প্রথম অক্ষর ‘ম’

সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায়

সাদা কালো খোপের ঠিক সাদাটিতে গা এলিয়ে শুয়ে লাজুকলতা। নেহাত ফুরফুরে চামরপানা লেজটি কালো খোপটিতে নেতিয়ে আছে, তাই ঠাহর হল পরেশনাথের। লাজুক এখানে শুয়ে মানে কর্তামা সবে জলখাবারটি খেয়ে হাতে সেলাইটি নিয়ে বসেছেন তাঁর আরামচেয়ারটিতে। নিভাননী মাঠার গেলাসটি পাশের ছোট টিপয়টির ওপর রেখে ভিতরে গেছে। এইটিই মোক্ষম সময় বটে।
পরেশনাথ ঘোষ লাজুকলতার পাশাপাশিই দাঁড়ান।
সেলাইতে ফোঁড় তুলতে তুলতে ওপরদিকে না তাকিয়েই কর্তামা হাঁক দিলেন, “নিভাননী, ঘোষমশাইকে একখানা মোড়া দিয়ে যা।”
“এ কী, আপনি চোখ না তুলেই কী করে বুঝলেন যে আমিই এসেছি?”
এবার চোখ তোলেন কর্তামা। “তামাকের গন্ধে বাবা। আপনি ছাড়া অন্দরে পুরুষ বলতে আসতে পারেন পুরুতমশাই। তা তিনি পুজুরি মানুষ, ধুনো চন্দন ছাড়া সুবাস জানেন না। এ বাড়ির ছেলেরা তো কেউ তামাকে আসক্ত নন। তাই আপনিই যে এসেছেন তা আমি আর আমার আগেও আমার লাজুকই টের পেয়েছে, নাকি রে লাজুক?”
উত্তরে লাজুকলতা কেবল লেজটুকু সরিয়ে পরেশনাথকে আরও একছটাক জায়গা করে দেয়।

নিভাননীর রেখে যাওয়া মোড়ায় বেশ গুছিয়ে বসেন পরেশনাথ। “এবার যে সম্বন্ধ এনেছি কর্তামা, আপনি না বলার ফাঁকটি পাবেন না। এক্কেবারে অক্ষয় সিঁদুরের অধিকারিণী এ মেয়ে।”
কিন্তু পরেশনাথের উৎসাহের ঝরনা মিনিটখানেক ঝরতে না ঝরতেই কর্তামার মুখের রেখা কঠিন হতে থাকে— “আপনার কি মতিভ্রম হল ঘোষমশাই! কোথাকার কোন বিধবার রজঃস্বলা মেয়েকে আমি নাতির বউ করে নিয়ে আসব!”
হাঁ হাঁ করে ওঠেন পরেশনাথ। “কর্তামা, আগে সম্পূর্ণ কাহিনি তো শুনুন। এ মেয়ের সঙ্গে যে থাকবে তারই অখণ্ড পরমায়ু। আমি নিজে কোষ্ঠী বিচার করিনি শুধু, তর্কালঙ্কারমশাইকে দিয়েও করিয়েছি। মেয়েটি বিবাহোত্তর রাজরানির ললাট নিয়ে জন্মেছে মা। মৃত্যুযোগ মেয়ের নিজেরই প্রায় বার্ধক্যে, তাও সধবা। স্বামী-পুত্রযোগে রাজটিকা জ্বলজ্বল করছে।”
“বাপ খেয়েছে ছোট বয়সে, তার ভাগ্য কী করে ভালো হয়!” কর্তামা একেবারেই বিশ্বাস করতে চান না।
“সেও এক কাহিনি কর্তামা… বাপ-মা মেয়েটিকে বোনের কাছে রেখে সাকিন গাঁয়ে যাচ্ছিলেন। পথে লেঠেল ডাকাত চড়াও হয়ে যথাসর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাপটি ছিলেন সাহসী মানুষ। লেঠেলদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়তে গিয়ে মাথায় লাঠির ঘা খান। তবে মা মানুষটি বড় ভালো কর্তামা। একা মেয়েমানুষ স্বামীর শোক সামলাতে সামলাতে মেয়েটি যে বেড়ে উঠছে বুঝেও কিছুই করতে পারেননি এতকাল। গ্রামে তাঁদের খাওয়া জুটত না দু-বেলা। স্বামী হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই শরিকেরা জমি থেকে বাস্তু সবই নিজেদের করে নিয়েছে। শেষে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। আমি সেইখানেই মেয়েটিকে দেখলাম। ছোটখাটো গড়ন। যেন আমাদের কোজাগরীর লক্ষ্মী ঠাকরুনটি। দেখলে বুঝতেও পারবেন না মা যে রজঃদর্শন হয়েছে তার।”
মাঠার গেলাসটির গায়ে বিন্দু বিন্দু জল জমছে। কর্তামার মুখের বিরক্তিও এক দাগ নামেনি। “না না, চৌধুরীবাড়ির নাতির বউ হবে কুমারী, বড় বংশের কন্যা। এ কোন বুড়োধাড়ি মেয়ে, মাসির ভাতে মানুষ। তাকে আমার নয়নরাজের বউ করে আনার কথা ভাবতেও পারব না আমি।”

