা এসে গুছিয়ে পরিষ্কার করে দিত। মনে পড়ছে জানলার কোণে রাখা অ্যাশট্রেটার কথা। শুদ্ধর বোন কোথা থেকে যেন দাদাকে এনে দিয়েছিল। ঘরের জানলার নিচে বাইরের দেওয়ালে, ইঁটের কোন ফাঁকে সাদা-কালো একটা পায়রা ছিল তার প্রতিবেশী। এক কৌটো দানা আসত তার জন্যে মাসের কেনাকাটার সঙ্গে। এক-এক দানা নির্ভেজাল ভালোবাসা উজাড় করে দিত শুদ্ধ, পায়রাটার জন্যে। কস্তুরীর কাছে তার প্রতিবেশীর খবর নিয়েছে সে কয়েকবার। কিন্তু কস্তুরী অনেকদিন দেখেনি পায়রাটাকে। নিয়ম করে দানা খাওয়ানোর কথা কস্তুরীর অত মনে থাকে না।
কলকাতায় থাকতে বাড়ির যেসব আসবাবপত্র তার দৈনন্দিন সঙ্গী ছিল, তাদের আলাদা করে মনে পড়ত না শুদ্ধর। টেবিলের কোণে পালিশ উঠে একটা বিশেষ চেনা আকার ফুটে উঠেছিল। সেই আকারটা শুদ্ধই শুধু চিনত। এরা ছিল তার প্রতিদিনের চেনা, প্রতিদিনের সঙ্গী। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার ছোট্ট দূরত্বটুকু ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। চেনা আসবাব, বন্ধু-বান্ধব, টেবিলের পালিশ ওঠা চেনা চিত্র, ইঁটের ফাঁকে দানা পাওয়ার অপেক্ষায় সাদা-কালো পায়রাটা, ছেলে-মেয়ে আর কস্তুরীদের ছুঁতে আকুল হয়ে ওঠা অপেক্ষমাণ শুদ্ধ কখন যেন চলতে চলতে পিছিয়ে পড়েছে। শুদ্ধর বাঁশি কস্তুরীর কাছে অনেক চেনা আর অনেক শোনা, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। শুদ্ধর শরীরের উষ্ণতায় অচেনা কোনও রোমাঞ্চ নেই। কস্তুরীর চোখে নিজেকে সে খুঁজে পায় রোজকার দেখা জানলার কোণে পড়ে থাকা অ্যাশট্রে কিংবা উপেক্ষার ধুলো জমা, পড়ার টেবিলে। কস্তুরী খবর রাখে না দানা পেতে পেতে আর না পেতে পেতে পায়রাটা কখন ইঁটের ফাঁকটুকু ছেড়ে চলে গেছে… আর কোনোদিন না ফেরার জন্যে।

One comment on “

যখন জমল ধুলো তানপুরায়

অমিতাভ মৈত্র

Leave a Reply to Ruchira

Your email address will not be published. Required fields are marked *