দরজার আড়ালে একটি ডুরে শাড়ির আভাস দেখা দিয়েই সরে যায়। কর্তামার নাতি, যার বিয়ের কথা চলছে, তার মায়ের শাড়িটির কোনা নজরে আসে পরেশনাথের।
“আপনি তো জানেন কর্তামা, নয়নরাজের আয়ুরেখাটি বড় ভঙ্গুর। মারণ ফাঁড়া নিয়ে জন্মেছে নাতিরাজা। এদিকে আপনাদের পালটিঘরে সম্বন্ধ চালাতে গেলেই তাঁরা ঠিকুজি চান। গতমাসে আমি ধাত্রীগ্রামের জমিদার বংশের সীতেশ রায় মশায়ের নাতনিটির সঙ্গে সম্বন্ধ প্রায় গড়েই এনেছিলুম, কিন্তু তাঁরা নয়নরাজের ঠিকুজি বিচার করিয়েছেন কুলপুরোহিত দিয়ে। তারপর আমাকে জানিয়েছেন জেনেশুনে তাঁরা বাড়ির মেয়েকে বৈধব্যের দিকে…”
“চুপ! চুপ করুন আপনি।” ছিটকে ওঠেন কর্তামা। মাথা থেকে ঘোমটাটি খসে পড়ে বিরক্তিতে। “যা মনে আসে বলছেন! ফাঁড়া আর মৃত্যু এক হল!”
“ফাঁড়া তো যেমন তেমন নয় মা, একেবারে মৃত্যুযোগই আছে যে।” পরেশনাথের ধীর স্বরটি শুনে দরজার আড়ালের ডুরে শাড়িটির আঁচল চমকে ওঠে, ফলত কিছু চুড়ির রিনিক ঠিনিক শোনা যায়।
“আমাকে একটু ভাবতে দিন পরেশবাবু, ছেলেদের সঙ্গে পরামর্শ করে আপনাকে খবর দেব-খন… নিভা, পরেশবাবুকে জল-মিষ্টি দিতে কি বলে দিতে হবে?” বলতে বলতে নিজের কেদারাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়ান কর্তামা।
সন্ধেবেলায় চণ্ডীমন্ডপে রামনাথ শাস্ত্রী মশাই আসবেন। তাঁর গলায় কিছুটা কথকতা শুনলে মনটি যদি স্থির হয়। শাস্ত্রীমশাই বলেছিলেন পাঠশালের একটি ব্রাহ্মণ পোড়োকে পাঠাবেন দুপুরের দিকে। রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনাবে সে। দিনের হিসেবে সিদে সাজিয়ে দিলেই হবে তাকে। সে কথাটিও তাঁকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

“মা যা ভালো বুঝবেন, তাই তো করবেন। তুমি এর মধ্যে মাথা গলাচ্চই বা কেন?” বউয়ের সাজা পানটি গালে ফেলে পাশবালিশটি কোলের কাছে টেনে আড় হন শঙ্করপ্রসাদ।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর পানটি মুখে নিয়ে গিন্নির সঙ্গে মিনিট দুয়েক কথা হতে না হতেই চোখ লেগে আসে। ওই দু-মিনিটই সময় ইরাবতীর হাতে।
“তুমি শুধু একবারটি মাকে রাজি করাও মেয়েটিকে দেখতে যাওয়ার জন্য। ছোটঠাকুরপো আর পুরোহিত মশাইকে নিয়ে যেও। পায়ে পড়ি তোমার। এই মেয়েই আমি বউ করতে চাই।”
গিন্নির দিকে তাকিয়ে হাসেন শঙ্করপ্রসাদ। “মা-র কথার উপর কথা বলতে বলছ!”
“হ্যাঁ, বলছি। মা-র আপত্তির কোনও কারণ তো পাইনে। মেয়েটি জন্ম এয়োস্ত্রির কপাল নিয়ে এসেছে। পরেশবাবু ঠিকুজি মিলিয়ে দেখেছেন এই মেয়ে আমার নয়নের রক্ষাকবচ হবে।”
“আচ্ছা আচ্ছা, কান্নাকাটি কেন আবার? আহা, আমায় একটু শুতে দাও। চারটেতে আবার কাছারিতে গিয়ে বসতে হবে।” বলতে বলতেই শঙ্করপ্রসাদের নাকের বাদ্যি শোনা যায়। হালকা বালাপোষখানা স্বামীর গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে মেঘলা মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইরাবতী।

ইরাবতী নয়নরাজের মা, কর্তামার বড় পুত্রবধূ। আজ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে পরেশবাবুর সব কথাই শুনেছে। এমনিতে এ বাড়িতে বউদের পর্দা প্রথা থাকলেও পরেশবাবু আর পুরোহিত মশাইয়ের ক্ষেত্রে ছাড় আছে কিছু। কর্তামা উঠে যাওয়ার পর ইরাবতীই নিভার কাছ থেকে জলখাবারের থালাটি নিয়ে পরেশবাবুর কাছে গিয়েছিল। থালাটি নামানোর সময় খুব নিচু গলায় বলে এসেছে পরশু যেন তিনি আর একবার আসেন। ইরাবতীর আশা কর্তাকে সে রাজি করাতে পারবে। মেয়ের বয়স নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। নয়নরাজের এখন সতেরো চলছে। উনিশে একটি মারাত্মক ফাঁড়া আছে তার। সেটি কাটানোর জন্য বহু যাগযজ্ঞ, মহামৃত্যুঞ্জয় কবচ সবই হয়েছে, তবু কোথায় যেন ভয়ের কাঁটা খচখচ করে।

দুপুরে কর্তামার খাওয়ার সময়ে তিন পুত্রবধূই কাছে থাকে। বাড়িতে দাসদাসী চাকরবাকরের ছড়াছড়ি। হেঁসেলে দুজন ঠাকুর। তবু কর্তামার খাবারের জোগাড় কেবল বউরাই করতে পারে। তিনজনেই ভয়ে ভয়ে লক্ষ করে খেতে খেতে শাশুড়ির মুখের ভাবখানি কেমন। কোনোদিন বেশি গম্ভীর লাগলে ছোট বিভাবরীকে বড় ইরাবতী ঠেলা দেয়— “তুই নিশ্চয় লাউশুক্তোতে আজ নুন দিসনি বিভা।”
কোনোদিন প্রসন্ন দেখালে মেজ শৈলরানি বড় ইরাবতীকে বলে—“আজ তোমার ছানাপটলে নিয্যেস সোয়াদ বেশি হয়েছে দিদি।”
তিনটি বউই কর্তামার প্রিয়। অনেক সময় কাজে-অকাজে ভিতরবাড়িতে বসে তিনিও শুনে ফেলেন তিন জায়ের খুনসুটি। আহা সেই কোন ছোটবেলায় তিনটিকে নিজে বেছে বউ করে এনেছিলেন কর্তা। আজও খেতে বসে তিনজনের দিকেই একবার করে চাইলেন কর্তামা। তাঁর ছেলের বউরা ঘরে এসে ঘর আলো করেছে। এখন এদের ছেলেগুলি বড় হচ্ছে। তাদের জন্যও একেবারে ফুটফুটে কুমারীপূজার আসন থেকে উঠে আসা বউ আনবেন ভেবে রেখেছেন। পরেশবাবুর মতিভ্রংশ হয়েছে নির্ঘাত।

মতিভ্রংশ তো শুধু পরেশবাবুরই হয়নি। বড় বউমারও হয়েছে বটে। দুপুরে হেঁশেলে বসে তিন জায়ে পরামর্শ চলে। ছোট বিভাবরী একটু ডাকাবুকো। সে বুদ্ধি দেয়— “তুমি ভাশুর ঠাকুরকে রাজি করাও দিদি। তোমার দেওরকে আমি বলব-খন আজই। দুই ভায়ে মিলে মেয়ে দেখে মত দিয়ে দেবে। ও মেজদি, তুমি কী বলো?”
মেজ শৈলরানি যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে পা দেয়, তখন ইরাবতী সাত মাসের পোয়াতি। বলতে গেলে আঁতুড়ের নিয়ম চোকার পর থেকেই সে নয়নকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। ওই মহামৃত্যুঞ্জয় কবচের পুজোর উপোস সেও করেছিল বড় জায়ের সঙ্গে। নয়নের ফাঁড়ার কথা শুনলেই তার চোখে জল আসে। এখনও সে আমড়াখানা গালের পাশে ঠেলে বাঁ হাতে আঁচল তুলে চোখটি মুছে ঘাড় নাড়ে, “হ্যাঁ দিদি। মাকে বোঝাতে যদি কেউ পারে তো ভাশুরঠাকুরই পারবেন। তুমি আজ রাতে কেঁদেকেটে পায়ে পড়েও মত করাও। আমার নয়নের কিছু হয়ে গেলে আমি গলায় দড়ি দেব,” বলতে বলতে আমড়ার আঁটিটাই গলায় আটকে যায় প্রায়।

দুপুরটি গড়িয়ে উঠোন পেরোয় প্রায় দেখে নিভাননী অল্প গোলাপজল মেশানো খাঁটি নারকোল তেলটি কর্তামার পায়ে মাখাতে মাখাতে গুনগুন করে তিন বউয়ের শলা পরামর্শর কথাটি ফাঁদল। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই এই লাগানি ভাঙানিতে গিন্নি খুশি হলেন, না ব্যাজার। শুধু পা-টি টেনে নিয়ে বললেন, “যাওয়ার সময় দরজাখানা টেনে দিয়ে যাস।”

কাঁদাকাটায় নাকি ছলাকলায় তা কেবল ইরাবতীই জানে, পরের দিন কাছারি থেকে শঙ্করপ্রসাদ সকালের লুচির থালাটি ফিরিয়ে পাঠালেন।
“ভেতরে মা-র কাছেই খাব। জলখাবার ওখানে দিতে বল, আসছি…” এটুকু শুনেই কর্তামা আঁচ করেছিলেন।
কর্তা গিয়ে ইস্তক বড় শঙ্করই হাল ধরেছে চতুর্দিকে। বাকি দুই ছেলেও বড় ভাইয়ের কথা বেদবাক্য মানে। শঙ্কর নিজে সাধারণত অন্দরের কোনও ব্যাপারে কথা কইতে আসে না। বরং এস্টেটের কাজে বা সংসারের ভালোমন্দ নিয়ে পরামর্শ করার থাকলে কর্তামাই ডেকে পাঠান তাকে।
সারারাত কর্তামাও অনেক ভেবেছেন। ষেটের কোলে তাঁর নিজেরও পাঁচটি ছেলে তিনটি মেয়ে। প্রথম দুটি ছেলেই অকালে কোল খালি করে গিয়েছিল। সন্তানের মৃত্যু দু-দুবার দেখেছেন তিনি। তাছাড়া নয়নরাজ তাঁর নয়নের মণি, বংশের প্রথম নাতি। পরেশবাবুকে তিনি বলেছিলেন অষ্টমীর কুমারীপূজার আসনের কোনও যোগ্য মেয়ের সম্বন্ধ আনার কথা। এ মেয়েটির বয়স বারো, তায় মাসির ঘরে আশ্রিত। এমন ধিঙ্গি মেয়ে বউ করে এনে সমাজে মুখ দেখাবেন কী করে!
শঙ্করপ্রসাদ কিন্তু মায়ের কাছে খুব অল্প কথায় কাজ সারেন।
“মেয়েটিকে দেখলেই যে পছন্দ হয়ে যাবে এমন তো না মা! তাছাড়া শুধুই একটু বেশি বয়সের জন্য মেয়েটিকে আপনি নাকচ করলে ভবিষ্যতে যদি নয়নের কিছু হয়, তখন আপনি নিজেও কি নিজেকে দোষী ভাববেন না?”
কেঁপে ওঠেন কর্তামা। রজঃস্বলা মেয়ে বউ করে এনে কতটা পাতকী হতে হবে, তা পুরোহিত মশাই-ই জানবেন। কিন্তু এরপর যদি এমন সুলক্ষণা মেয়ে না পাওয়া যায়! নয়নরাজের পরেও আরও তিনটি নাতি আছে। ভাগ্যে থাকলে কুমারী বউ আসবে নিশ্চয়। মন ঠিক করে নেন কর্তামা— “বেশ, পরেশবাবুকে খবর দিও একবার যেন আসেন।”

“ও স্বর্ণ, মাথার কাপড় সরে যাচ্ছে যে! ভালো করে কাপড়টা টেনে তবে থালা হাতে নে।” মেজবউ শৈলই এই দুরূহ কাজখানা নিজের কাঁধে নিয়েছে, “এ মেয়ের নাম বুঝলে দিদি, হরিণী হওয়ার কথা। এত হাতে পায়ে ছটফটে মেয়ে তো দুটো দেখিনি…”
এ যদিও খুড়িশাশুড়ির স্নেহের কথা, নইলে স্বর্ণলতা মোটেই ছটফটে নয়। কেবল ঘোমটাটিই তার মাথা থেকে মাঝেমাঝে সরে যেতে চায়। বিয়েবাড়ির কুটুম স্বজন থাকাকালীন তো সে ঘর থেকেই বেরোয়নি। এখন ক-দিন পর বাড়ি একটু খালি হতে সে মাঝেমাঝে এদিক ওদিক ঘোরে, শাশুড়িদের হুকুম তামিল করে।

ইরাবতী নিরামিষ হেঁসেলের নারকোলটি কুরিয়ে নিতে নিতে হাসে— “তুই-ই বোঝ! গড়ে পিটে মানুষ তো তুই-ই করবি!”
এ দায়িত্ব আসলে সে নিজেই শৈলকে দিয়েছে। এই মেয়েটি তার নয়নরাজের রক্ষেকবচ। তাকে বকাবকি করে শাসন করে এ বাড়ির উপযুক্ত বউ করে তোলে এমন সাধ্য নেই ইরাবতীর। এক দু-বার কোনও কারণে বকতে গিয়েও আটকে যায়। কেবল মনে হয় এই মেয়েটির কারণেই হয়তো তার শিবরাত্তিরের সলতেটি ফাঁড়া কাটিয়ে উঠবে। একরাশ স্নেহ নাকি কৃতজ্ঞতায় গলার স্বর এমনিতেই নরম হয়ে যায়।

মাথার কাপড়টি গুছিয়ে রুনুঝুনু নূপুরের শব্দ তুলে এক হাতে মিষ্টির রেকাবি, অন্যহাতে ডাবের জলটি নিয়ে স্বর্ণলতা কর্তামার পাশটিতে গিয়ে দাঁড়ায়।
কর্তামা নিভাকে দিয়ে নতুন কম্বল আর চাদর জোড়ায় জোড়ায় গুছিয়ে তোলাচ্ছিলেন। অঘ্রাণে নাতির বিয়ে দিয়ে বউ আনলেন। পৌষের আগেই মহালে লোক পাঠিয়ে গরিবদের মধ্যে কম্বল আর চাদর বিতরণ করবেন।
নূপুরের শব্দ শুনে পাশে তাকালেন কর্তামা। নাতবউ বলে কথা। কত আদরেরই জিনিস। কিন্তু কোথা থেকে একটা বিরাগ বারবার কর্তামার মুখে ছায়া ফেলে। সেটুকু জোর করে মুছে ফেলার চেষ্টাতেই গলায় স্নেহ আনেন কর্তামা— “তুমি কিছু খেয়েছ স্বর্ণ!”
টুকটুক করে মাথা নাড়ে নতুন বউ। ঘোমটা সরে যাবার ভয়ে কোণটি হাতে ধরে থাকে।
“সে কী! জল খাওনি সকালে?”
“মা-র সঙ্গে খাব।” ধীর গলায় কথা ক-টি বলে স্বর্ণ। নাতবউয়ের গলা এই প্রথম স্পষ্ট শুনলেন কর্তামা। তিনি আর পাঁচটি শাশুড়ি-দিদিশাশুড়ির মতো নন। ছেলের বউদের গলাও দিনে ক-বার শোনেন গুনে বলা যায়।
“আচ্ছা, যাও… বড়বউমাকে বোলো আমি ডেকেছি।”

স্বর্ণ ধীর পায়ে ভিতরবাড়িতে এসে খবরটি দিয়ে হেঁসেলের জানলা দিয়ে কালো হয়ে আসা আকাশ দেখে। এত বড় আকাশ! মাসি বলত তেপান্তরের মাঠ এর থেকেও বড়। মাসির বাড়ির ছাদেও কি এমন মেঘ করেছে? মা কী করছে কে জানে!
এখানে মেজমা রোজ পাঁচ গুছি ছ-গুছির বিনুনি করে দেন। নাপিত বউ আসে সবাইকে আলতা পরিয়ে চুল বেঁধে দিতে। তবু মেজমা নিজেই স্বর্ণর চুল বাঁধেন। নিভাননী দুধের সরে কাঁচা হলুদ বাটা মিশিয়ে দেয়। ছোটমা স্নান করতে যাওয়ার আগে সেটি হাতে দিয়ে বলেন, “ও স্বর্ণ, এটা মেখে একটুক্ষণ বোস, তারপর নাইতে যাবি।” স্বর্ণ তাই করে। তবে এখানে নাইতে যাওয়াটা কেমন যেন! শিরকাগঞ্জে মাসির ওখানে বাড়ির পুকুরে নাইতে নামার সুখ এখানে নেই। অন্দরে বড় উঠোনের একদিকে ঘেরা অনেকটা জায়গা। সেখানে চৌবাচ্চায় জল ধরে রাখা হয়। বড় বড় জালাতেও জল থাকে। ওই জলেই চান সারতে হয়।
হঠাৎ যেন স্বর্ণকে চমকে দিয়েই ভীষণ জোরে ঝড় ওঠে। মা! ও মা! তুমি ঝড়ে কাঁচা আম তুলে আনতে যে বাগান থেকে! ভাবতে ভাবতে স্বর্ণর দু-চোখ ভাসিয়ে জল উপচে পড়ে।

নয়নরাজের বেশ মজা যা হোক। একটা সাজুগুজু করা ঘোমটা টানা মেয়ে একেবারে তার নিজস্ব। ইচ্ছা করলেই তাকে দিয়ে পা টেপাতে পারে, মাথা টেপাতে পারে, হুকুম করতে পারে যা মন চায়। স্বর্ণ এমনিতে চুপচাপ ঘরে আসে। জলটা মৌরিটা এগিয়ে দেয়। কখনও মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে আলোটা কমিয়ে দেবে কি না। দুপুরে পড়াশুনোর টেবিল গুছিয়ে রাখে। তবে কখন যে ঘুম থেকে উঠে চলে যায় তা নয়নরাজ জানতে পারে না।
সেটা জানতে পারেন কর্তামা। দোতলায় পুবমুখো ঘরের সামনের ঘেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম আর পিতৃপুরুষদের প্রণাম সেরে কর্তামা নিচে নামেন। ইদানীং বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছেন ভোরের শিশিরে পা ফেলে ফেলে বাগানটিতে ঘুরছে নাতবউ। বাগানটি কর্তামার বড় প্রিয়। দু-জন মালি চৌপর দিন খাটে বাগানের পিছনে। ইদানীং তারা বাগানে আসার আগেই নাতবউ ঘুরে ঘুরে শুকনো পাতা তুলে জড়ো করে। কর্তামা ঠাহর করে দেখেছেন ফুলে হাত দেয় না মোটে। একটানা সারি দিয়ে লাগানো রংবেরঙের গোলাপ শীতের মুখে সেজে উঠছে। স্বর্ণ কখনও একটু নিচু হয়ে গোলাপের সুবাস নেয়, কখনও লতানে জুঁইয়ের শেষ রেশের।
কর্তামা দূর থেকে দেখেন। পরেশবাবু ঠিকই দেখেছিলেন। মেয়েটি লক্ষ্মীস্বভাবা। এখন নাতির ফাঁড়াটি যদি কাটে এই মেয়ের পয়ে তো গোটা মহালকে তিনদিনের ভোজ খাওয়াবেন কর্তামা, বেনারসে পুজো পাঠাবেন সোনার থালায়, গৃহদেবতা অনন্তনারায়ণের সোনার পৈতে গড়িয়ে দেবেন, ভাবতে ভাবতে আরও কত কথাই যে মনে হয়! কর্তা বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। একা হাতে কর্তামা দশদিক সামলান। সারাটি দিন কেটে যায় কাজে কম্মে। শুধু বড় কোনও বিষয়ে মতামত নিতে ছেলেরা যখন কাছটিতে এসে বসে, তখন বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। কর্তার অভাবটা যেন বড় বেশি টের পান তখন।
পুজোর ঘর থেকে বেরোতেই নিভাননী এসে খবর দিল— “পরেশবাবু এয়েচেন।”
“পরেশবাবু? কাছারিঘরে তো নামেনি এখনও বড়খোকা! তাও ওখানেই বসতে বল।”
“উনি আপনার কাচেই এয়েচেন কর্তামা।”
“আমার কাছে? আচ্ছা ওঁকে ভেতরে পাঠিয়ে দে আর বড়বউমাকে বল ওনার জলমিষ্টির বন্দোবস্ত করতে।” কর্তামা তাঁর আরামকেদারায় এসে বসেন।

পরেশবাবু ভোর-ভোর স্নান সেরে বেরিয়েছেন বোঝা যায়। মহালের কিছু শরিকি সমস্যার খবর দিতে এসেছেন। এখান থেকে আরও কোথাও যাওয়ার আছে।
নয়নরাজের জন্য ভাগ্যবতী বউ খুঁজে দিয়েছেন কত কষ্ট করে মানুষটা! ইরাবতী পরম কৃতজ্ঞতায় লুচি, তরকারি, পাঁচরকম মিষ্টি— সব সাজিয়ে নিভার হাতে দিয়ে পায়ে পায়ে নতুনবউকে সঙ্গে নিয়ে ভেতর বারান্দা অবধি আসে। তারপর স্বর্ণর ঘোমটাটি আরও একটু টেনে দিয়ে বলে, “যাও, প্রণাম করে এসো ওঁকে।”
পরেশবাবু বিয়ের পর এই প্রথম স্বর্ণকে দেখলেন। শিরকাগঞ্জের সেই খুকিটি এই ক-দিনেই কেমন বউ হয়ে উঠেছে! স্বর্ণ পায়ে হাত দিতে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন পরেশবাবু। তারপর সঙ্গের ঝোলাটি থেকে একখানি ভাঁজ করা কাগজ স্বর্ণের হাতে দেন— “এই নাও মা, তোমার মা চিঠি লিখেছিলেন তোমাকে। আমি গিয়েছিলুম কিছুদিন আগে। এখানে আসব শুনে আমার হাত দিয়েই পাঠিয়েছেন।”
“ও পত্তর আপনিই পড়ে দিন। নয়ন আজ দু-দিন হল মেজখোকার সঙ্গে কোর্টের কিছু মামলা নিস্পত্তি করাতে গেছে। ফিরবে সেই পরশু। নাতবউ তো আর শ্বশুরকে দিয়ে পত্তর পড়াতে পারবে না! আপনিই পড়ে দিন না হয়!”
“আমি পারব।” মিহি গলায় স্বর্ণ কথা ক-টা বললেও ঘরে যেন বাজ পড়ে।
“কী পারবে নাতবউ?”
“আমি পত্তরটা পড়তে পারব।” স্বর্ণ আবার নরম গলায় বাজ ফেলে।
বউয়ের কথা শুনে দরজার আড়ালে ইরাবতীর হাত থেকে ঝনঝনিয়ে কাঁসার গেলাসটি পড়ে গোটা মেঝে জলে জলাক্কার।
“তুমি? তুমি পড়তে পারো?” কর্তামার গলায় হুংকার বেজে ওঠে যেন…
“হ্যাঁ, আমি দেশের বাড়িতে পাঠশালে গিয়েছিলাম। পড়তাম, লিখতামও।”
“আর তোমার মা? তিনিও লিখতে পড়তে পারেন?”
“না।” আলতো ঘাড় নাড়ে স্বর্ণ। “মা বোধ হয় বেণুদাদাকে দিয়ে লিখিয়েছেন।”
বাসনের আওয়াজেই হোক বা নিভাননীর উচ্চৈঃস্বরে ‘মা গো, এ কী সব্বনেশে কতা গো!’ বলে চিৎকারেই হোক শৈলরানি আর বিভাবরীও কপাটের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। কর্তামা পিছন ফিরে বসে আছেন। রাগে কাঁপছেন না আচমকা আঘাতে অবশ হয়ে গেছেন বোঝার উপায় নেই। পরেশবাবু মাথাটি নিচু করে বসে আছেন, হাতের লুচি ঠান্ডা হয়ে গেছে বোধ হয়। শুধু স্বর্ণ নির্বিকার মুখে কাগজটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন কর্তামার হুকুম পেলেই পড়ে শোনায়।

কিছু পরে পরেশবাবু আধখালি রেকাবিটি নামিয়ে দূর থেকে প্রণাম সেরে বিদায় নেন। ইরাবতী, শৈলরানি আর বিভাবরী তিনজনে মিলে নিরামিষ হেঁসেলের সব রান্নাই হয় আলুনি, নয় নুনে পোড়া করে সারে। রসুইঘরে দুই ঠাকুর আর খেমি ঝি মিলে নতুন বউয়ের লেখাপড়া জানার পাপ খণ্ডাতে মুড়িঘণ্টতে মাত্র একটি মাছের মাথা দিয়ে বাকি মাথাগুলি লাজুকলতাকে খাইয়ে দেয়। শুধু এই প্রবল হাঙ্গামার মাঝে কেউই স্বর্ণর খোঁজ নেয় না।
স্বর্ণ তখন নয়নরাজের পড়ার টেবিলের নিচে বসে একমনে মা-র লেখা ছ-লাইনের চিঠিখানি একবার মুখে বোলাচ্ছে একবার খুলে পড়ছে একবার অক্ষরগুলোকে নাকের সামনে এনে মায়ের আঁচলের গন্ধটি নেওয়ার চেষ্টা করছে।
দুপুরে ছেলেরা কর্তামার সামনেই খেতে বসেন, তেমনই নিয়ম। আজ কেবল বড়ছেলেই বাড়িতে আছে। কর্তামা শান্তমুখে ছেলের খাওয়ার তদারকি করেন। পরেশবাবু মহালের যে খবরটি দিতে এসেছিলেন সেটি শোনান, নাতবউয়ের বাপের বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে সেটিও জানাতে ভোলেন না। শুধু নাতবউ যে পড়াশুনো জানা বিদ্যেধরী সেটুকু আর বলেন না কেন কে জানে!
ছেলের খাওয়া হলে নিজের পাটটুকু সেরে ঘরে গিয়ে দোর এঁটে দেরাজটি খোলেন কর্তামা। কর্তা গেছেন তা প্রায় বাইশ না তেইশ বছর হল। তাঁর শালটি, বিয়ের জোড়টি, আরও কিছু ধুতি-চাদর এখনও দেরাজে সাজানো। জোড়ের চাদরটি সযত্নে বার করে আনেন কর্তামা, বিছানায় রেখে ভাঁজ খোলেন; ভেতরে প্রায় হলদে হয়ে আসা ক-টি কাগজ, তাতে নীল রং দিয়ে কিছু লেখা।

তখন গোটা পরিবার দেশের বাড়িতেই ছিল। প্রথমবার সন্তানসম্ভবা বউকে পাশের গ্রামে তাঁর কবিরাজ বাপের কাছে পাঠিয়েছিলেন কর্তামার শাশুড়ি। টানা ছ-টি মাস বাপের বাড়িতে থাকার কালে কর্তা বড় মন খারাপ করে চিঠি লিখে পাঠাতেন তাঁর পেয়ারের চাকর ভীমের হাতে। বউয়ের অক্ষরজ্ঞান নেই জেনেই লিখতেন। বাড়িতে ভাইয়ের তো অভাব ছিল না। কাউকে এক আনার লোভ দেখিয়ে পড়িয়ে নিলেই হত। তখন বয়সই বা কী! বড়জোর চোদ্দো।
প্রথম চিঠিটি আজ আর নেই। ছোট ভাইটিকে পড়ে দেওয়ার জন্য ধরেছিলেন। সে সেটা পড়েও দিয়েছিল, কিন্তু তারপর বাকি ভাইবোনদের দেখিয়ে ঠাট্টা তামাশায় দিদিটির প্রাণ অতিষ্ঠ করে দিতে দিতে ছিঁড়েও ফেলেছিল। সেই থেকে ভীম লুকিয়ে এসে চিঠিটি দিলেই তিনি সেটি আঁচলে বেঁধে ঘরে এসে তোরঙ্গের নিচে রেখে দিতেন। ছেলেকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে প্রথম রাত্রেই চিঠিগুলো বার করে কর্তাকে দিয়েই পড়িয়ে নিয়েছিলেন।
পরে কর্তা সেই নিয়ে কত ঠাট্টাই যে করতেন। বলতেন, “আমাকে ছেড়ে কখনও যেও না কোথাও। চিঠি লিখলেও তো আমাকেই গিয়ে পড়ে দিয়ে আসতে হবে!”
সেই কর্তাই চলে গেলেন চিঠিপত্তরের সীমার বাইরে। আজ এতদিন পরে এই চিঠিগুলোতে কী লেখা আছে, তা নতুন করে জানতে ইচ্ছে করে খুব।

সন্ধেবেলায় পুরোহিতমশাই নারায়ণের শয়ান দিয়ে গেলে কর্তামা নিভাননীকে বলেন ঠাকুরদালানের লন্ঠনটা উসকে দিতে আর নতুন বউকে পাঠিয়ে দিতে একবার।

স্বর্ণ ভয়ে ভয়ে এসে দাঁড়ায়। আজ আর শাশুড়িরা কেউ ওকে কাছে ডাকেনি। চুলের গুছি যেমন-তেমন ঘাড়ের কাছে জড়ো করে তার ওপর দিয়েই ঘোমটাটা কপাল অবধি টেনে রেখেছে। নূপুরের রুনুঝুনুর অস্বস্তিটাও বেচারি ঢাকতে পারছে না। পড়তে জানার অপরাধটা যে কত গুরুতর তা বোধ করি এখনই বোঝা যাবে। নয়নরাজ ফিরলেই হয়তো কর্তামা তাকে দিয়ে ওকে শিরকাগঞ্জেই পাঠিয়ে দেবেন। হেঁশেলে ঠাকুরদের নিভাননী এমন কিছুই তো বলছিল।
“এসো, চুল বাঁধোনি আজ?” কর্তামার চোখ কিছুই এড়ায় না।
মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ে স্বর্ণ।
“বোসো আমার কাছে। কেমন আছেন তোমার মা?”
সারাদিনে সবার চোখে রাগ আর ভয় দেখে যা হয়নি, কর্তামার এই একটি কথায় তাই হয়। ঝরঝরিয়ে দু-গাল বেয়ে নদী নামে স্বর্ণলতার। কোনোরকমে ঘাড় হেলিয়ে উত্তর দেয়— “ভালো আছেন, আপনাকে প্রণাম জানিয়েছেন।”
“আর তোমাকে?” কর্তামার মুখে অল্প মায়া-মায়া হাসি বুঝি।
“স্নেহাশিস পাঠিয়েছেন।” এটুকু বলতেই গলা কেঁপে যায় বেচারির।
“বেশ যাও, গিয়ে বড় বউমাকে বলো চুলটা বেঁধে দিতে। আর কাল দুপুরে খাওয়াদাওয়া হলে আমার ঘরে এসো একবার।” এটুকু বলেই কর্তামা ছুটি দেন স্বর্ণকে।
সারারাত পাশবালিশটি নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে স্বর্ণ। আজ তো শাস্তি দেননি! তবে কি কাল সবার সামনেই?
মেঝেয় শীতলপাটিতে শুয়ে নিভাননী বারবার বলে, “মাথার কাছের জানলাটা খুলে দিই? গরম লাগছে বুঝি!”

পরেরদিন ইরাবতী কাঁপা হাতে স্বর্ণকে ভাত বেড়ে দেয়। শৈল চোখের জল মুছতে মুছতে মাছের পেটিদুটি পাতে ফেলে দেয়। না জানি কী শাস্তি পেতে চলেছে এইটুকু দুধের মেয়ে। তিন শাশুড়ির সঙ্গে খেতে বসে পাতের খাবার পাতেই পড়ে থাকে। হাত ধুয়ে স্বর্ণ পায়ে পায়ে কর্তামার ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়।
কর্তামা উঠে গিয়ে দরজাটি বন্ধ করে দেন। তারপর দোয়াত কলম আর বালির কাগজটি মাটিতে বিছিয়ে বসেন। পাশে বসান নতুন নাতবউকে।
কর্তার নাম ছিল স্বর্গীয় মৃগাঙ্কশেখর চৌধুরী। নাতবউয়ের হাতে কলমটি দিয়ে কর্তামা বলেন, “প্রথমে আমাকে ‘ম’ লেখা শেখাও দেখি নাতবউ!”

সারা দুপুর ধরে স্বর্ণর লেখা অক্ষরগুলির ওপর কলম বুলিয়ে অভ্যাস করেন ষাটোর্ধ্ব কর্তামা। মাঝে মাঝে ভুল করেন। স্বর্ণলতা তার ছাত্রীটির পদমর্যাদা ভুলে খিলখিলিয়ে হাসে। হাসেন কর্তামাও। স্বর্ণ তো জানে না কীসের টানে এই বুড়ো বয়সে এসে হঠাৎ এমন অক্ষর পরিচয়ের ঝোঁক! ভাগ্যিস চিঠিগুলো এত বছর ধরে যত্নে রেখেছেন। আর মাত্র ক-টা দিন, তারপর আবার নতুন করে কর্তাকে কাছে পাবেন এত বছর পর।


‘ফিরে পড়া গল্প’ বিভাগে প্রকাশিত গল্প সংকলন থেকে গল্প তুলে আনছি আমরা। সম্পাদকের পছন্দ অনুসারে সৃষ্টি-র এই সংখ্যায় রইল সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়-এর ‘অপার বসন্ত’ গল্প সংকলন থেকে একটি গল্প। বইটি অনলাইন অর্ডার করা যাবে এখানে

One comment on “

প্রথম অক্ষর ‘ম’

সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *